হেসে নিজের গ্লাসে হুইস্কি ভরে নিল জনি। ওই অস্কার পুরস্কারটা আমি যদি পাই, আমার ছোট্ট মেয়েদের মত দাপট দেখাবার শক্তিও আর অবশিষ্ট থাকবে না আমার মধ্যে। গলাটা গেছে, ওটা যদি ফিরে পেতাম, চিন্তা করতাম না, আবার আমি কেউকেটা হয়ে উঠতে পারতাম। বুঝতে পারছি, অভাগার কপাল পুড়েছে, গলাটা ফিরে পাবার কোন আশাই নেই। কিন্তু আমার গড ফাদার জানলেন কিভাবে পুরস্কারটা আমি পাচ্ছি না? ঠিক আছে, বিশ্বাস করছি তিনি জানেন। তার জানায় কখনও ভুল থাকে না।
মোটা একটা চুরুট ধরাল হেগেন। আমরা জানতে পেরেছি তোমার প্রার্থীপদ সমর্থন করার জন্যে স্টুডিওর একটা কানাকড়িও খরচ করবে না জ্যাক ওলটস। শুধু তাই নয়, যারা ভোট দেবে তাদের প্রত্যেককে খবর পাঠিয়ে জানিয়ে দিয়েছে। যে পুরস্কারটা তুমি পাও তা সে চায় না। আরেকজন সভাব্য প্রার্থী যাতে তোমার মতই বিরোধীতার সম্মুখীন হয় তার জন্যেও যথাসাধ্য চেষ্টা করছে সে। ঘষ দেবার সমস্ত কায়দা কাজে লাগাচ্ছে–চাকরি, টাকা, মেয়েমানুষ–সব। আর এসব সে করছে ছবিটার কোন ক্ষতি না করেই বা যতটা কম ক্ষতি করে পারা যায়।
কাঁধ ঝাঁকাল জনি। গ্লাসে হুইস্কি ভরে সেটা ঢকঢক করে গিলে নিল। তাহলে শেষ হয়ে গেছি আমি।
ঠোঁটের একদিকের কোণ বেঁকে গেল, তীর তিরস্কারের দৃষ্টি ফুটে উঠল হেগেনের চোখে। কি মনে করো, মদ গিললে ভাল হয়ে যাবে তোমার গলা? বলল সে।
দূর হও তুমি! খেঁকিয়ে উঠল জনি।
নিমেষে নিভাঁজ, গম্ভীর হয়ে উঠল হেগেনের চেহারা। বলল, ঠিক আছে, শুধু কাজের কথাই হবে তোমার সাথে।
গ্লাসটা কাত করে হুইস্কিটুকু ফেলে দিল জনি, উঠে পড়ল সোফা ছেড়ে, এগিয়ে এসে দাঁড়াল হেগেনের সামনে। কথাটা বলে অন্যায় করেছি আমি, টম, বলল সে। দুঃখিত। আসলে জ্যাক ওলটসকে খুন করতে চাই, কিন্তু কথাটা গড ফাদারকে বলার সাহস আমার নেই, সেই রাগের ঝালটা তোমার ওপর ঝাড়ছি আমি। চোখ দুটো ছলছল করছে জনির। হাতের খালি গ্লাসটা ছুঁড়ে মারল সে, কিন্তু এমন দুর্বলভাবে যে মোটা কাঁচের ভারি গ্লাসটার কোথাও চিড় পর্যন্ত ধরল না, দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে ওর পায়ের কাছে গড়িয়ে ফিরে এল সেটা। প্রচণ্ড রাগে সেটার দিকে তাকিয়ে আছে ও। তারপর হঠাৎ হেসে উঠল। বলল, হায় যীশু?
কামরার অপর প্রান্তে সরে গিয়ে হেগেনের দিকে মুখ করে বসল ও। তুমি তো জানো, একটানা অনেকদিন সব কিছু ঠিক নিজের ইচ্ছা মত করে পেয়েছি আমি। তারপর জিনিকে শ্রাগ করার সাথে সাথে সব কিছু বিরূপ হয়ে উঠল আমার জীবনে। গলাটা হারালাম। আমার রেকর্ড আর বিক্রি হয় না। কোন ছবিতে কাজ করার জন্যে আমাকে কেউ আর ডাকে না। আর এই ঠিক সময়ে মুখ ফিরিয়ে নিলেন আমার গড় ফাদার, ফোনে কথা বলেন না; নিউ ইয়র্কে এলে দেখা দেন না। তাঁর আর আমার মাঝখানে সব সময় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছ তুমি, তোমার ওপরই রাগ হয়েছে আমার, কিন্তু সেই সাথে এও জানতাম যে ডনের নির্দেশ ছাড়া এ-কাজ করছ না তুমি। কিন্তু তার ওপর কিভাবে চটি আমি! সষ্টিকর্তার ওপর চটে ওঠার মত অসম্ভব একটা ব্যাপার নয় সেটা? তাই তোমার ওপরই যত রাগ আমার। কিন্তু তুমি বরাবরই সঠিক পথ দেখিয়ে এসেছ। আমি যে সত্যি ক্ষমাপ্রার্থী তা তোমার পরামর্শ গ্রহণ করে প্রমাণ করব। গলাটা ফিরে না পাওয়া পর্যন্ত মদ ছোঁব না, ঠিক আছে?
