মৃদু হেসে বলল জিনি, তুমি যে বদলেছ, তা টেরই পাবে না টম।
মেয়েরাও বেরিয়ে এসে গাড়ি পর্যন্ত এল জনিকে বিদায় জানাতে। মেয়েরা ওর হাত দুটো ধরে আছে। স্ত্রী একটু পিছনে। কত সুখী দেখাচ্ছে জনিকে, লক্ষ করে অদ্ভুত এক আনন্দে ভরে উঠল জিনির বুকও।
গাড়ির কাছে পৌঁছে পালা করে দুই মেয়েকে শূন্যে, অনেক উঁচুতে তুলে মিল জনি, তারপর নামাবার সময় চুমো খেলো। সবশেষে জিনিকে চুমো খেয়ে উঠে বসল, গাড়িতে। ঠায় দাঁড়িয়ে থেকে অনেকক্ষণ ধরে বিদায় নেয়া পছন্দ করে সে।
ওর সহকারী এবং জনসংযোগ কর্মী সব ব্যবস্থা করে রেখেছে। সোফার সহ একটা ভাড়াটে গাড়ি অপেক্ষা করছে ওর বাড়িতে। জনসংযোগ কর্মী অর্থাৎ পি. আর, অপর এক সহযোগীকে নিয়ে বসে আছে গাড়িতে। নিজের গাড়ি পার্ক করে ওই গাড়িতে চড়ল জনি। সাথে সাথে গাড়ি ছেড়ে দিল সোফার, এয়ারপোর্টের দিকে যাচ্ছে ওরা।
এয়ারপোর্টে পৌঁছে পি, আর, নেমে গেল টম হেগেনকে রিসিভ করতে, গাড়ি থেকে নামল না জনি। একটু পরই গাড়িতে উঠল টম হেগেন। জনি তার সাথে হ্যাণ্ডশেক করল। গাড়ি আবার ছুটতে শুরু করেছে ফিরতি পথে।
জনির বাড়িতে পৌঁছুল গাড়ি। নিরিবিলি লিভিংরূমে টম হেগেনের মুখোমুখি হলো জনি। দুজনের সম্পর্কের মধ্যে ঠাণ্ডা, নিস্তেজ একটা ভাব আছে। কনি কর্লিয়নির বিয়ের আগে, ডন যখন ওর উপর রেগে ছিলেন, তখন তার সাথে যোগাযোগ করার পথে একমাত্র বাধাদানকারীর ভূমিকা নিয়েছিল এই টম হেগেন, কথাটা আজও ভোলেনি জনি। রাগটা তার রয়েই গেছে।
এই অবাঞ্ছিত ভূমিকার জন্যে হেগেন কখনও কোন অজুহাতও দেখায়নি। ওর পক্ষে তা সম্ভবই ছিল না। গরম লোহা দিয়ে অপ্রীতিকর ছ্যাঁকা দেয়াটাও ওর চাকরির একটা অংশ, কিন্তু এই শাস্তিটা যে ডনের তরফ থেকে এল তা লোকে ভয়ে আর শ্রদ্ধায় বিশ্বাস করতে প্রস্তুত থাকে না কখনও। যত রাগ তাদের এই টম হেগেনের ওপর, অথচ এ সবই ডনের প্রাপ্য।
তোমার গড ফাদার কেন আমাকে পাঠিয়েছেন তা তো তোমাকে আমি আগেই বলেছি, আনুষ্ঠানিক ভঙ্গিতে শুরু করল টম হেগেন। নিশ্চয়ই জানো যে তোমার জন্যে ভাল হবে এমন সব কাজ তিনি করতে চান। যে দায়িত্বটা আমার ঘাড়ে চেপেছে সেটা আমি বড়দিনের আগেই নামিয়ে ফেলতে চাই।
কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল জনি, ছবির কাজ তো শেষ। পরিচালক চৌকশ লোক, কাজ দেখাবার প্রচুর সুযোগ করে দিয়েছে আমাকে সে। ওলটস এখনও আমার ক্ষতি করতে চাইলেও ছবিতে আমার দৃশ্যগুলো এতই গুরুত্বপূর্ণ যে কাঁচি দিয়ে সেগুলো কেটে ফেলে দিতেও পারবে না। আর যাই হোক, এক কোটি ডলারের একটা ছবির বারোটা বাজানো তো আর সম্ভব নয় তার পক্ষে। তার মানে আমার অভিনয় দর্শকরা কতটা ভাল হয়েছে বলে মনে করবে তার ওপর নির্ভর করছে সব।
সতর্ক ভঙ্গিতে জানতে চাইল হেগেন, এখন প্রশ্ন হলো, এই একাডেমি পুরস্কারটা কি সত্যিই একজন অভিনেতার জন্যে গুরুত্বপূর্ণ? এতে কি আরও উন্নতির পথ সুগম হবে? যশ, খ্যাতি সত্যিই কি বাড়বে? নাকি আর সব সাধারণ ব্যাপারের মত প্রচারণার খাতিরে, নেহাত মোহের বশে এই পুরস্কার পেতে চায় লোকে?
