এইভাবে শুরু হয়ে গেল উনিশশো ছেচল্লিশ সালের পাঁচ পরিবারের যুদ্ধ।
২.৫ চাকরটাকে হাত নেড়ে বিদায়
০৫.
চাকরটাকে হাত নেড়ে বিদায় করে দিয়ে জনি ফন্টেন বলল, সকালে দেখা হবে, বিলি নিগ্রো বাটলারুপ্রকাণ্ড ডাইনিং-কাম-সীটিং রুম থেকে বেরিয়ে যাবার আগে বাও করল, অনেকটা ঘনিষ্ঠ বন্ধুর মত, তাও,ডিনারের জন্যে একজন মেহমান উপস্থিত রয়েছে বলে, নাহলে বাও-ও করত না সে।
শ্যারন মুর নামে-র অতিথিটি নিউ ইয়র্ক শহরের গ্রিনিচ ভিলেজ থেকে হলিউডে এসেছে তার পুরানো প্রেমিক প্রযোজিত একটা ছায়াছবিতে অভিনয় করার চান্স পাওয়া যায় কি না দেখতে। মেয়েটা যখন সেটা দেখতে আসে জনি তখন ওলটসের ছবিতে অভিনয় করছে। ও লক্ষ করে, মেয়েটা অল্প বয়েসী, তাজা ঝরঝরে, মিষ্টি, আর সুরসিকা। নিজের বাড়িতে ওকে ডিনার খাওয়ার নিমন্ত্রণ জানায় সে। জনির ডিনারের নিমন্ত্রণ এরই মধ্যে খ্যাতি অর্জন করেছে, তা অনেকটা অলঙ্ঘনীয় আদেশের মতও বটে, এবং বলাই বাহুল্য যে নিমন্ত্রণটা সানন্দে গ্রহণ করেছিল মেয়েটি।
জনি সম্পর্কে যে-সব কথা প্রচলিত আছে তার প্রেক্ষিতে শ্যারন মুর ভেবে নিয়েছে ও তাকে প্রথমেই গপ্ করে গিলে নিতে চেষ্টা করবে। কিন্তু গোগ্রাসে মাংস গেলার হলিউডি ভঙ্গিটি ঘৃণার উদ্রেক করে জনির মধ্যে। ভুবন ভুলানো কোন গুণ, দেখতে না পেলে সে-মেয়ের সাথে শোয়না জনি। অবশ্য মাঝে মধ্যে খুব বেশি মদ খাবার পর সকালে যখন ঘুম ভাঙে, দেখে পাশে যে মেয়েটি শুয়ে রয়েছে তাকে সে চেনে না বা কখনও দেখেছে বলেও মনে পড়ে না। এখন যেহেতু পঁয়ত্রিশ বছর বয়স জনির, বিয়ে ভেঙেছে একটা, দ্বিতীয় স্ত্রীর সাথে বনিবনা হচ্ছে না, হাজার মেয়ের শরীর অধিকার করলেও, আগের সেই আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে ও। তবে শ্যারন মুরের মধ্যে এমন কিছু দেখেছে ও যে মেয়েটির প্রতি ওর ভিতর থেকে স্নেহ উথলে উঠেছে। সেটাই ওকে দাওয়াত করার কারণ।
খাওয়াদাওয়ার প্রতি তেমন আকর্ষণ নেই জনির, কিন্তু জানা আছে ওর, সুন্দরী মেয়েরা অভুক্ত থেকে টাকা জমায়, সেই টাকায় দামী পোশাক কেনে, আর কেউ দাওয়াত করলে অনেক দিনের জমে থাকা খিদে মিটিয়ে নেবার সুযোগটা হাতছাড়া করে না, তাই টেবিলে প্রচুর খাবারের আয়োজন রাখা হয়েছে। সাথে যথেষ্ট পানীয়ও রয়েছে বালতি ভর্তি শ্যাম্পেন ছাড়াও রয়েছে স্কচ, রাই, ব্রাণ্ডি, আর সাইডবোর্ডের উপর লিকার। প্লেটে সাজানো খাবার আর পানীয় পরিবেশন করল জনি। খাওয়া শেষ করে শ্যারনকে বিশাল সীটিংরুমে নিয়ে এল। কামরাটার একদিকের দেয়াল সম্পূর্ণ কাঁচের, বাইরে তাকালে প্রশান্ত মহাসাগর দেখা যায়। হাইফাই-এর উপর এলাফ্রিটজেরাল্ডের একগাদা রেকর্ড রেখে সোফার উপর শ্যারনের পাশে এসে বসল জনি। কিছুক্ষণ গল্প করে শ্যারন ছোটবেলায় কেমন ছিল তা আবিষ্কার করার চেষ্টা করল ও। শ্যারন কি ছেলে ঘেঁষা ছিল, নাকি ছেলে দেখলেই তাদেরকে ভাড়া করত? সে কি সাদামাঠা ভাবে থাকতে পছন্দ করত, নাকি খুব স্টাইল করত? নির্জনতা ভালবাসত, নাকি দলে ভিড়ে হৈ-হুঁল্লোড়ে মেতে থাকত? শুধু কথা বলার জন্যে নয়, এই সব ছোটখাটো তথ্য হৃদয় স্পর্শ করে ওর, এগুলো জেনে নরম হয়ে ওঠে ওর মনটা। মেলামেশা করার জন্যে কোমলতার প্রয়োজন হয়,ওর, এসব থেকে সেটুকু পেয়ে যায়।
সোফার উপর পাশাপাশি আরাম করে বসে আছে ওরা, শ্যারনের ঠোঁটে চুমা খেলো জনি। নিষ্কাম বন্ধুত্বের চুমো। নির্মল ভঙ্গিটা শ্যারনও বজায় রাখছে দেখে আর এগোল না জনি। বিশাল জানালার বাইরে চাঁদের আলোয় গভীর নীল মহাসাগরের সমতল বিস্তার দেখা যাচ্ছে।
তোমার কোন রেকর্ড বাজিয়ে শোনাচ্ছ না যে? একটু বিক্রপের সুরে জানতে চাইল শ্যারন। ওর দিকে ফিরে হাসল জনি। তাকে শ্যারন পরিহাস করছে দেখে মজা লাগছে ওর। আমাকে তুমি অতটা হলিউডি না ভাবলেও তো পারো, বলল ও।
কিছু বাজাও, বলল শ্যারন। না হয় গান গেয়ে শোনাও। সিনেমায় যেমনটি করে ওরা। তুমি গাইবে আর আমি উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠে একেবারে গলে পড়ব তোমার ওপর।
হেসে ফেলল জনি। অল্প বয়সে এই কাণ্ডই করত বটে ও, আর তার ফলও হত বেশ নাটকীয়। চেহারায় কামনার ভাব ফুটিয়ে বিগলিত মোহিনীর রূপ ধারণ করার সে কি আপ্রাণ চেষ্টা, মেয়েদের। মনগড়া একটা ক্যামেরার উদ্দেশে চোখে কামনামদির দৃষ্টি এনে নিজেদেরকে লোভনীর করে তোলার সাধনা শুরু হয়ে যেত। এখন আর কোন মেয়েকে গান গেয়ে শোনাবার কথা ভাবতেও পারে না জনি। একটা কারণ, কয়েক মাস ধরে গান গাইছে না ও, নিজের গলার উপর আস্থা নেই। দ্বিতীয় কারণ, পেশাদার গায়করা যে এত ভাল গান করে তা কতটা যান্ত্রিক সহযোগিতার উপর নির্ভরশীল সে-ব্যাপারে সাধারণ মানুষ বা সৌখিন শিল্পীদের কোন ধারণাই নেই। তবে, নিজের রেকর্ড বাজিয়ে শোনাতে পারে ও, কিন্তু আগের সেই তাজা উদ্দীপ্ত কণ্ঠস্বর শুনতে আজকাল কেমন যেন কুণ্ঠাবোধ করে ও। গলাটা তেমন সুবিধে লাগছে না, বলল-জনি, তাছাড়া কত আর নিজের গান শোনা যায়, বিরক্তি ধরে গেছে।
গ্লাসে চুমুক দিচ্ছে ওরা। শুনলাম এই ছবিটায় তুমি নাকি দারুণ অভিনয় দেখিয়েছ, যাকে বলে একেবারে মাত করে দেয়া। সত্যি টাকা পয়সা কিছু নাওনি?
