ওর বেডরূমে কেক আর কফি নিয়ে এসে লম্বা টেবিলটার উপর রাখল জিনি। দুএক কথায় তাকে শুধু বলল জনি যে কয়েকটা ছবি তৈরির জন্যে প্রয়োজনীয় টাকা ধার দিয়ে তাকে সাহায্য করছে হেগেন, একটু শুনেই আনন্দ উত্তেজনায় উদ্ভাসিত হয়ে উঠল জিনির মুখ। আবার খ্যাতি হবে জনির। আবার জনপ্রিয়তা হবে ওর। কিন্তু ডন কর্লিয়নি কতটা ক্ষমতাবান সে সম্পর্কে তার কোন ধারণাই নেই, তাই হেগেনের নিউ ইয়র্ক থেকে ছুটে আসার তাৎপর্যটুকু বুঝতেই পারল না সে। কফি শেষ করার পর তাকে বলল জনি, আজ রাত থেকেই কাজে হাত দিতে যাচ্ছে সে, একে তাকে ফোন করবে, ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেবে। আয়ের অর্ধেক যাবে মেয়েদের নামে, বলল ও। দুচোখ ভরা কৃতজ্ঞতা নিয়ে হাসল জিনি, মুখে চুমো খেয়ে শুভরাত্রি জানিয়ে বেরিয়ে গেল কামরা থেকে।
কাঁচের একটা ডিশ ভর্তি ওর প্রিয় মনোগ্রাম করা সিগারেট আর পেন্সিলের মত সরু কালো কিউবান চুরুট রয়েছে, কিন্তু সেদিকে পিছন ফিরে ফোনের দিকে হাত বাড়াল সে। সত্যি মাথা খুলে গেছে ওর। বেস্ট সেলার-এর লেখকের নাম্বারে ডায়াল করছে ও, এই উপন্যাসটার উপর ভিত্তি করেই শেষ ছবিটা তৈরি করাহয়েছে। এর লেখক ওরই সমবয়েসী, অনেক জায়গায় অনেক ধাক্কা খেয়ে, অনেক ভোগান্তির শিকার হয়ে, অনেক বাধা পেরিয়ে এসে তবে নাম করতে পেরেছে। সাহিত্য জগতে তার নাম এখন অতি পরিচিত। হলিউডে গ্নে এসেছিল মহারাজার অভ্যর্থনা আর সমাটের খাতির যত্ন পাবার আশা নিয়ে, কিন্তু সব লেখকের কপালে যা জোটে এর কপালেও তার চেয়ে বেশি কিছু জোটেনিহলিউড তাকে ঠকিয়ে ভূত করেছে, সম্মান তো দেয়ইনি, বরং ছেঁড়া কাগজের মত অবহেলা করেছে। ব্রাডন ডারবিতে এই লেখককে একবার অপদস্থ হতে দেখেছিল জনি। পীনোন্নত পয়োধর হিসেবে সুপরিচিতা এক অপরূপ সুন্দরী অভিনেত্রীর সাথে ডেট ছিল তার, স্বভাবতই একবিছানায় শোবার ব্যাপারেও সমঝোতা হয়েছিল ওদের মধ্যে। কিন্তু ডিনার-এর সময় বিখ্যাত নায়িকাটি তাকে কিছু না বলেইকেটে পড়ে, কারণ, দুচোমুখো একজন কমেডিয়ান তার দিকে আঙুল তুলে তাকে সেই রাতের জন্যে নির্বাচিত করেছিল। এই ঘটনার ফলে চোখ খুলে যায় লেখকের। হলিউডে কার জায়গা কোয়, কার রয়েছে হুকুম দেবার অধিকার, এসব পানির মত পরিষ্কার হয়ে যায় তার কাছে। তার লেখা বই দুনিয়াজোড়া নাম কিনেছে, কিন্তু তাতে কিছু এসে যায় না।, নায়িকা এখানে ছুঁচোমুখো, নেহাত বদ স্বভাবের একজন ফিল্মী লোককেই বেশি পছন্দ
