রাঙা হয়ে উঠল জিনির মুখ। বলল, না।
ওর দিকে তাকিয়ে হাসছে জিনি। হাসছে জনিও। এখনও সদ্ভাব বজায় আছে ওদের মধ্যে। পরদিন অনেক বেলায় ঘুম ভাঙল জনির। দেখল জানালার পর্দাগুলো সরানো হয়েছে, সেই ফাঁক দিয়ে রোদ ঢুকছে ঘরে। তুমি কোথায়, জিনি? চেঁচিয়ে উঠল জনি। অনেক দেরি করে ফেলেছি। ব্রেকফাস্ট পাব?
দাঁড়াও, একসেকেণ্ড, দূর থেকে ভেসে এল জিনির কণ্ঠস্বর।
সত্যি এক সেকেণ্ড। নিশ্চয়ই সব কিছু তৈরি করে রেখেছিল জিনি, দিনের প্রথম সিগারেট ধরাতে না ধরাতে খুলে গেল দরজা, চাকা লাগানো ব্রেকফাস্টের ট্রেটা ঠেলে নিয়ে ভিতরে ঢুকছে ওর ছোট ছোট মেয়ে দুটো।
কচি মুখগুলো এত সুন্দর, দেখে ব্যথায় বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল জনির। পরিষ্কার, উজ্জল চোধগুলোয় চিকচিক করছে কৌতূহল, ওর কাছে ছুটে আসার জন্যে ব্যর্থতায় উদ্ভাসিত হয়ে আছে মুখগুলো। সেকেলে ঢংয়ে লম্বা লম্বা বেণী করে বাঁধা ওদের চুল। পরনের ফ্রকগুলোও সেকেলে। পেটেন্ট লেদারের সাদা জুতো পায়ে। ইশারা করতেই ছুটে এল ওরা। ট্রের পাশে দাঁড়িয়ে বাবার সিগারেট নেভানো দেখছে, অপেক্ষা করছে কখন ওদেরকে দুহাত বাড়িয়ে ডাকবে বাবা। ইশারা করতেই ছুটে এল ওরা। ওদের কচি মুখে কর্কশ দাড়ি গজানো মুখ ঘষে দিচ্ছে জনি, ওরাও চেঁচামেচি জুড়ে দিয়েছে। দরজায় উদয় হলো জিনি, ব্রেকফাস্ট ট্রেটা ঠেলে নিয়ে এল সে বাকি পথটা, যাতে বিছানায় শুয়েই নাস্তা সারতে পারে জনি। খাটের কিনারায় ওর পাশে বসল জিনি, কাপে কফি ঢেলে দিচ্ছে, মাখন লাগিয়ে দিচ্ছে রুটিতে। সোফায় বসে মেয়ে দুটো দেখছে বাবাকে। বালিশের দখল নিয়ে লড়াই করার বয়স পেরিয়ে এসেছে ওরা, বাবার কাছ থেকে আদর পাবার পর এরই মধ্যে যে যার এলোমেলো চুল ঠিকঠাক করে নিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। কি সর্বনাশ, ভাবছে জনি, কদিন পরই যে সেয়ানা হয়ে যাবে ওরা! ছায়ার মত লেগে থাকবে ওঁদের পিছনে হলিউডের ছোকরাগুলো। মেয়েদেরকে টোস্ট আর বেকনের ভাগ দিচ্ছে জনি, কফির কাপে চুমুক দিতে দিচ্ছে।
দুচারজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু আর জিনি ছাড়া কেউ জানে না, মেয়েদেরকে কি ভীষণ ভালবাসে জনি। বিয়ে ভেঙে বাড়ি ছাড়া হবার সময় এই তীব্র ভালবাসাই সবচেয়ে বেদনাময় হয়ে উঠেছিল। ওদের বাবার পদে যাতে আসীন থাকতে পারে তার জন্যে জনি কোর্টে মামলা পর্যন্ত লড়েছে। কৌশলে জিনিকে জানিয়ে দিয়েছিল ও, সে যদি আবার বিয়ে করে তাহলে খুশি হবে না ও, ঈর্ষাজনিত কোন কারণে নয়, মেয়েদের বাবার পদ হারাতে হবে বলে। ওদেরকে টাকা-পয়সা দেবারও এমন ব্যবস্থা করেছিল যাতে বিয়ে না করলেই বেশি লাভ হয় জিনির। আভাসে দুজনের মধ্যে এমন কি এই বোঝাঁপড়াও হয়ে গেছে যে জিনি ইচ্ছা করলে গোপন প্রেমিক পর্যন্ত জোটাতে পারবে, কিন্তু ওদের পারিবারিক জীবনে তার বা তাদের প্রবেশ করা চলবে না।
