কানে ঢুকতেই ভার্জিনিয়ার কণ্ঠস্বর চিনতে পারল ও। ওর যখন দশ বছর বয়স, এক সাথে ফোর-বি ক্লাসে পড়ত দুজনে, সেই প্রথম শুনেছিল ওই কণ্ঠস্বর। শোনো, জিনি, তুমি কি খুব ব্যস্ত থাকবে আজ রাতে? একটু সময়ের জন্যে আসতে পারি তোমার কাছে?
বেশ, বলল জিনি। মেয়েরা কিন্তু সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। আমি ওদের ঘুম ভাঙাতে চাই না।
ঠিক আছে, বলল জনি। আমি তোমার সাথেই একটু কথা বলতে চাই আর কি।
অপরপ্রান্তে একটু ইতস্তুত করুল জিনি, তারপর খুব সাবধানে, যাতে কোন দুশ্চিন্তার ভাব প্রকাশ না পায়, ধীরে শান্ত গলায় বলল, গুরুতর কোন ব্যাপার নাকি? জরুরী কিছু?
না, বলল জনি। ছবির কাজ শেষ হয়ে গেছে কিনা, তাই ভাবলাম তোমাকে একটু দেখে আসি, একটু গল্প করে আসি। যদি মনে করে ওদের ঘুম ভেঙে যাবে না তাহলে হয়তো মেয়েদেরকেও একবার দেখা হয়ে যায়।
ঠিক আছে, বলল জিনি। ছবিতে যে ভূমিকাটা চেয়েছিলে তুমি সেটা পেয়েছ শুনে খুশি হয়েছিলাম।
ধন্যবাদ, বলল জনি। আধঘণ্টার মধ্যে আসছি আমি।
বেভারলি হিলসের বাড়িটার সামনে পৌঁছুল জনি, এটাই একদিন বাসস্থান ছিল ওর। গাড়ির ভিতর চুপ করে বসে থাকল ও, তাকিয়ে আছে একদৃষ্টিতে বাড়িটার দিকে। গড ফাদারের একটা কথা মনে পড়ে গেল তার, তিনি বলেছিলেন, জীবনটাকে যেভাবে ইচ্ছা গড়ে নেয়া যায়। ইচ্ছাটা কি জানা থাকলেই চলে, তাতেই যেটুকু সুবিধে দরকার পাওয়া যায়। কিন্তু, ভাবছে জনি, ওর নিজের ইচ্ছাটা কি?
ওর প্রথম স্ত্রী ভার্জিনিয়া ওর জন্যে অপেক্ষা করছে দরজায়। ছোটখাটো গড়ন, লাবণ্যময়ী, সুন্দর গাঢ় রঙের চুল, মিষ্টি ইতালীয় মেয়ে। পাশের বাড়ির যুবতী, অন্য কোন পুরুষের দিকে তাকাবে না কখনও, সে সময় এই ব্যাপারটাকেই সবচেয়ে বড় কথা বলে মনে হয়েছিল। ওকে কি তার এখনও আপন করে পেতে ইচ্ছে করে, প্রশ্নটা করে নিজের কাছ থেকে উত্তর পেল জনি, না। তার একটা কারণ হলো, জিনির সাথে আর প্রেম করা চলে না, পরস্পরের প্রতি যে ভালবাসা ছিল সেটায় এখন ঘুণ ধরেছে। যৌন সম্পর্কের কথা বাদ দিলেও আরও কিছু কিছু ব্যাপার আছে যা কখনও সহ্য করতে বা ক্ষমা করতে পারে না জিনি। তবে এখন আর ওদের মধ্যে কোন শত্রুতাও নেই।
ওকে কফি খেতে দিল জিনি, বসার কামরায় আরাম করে বসিয়ে বাড়িতে তৈরি মিষ্টি খাওয়াল। বলল, পা মেলে দিয়ে লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ো তুমি, তোমাকে খুব ক্লান্ত দেখাচ্ছে।
জুতো আর কোট খুলে ফেলল জনি, টাইটা ঢিলা করে দিল।
জনির সামনে একটা চেয়ারে বসল জিনি, মৃদু গাম্ভীর্যের সাথে একটু হেসে বলল, ভারি মজার ব্যাপার তো!
কফিতে চুমুক দিচ্ছিল জনি, হাতটা কেঁপে যাওয়ায় কাপ থেকে ছলকে একটু কফি পড়ে গেল শার্টের উপর। কি ভারি মজার ব্যাপার? জানতে চাইল ও।
বিখ্যাত জনি ফন্টেন সন্ধ্যা কাটাবে, কিন্তু তার কোন সঙ্গী নেই।
বিখ্যাত জনি ফন্টেন যদি আবার সুস্থ হয়ে উঠতে পারে তাহলে সেটাই তার সবচেয়ে বড় ভাগ্য!
এত স্পষ্টভাবে সাধারণত কথা বলে না জনি। জিনি জানতে চাইল, সত্যি কিছু ঘটেছে নাকি?
নিঃশব্দে হাসল জনি। একটা মেয়ের সাথে ডেট ছিল, আমাকে সে বুড়ো আঙুল দেখিয়েছে। কিন্তু আশ্চর্য কি জানো, তাতে সাংঘাতিক স্বস্তি বোধ করেছি আমি।
কথাটা শেষ করেই পলকের জন্যে লক্ষ করল জনি, নিমেষের জন্যে জিনির মুখে রাগের ভাব ফুটে উঠেই মিলিয়ে গেল।
ওসব বাজে মেয়েদের ব্যাপার নিয়ে মন খারাপ কোরো না, বলল জিনি। মেয়েটা হয়তো ভেবেছে ধরাছোঁয়া না দিলেই তোমার আগ্রহ বেড়ে যাবে।
মেয়েটা ওকে প্রত্যাখ্যান করেছে বলে মেয়েটার উপর রেগে যাচ্ছে জিনি, ব্যাপারটা বুঝতে পেরে মজা লাগছে জনির। বলল, ধেত্তেরী হাই, এসব কথা থাক, চুলোয় যাক ওসব, আমার বিরক্তি ধরে গেছে। এক দিন তো আমাকে পরিণত হতে হতই, সুতরাং নারী জাতির ব্যাপারে একটু কষ্ট তো আমাকে পেতেই হবে। তুমি অন্তত জানো, শুধু চেহারার জোরে খুব একটা সুবিধে করতে পারি না আমি।
বিশ্বস্ততা বজায় রেখে বলল জনি, ক্যামেরায় তোলা তোমার ছবির চেয়ে তুমি আসলে অনেক ভাল দেখতে।
এদিক ওদিক মাথা নাড়ল জনি। মেদ জমছে শরীরে, মাথায় টাক পড়ছে। এই ছবিটার গুণে যদি হারিয়ে ফেলা খ্যাতি ফিরে না আসে, পিটসা পাই তৈরি করতে শেখা উচিত আমার। তা নাহলে তোমাকে পর্দায় নামানো যেতে পারে, খাসা চেহারা তোমার।
জিনির দিকে তাকালে বোঝা যায় পঁয়ত্রিশের কম নয় বয়স। সযত্নে লালিত হলেও, পঁয়ত্রিশ তো বটে। আর হলিউডে পঁয়ত্রিশ যা একশোও তাই। সুন্দরী তরুণী মেয়েরা হাজারে হাজারে ছড়িয়ে আছে শহরে, এদের কেউ এক বছর টেকে, কেউ বা দুবছর। এদের মধ্যে এমন রূপসী মেয়েও আছে যাদের দিকে তাকালেই হার্টবিট বন্ধ হয়ে আসে। যতক্ষণ না বুলি ছাড়ছে, যতক্ষণ না সাফল্যের নির্লজ্জ লোভে চেহারার অপরূপ মাধুর্য ঢাকা পড়ে যাচ্ছে। শারীরিক সৌন্দর্যের দিক থেকে সাধারণ মেয়েরা এদের সাথে প্রতিযোগিতায় কখনোই পেরে উঠতে পারে না। বুদ্ধিমত্তা, মাধুর্য, ব্যক্তিত্ব আর গাম্ভীর্যের কথা তুলে লাভ নেই, ওইসব মেযেদের আনকোরা সৌন্দর্যের কাছে সব মান হয়ে যায়। হলিউডে এত সুন্দরী মেয়ে না থাকলে সাধারণ সুশ্রী মেয়েরাও কিছু সুযোগ সুবিধে পেত। আর কে না জানে যে এই সব সুন্দরী মেয়েদের প্রায় সবাইকে চাইলেই অধিকার করতে পারে জনি ফন্টেন। তার মানে, ভাবছে জিনি, কথাগুলো শুধু তাকে খুশি করার জন্যেই বলা হলো। এসব ব্যাপারে জনি বরাবরই ভাল ব্যবহার করে থাকে। সাফল্যের শিখরে উঠেও মেয়েদের প্রতি সৌজন্য দেখাতে বা তাদের প্রশংসা করতে কার্পণ্য করে না কখনও। সিগারেট ধরাবার জন্যে লাইটার জ্বেলে দেয়, নিজে উঠে গিয়ে খুলে দেয় দরজা।