সেই লেখককেই ফোন করছে জনি তার নিউ ইয়র্কের বাড়িতে, বইটাতে ওর জন্যে অমর একটা চরিত্র সৃষ্টি করেছে বলে ধন্যবাদ জানাতে চায়। উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করে হতাশ লোকটাকে চাঙা করে তুলল ও, তারপর কথাচ্ছলে জানতে চাইল, তার পরবর্তী উপন্যাসটা কতদূর লেখা হয়েছে, গল্পটা কি নিয়ে। লেখক যখন তার উপন্যাসের বিশেষ আকর্ষণীয় পরিচ্ছেদ-এর অংশ পড়ে শোনাতে শুরু করল ধীরে সুস্থে একটা চুরুট ধরাল জনি। লেখক থামতে বলল ও, চমৎকার! তাড়াতাড়ি শেষ করো, পুরোটা পড়তে চাই আমি। পাণ্ডুলিপির একটা কপি পাঠাবে নাকি আমাকে? আমি হয়তো ভাল দামে বিক্রি করার ব্যবস্থা করতে পারব ওটা, অন্তত ওলটস তোমাকে যে দাম দিয়েছে তার চেয়ে ভাল দাম পাইয়ে দিতে পারব।
লেখকের আগ্রহের মাত্রা দেখে সন্দেহটা দৃঢ় বিশ্বাসে পরিণত হলো জনির, ওলটস নাম মাত্র কিছু টাকা দিয়ে ভাগিয়ে দিয়েছিল বেচারাকে। ছুটির পর নিউ ইয়র্কে যেতে পারে ও, কথাটা উল্লেখ করে জানতে চাইল, তখন কি লেখক ওর আর ওর কয়েকজন বন্ধুর সাথে ডিনার খেতে আসতে পারবে? পরীর মত সুন্দরী কয়েকটা মেয়েকেও চিনি আমি, ঠাট্টা করে বলল জনি।
হেসে ফেলে লেখক জানাল, ঠিক আছে।
এরপর ছবির পরিচালক আর ক্যামেরাম্যানকে ফোন করল জনি, ছবিতে কাজ করার সময় ওদের সহযোগিতা পেয়েছে, সেজন্যে ধন্যবাদ জানাল। তারপর বলল, ওলটস যে ওর বিরুদ্ধে লেগে ছিল তা সে জানত, তাই ওদের সহযোগিতা পেয়ে আরও বেশি কৃতজ্ঞতা বোধ করছে নে, এবং কখনও যদি কোন ব্যাপারে ওদের কোন উপকার দরকার হয়, তাকে শুধু একবার জানালেই হবে।
সব শেষে সবচেয়ে কঠিন ফোনটা করল জনি জ্যাক ওলটসকে। ছবিতে ওকে অভিনয় করার সুযোগদানের জন্যে ধন্যবাদ জানাল তাকে। সেই সাথে জানাল, যে কোন সময় আবার তার কাজ করে দেবার সুযোগ পেলে মহা আনন্দ লাভ করবে ও। ব্যাপারটা ঘটাবার একমাত্র কারণ, ওলটসকে একটা মস্ত ধোকা দেয়া। এতদিন বড় বেশি সরলতা দেখিয়ে এসেছে ও। কয়েক দিনের মধ্যেই ওর নিজের ছবি প্রযোজনার তৎপরতা শুরু করে দেবে ও, তা টেরও পাবে ওলপস, তখন এই ফোন কনের গূঢ় রহস্য উপলব্ধি করে হতভম্ব হয়ে যাবে সে।
এরপর ডেস্কের পিছনে বসে চট করে একটা সিগারেট ধরিয়ে ফুঁকতে শুরু করল জনি। পাশের টেবিলেই রয়েছে হুইস্কির বোতল কিন্তু হেগেন আর নিজের কাছে প্রতিজ্ঞা করেছে জিনিসটা ছোবে না। সিগারেট খাওয়াও উচিত হচ্ছে না তার। এক অর্থে বোকামি ছাড়া কিছুই নয় এসব, যে কারণেই তার গলায় রোগ হয়ে থাক না। কেন, মদ আর সিগারেট ছেড়ে দিলেই যে উপকার হবে তা হয়তো ঠিক নয়। অন্তত খুব বেশি কিছু উপকার আশা করা বৃথা। দূর ছাই, ভাবছে জনি, নিজের সাথে ছলচাতুরীর কোন মানে হয় না, ছেড়ে দিলে উপকার তো সামান্য একটু হলেও হতে পারে, আর ওই সামান্য উপকারও হাতছাড়া করা উচিত নয় ওর, এখন যখন টিকে থাকার জন্যে যুদ্ধ করার একটা সুযোগ পাওয়া গেছে।