মাফ চাওয়াটা আন্তরিক বুঝতে পেরে রাগ পানি হয়ে গেল হেগেনের। পঁয়ত্রিশ বছরের এই খোকার মধ্যে নিশ্চয়ই কিছু না কিছু একটা আছে, তা নাহলে ডন এত স্নেহ করতেন না। ভুলে যাও, জনি। জনির কাতর অনুভূতির গভীরতা উপলব্ধি করে অস্বস্তিবোধ করছে ও, অস্বস্থিবোধ করছে এই সন্দেহ করে যে এই কাতরতার উৎস ভীতিও হতে পারেন তার বিরুদ্ধে চলে যাবেন এই ভীতি। অথচ কারও কথায় প্রভাবিত হয়ে কখনই কোন কারণে কারও বিরুদ্ধে চুলে যান না ডন। স্নেহ ভালবাসার ব্যাপারেও ডন শুধু নিজের ইচ্ছেয় পরিচালিত হন।
অবস্থা অতটা খারাপ নয়, জনিকে বলল ও! ডন জানিয়েছেন ওলটস তোমার বিরুদ্ধে যাই করুক না কেন, সবই তিনি বাতিল করতে পারবেন। বলেছেন, প্রায় নিশ্চিত ভাবে ধরে নিতে পারো পুরস্কারটা তুমিই পাবে। কিন্তু তিনি মনে করেন, পুরস্কার পেলেই তোমার সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে না। তিনি জানতে চেয়েছেন, তুমি নিজেই একজন প্রযোজক হবার মত যোগ্যতা এবং সাহস রাখো কিনা। আগা থেকে গোড়া পর্যন্ত একটা ছবি বানাতে পারবে?
দুই চোখে অবিশ্বাস নিয়ে কয়েক সেকেণ্ড তাকিয়ে থাকল জনি। কিভাবে? কিভাবে তা সম্ভব? কিভাবে ডন আমাকে পুরস্কারটা পাইয়ে দিতে পারেন?
তীক্ষ্ণ গলায় বলল হেগেন, এটাই বা তুমি এত সহজে বিশ্বাস করতে পারছ কিভাবে যে ওলটস যা পারবে তোমার গড ফাদার তা পারবেন না? আমাদের চুক্তির অপর অংশ সম্পর্কে তোমার মনে আস্থার ভাব আনা দরকার, তাই কথাটা তোমাকে না বলে পারছি না। দেখো, কথাটা যেন দুকান না হয়। তোমার গড ফাদার জ্যাক ওলটসের চেয়ে অনেক বেশি ক্ষমতাবান। এর চেয়ে আরও অনেক কঠিন পরিবেশেও তার প্রভাব আর ক্ষমতার তুলনা হয় না। তোমাকে তিনি পুরস্কারটা পাইয়ে দেবেন-কিভাবে? তিনি পরিচালনা করেন বরং বলা উচিত, যারা এই শিল্পের ইউনিয়নগুলো পরিচালনা করে, তিনি তাদেরকে পরিচালনা করেন। যারা ভোট দেয় তাদের সবাই, বা তাদের প্রায় সবাই তার কথা মেনে চলে। তবে, অবশ্যই তোমাকেও ভাল হতে হবে, প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মোগ্যতা তোমারও থাকতে হবে। জ্যাক ওলটসের চেয়ে অনেক অনেক বেশি বুদ্ধি রাখেন তোমার গড ফাদার। সংশ্লিষ্ট লোকদের কাছে গিয়ে তিনি তাদের মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে বলবেন না যে, জনি ফন্টেনকে ভোট দাও তা না হলে চাকরি হারাও। যেখানে গায়ের জোর খাটে না বা খাটালে মানুষের মন আহত হয় সেখানে তিনি এসব প্রয়োগ করেন না। তিনি এদেরকে তোমার পক্ষে ভোট দেওয়াবেন, কারণ এরা তোমাকেই ভোট দিতে চায়। কিন্তু তা এরা চাইবে না, যদি না তোমার গড ফাদার এ-ব্যাপারে আগ্রহ দেখান। এখন তুমি আমার কথায় পূর্ণ আস্থা রেখে বিশ্বাস করো, পুরস্কারটা তুমিই পাচ্ছ। মনে রেখো, তিনি না চাইলে সারা জীবন চেষ্টা করলেও ওটার নাগাল পাবে না তুমি।