নিঃশব্দে হাসছে জনি। বলল, যশ, খ্যাতি এসব তো আমার গড ফাদারের দরুকার নেই। বা তোমারও। না টম, জিনিসটা অত ঠুনকো নয়। একটা,একাডেমি পুরস্কার একজন অভিনেতাকে দশ বছরের স্থায়ীত্ব দিতে পারে। চরিত্র বাছাই করার অধিকার এসে যায় তার। লোকজন তার সাথে দেখা করতে যায়। সব কিছু নয় বটে, অমরত্ব প্রাপ্তি নয়, কিন্তু একজন অভিনেতার জীবনে এরচেয়ে বড় কিছু আর হতেও পারে না। পুরস্কারটা আমি পাব বলে ভরসা রাখি। আবার যদি উঠি, এটাই আমাকে ওঠাবে। পাব, কিন্তু আমি খুব বড় অভিনেতা বলে নয়, একজন গায়ক হিসেবে প্রাথমিক পরিচিতিটা আছে আর এই ছবিটায় আমার ভূমিকা সব দিক থেকে নিচ্ছিদ্র বলে পাব। ঠাট্টা নয়, সত্যি খুব ভাল অভিনয় করেছি আমি।
কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল হেগেন, পরিস্থিতির সব দিক বিবেচনা করে তোমার গড ফাদার আমাকে ঠিক উল্টো কথা বলছেন। তিনি বলছেন, পুরস্কারটা পাবার কোন সম্ভাবনা নেই তোমার।
কথাটা শুনেই রেগে ঠাঁই হয়ে উঠল জনি। কি আবোল-তাবোল বকছ। ছবিটা এখনও সম্পাদনাই করা হয়নি, দেখানো CT দূরের কথা। আর ডন তো সিনেমা। ব্যবসার ধারে কাছেও নেই। স্রেফ এ ধরনের প্রলাপ বকার জন্যে তিন হাজার মাইল উড়ে কেন আমার কাছে এসেছ তুমি? হেগেনের কথায় এমন ধাক্কা খেয়েছে জনি যে চোখে প্রায় পানি বেরিয়ে আসার অবস্থা হয়েছে ওর।
কণ্ঠরে উদ্বেগ ফুটিয়ে তুলে বলল হেগেন, দেখো, জনি, ছবির জগতের এসব বিষয়ে বিন্দুবিসর্গ কিছুই আমি জানি না। মনে রেখো, আমি ডনের নিজস্ব সংবাদদাতা ছাড়া কিছুই নই। তবে তোমার এ-বিষয়টা নিয়ে বেশ কয়েকবার আলোচনা করেছি আমরা। তিনি তোমার সম্পর্কে উদ্বিগ্ন, তোমার ভবিষ্যতের কথা ভেবে চিন্তিত। তিনি মনে করেন, তার সাহায্য এখনও দরকার তোমার। এমন একটা সমাধান দিতে চান তিনি যাতে তোমার সমস্ত সমস্যার স্থায়ী সুরাহা হয়ে যাবে। সেই উদ্দেশ্যেই এখানে আমার আসা, যাতে বাক নিয়ে তোমার অনুকূলে বইতে শুরু করে বাতাস। কিন্তু আর ছেলেমানুষি নয়, জনি, এবার তোমাকে গুরুত্ব দিয়ে সব ব্যাপার বুঝতে শিখতে হবে। নিজেকে একজন গায়ক বা অভিনেতা ধরে, নিয়ে চিন্তাভাবনা করা থামাও দেখি। নিজেকে প্রধান ব্যক্তি বলে মনে করতে শেখো, মনে করো তুমি হর্তাকর্তা-বিধাতা। দাপট দেখিয়ে বেড়াবার জন্যে তৈরি হয়ে নাও।