জিনিকে সম্পূর্ণ বিশ্বাস করে জনি। তাছাড়া জানে, যৌন বিষয়ে সব সময়ই গোড়া আর লাজুক সে। জনি তাকে কত টাকা দিয়েছে তা জানার আশায় তার পিছনে ঘুর ঘুর করে বেড়ায় হলিউডের রোমিওরা, স্বামীর কাছ থেকে আরও কত রকম সুযোগ সুবিধে আদায় করে দেয়া যায় সে-ব্যাপারে অযাচিত পরামর্শ দান করে তাকে। এখন পর্যন্ত সবাইকে শুধু নিরাশই করেছে জিনি।
গতরাতে একসাথে শুতে চাওয়ায় জিনি ভুল বুঝবে, সে ভয় নেই জনির। দুজনের কেউই আর আগের সম্পর্কে ফিরে যেতে চায় না। সৌন্দর্য আর রূপের পূজারী জনি, এটা জিনি বুঝতে পারে। তার চেয়ে শতগুণ সুন্দরী মেয়েদের প্রতি জনির আকর্ষণ দুর্নিবার। কে না জানে সহকর্মী চিত্রনায়িকাদের সাথে কমপক্ষে একবার করে শোবেই জনি। জনির সুকুমার মাধুর্যের প্রতি মেয়েদেরও রয়েছে অদম্য আকর্ষণ।
টমের প্লেন আসতে খুব বেশি দেরি নেই, বলল জিনি। কাপড়চোপড় পরে তৈরি হয়ে নাও। আদরের ধমক লাগিয়ে মেয়েদেরকে ঘর থেকে বের করে দিল সে।
হুঁ, বলল জনি। ভাল কথা, জিনি, তুমি জানো বিয়েটা ভেঙে যাচ্ছে আমাদের? আবার একজন বন্ধনহীন মুক্ত পুরুষ হয়ে যাচ্ছি আমি।
জনির কাপড় পরা দেখছে জিনি। কনি কর্লিয়নির বিয়ের পর পরই ওদের মধ্যে গড়ে উঠেছে নতুন একটা সুসম্পর্ক। সেই থেকে এ-বাড়িতে এক প্রস্থ পোশক রাখে জনি।
আর মাত্র দুহপ্তা বাকি বড় দিনের, বলল জিনি। তুমি এখানে থাকবে ধরে নিয়ে উৎসবের আয়োজন করব?
ছুটির কথা এই প্রথম মাথায় ঢুকল জনির। যখন ভাল গাইতে পারত তখম কত জায়গা থেকে লোভনীয় আমন্ত্রণ আসত, তবু সে-সব দিনে বড় দিনকে পবিত্র একটা উৎসব বলেই মনে হত ওরা, এবারের বড় দিনটাও যদি হারাতে হয়, এই নিয়ে দুবার হবে। গত বছর বড়দিনে স্পেনে ছিল ও, দ্বিতীয় স্ত্রীকে বিয়েতে রাজি করাবার সাধনায়।
হ্যাঁ, বলল জনি। বড়দিন আর তার আগের দিনটা। নিউ ইয়ারস ঈভ অর্থাৎ নতুন বছরের আগের রাত সম্পর্কে কিছু বলল না ও। কিছুদিন পরপরই উন্মত্ত, বেপরোয়া একটা রাতের দরকার হয় ওর, ওটা হবে সেই রকম একটা রাত। বন্ধু বান্ধব নিয়ে হৈ-চৈ করবে, প্রাণ ভরে মদ খাবে। তখন সেখানে বউ-টউ থাকলে পোষাবে না।
জ্যাকেটটা পরতে ওকে সাহায্য করল জিনি, ব্রাশ দিয়ে ঝেড়ে দিল সেটা। পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে সব সময়ই একটা খুঁতখুঁতে ভাব থেকে যায় জনির মধ্যে। লক্ষ করল জিনি, আজ যে শার্টটা পরেছে সেটার ধোলাই পছন্দসই হয়নি বলে ভুরু কোঁচকাল জনি। অনেক দিন ব্যবহার করা হয়নি হাতার বোতামগুলোও, আজকাল ও এত জমকালো আর রঙচঙে বোম পরে না।
