সলোযোর চোখ আর কানের ঠিক মাঝখানে ফুটো করে উল্টো দিক দিয়ে বেরিয়ে গেল বুলেটটা, ফিনকি দিয়ে বেরিয়ে আসা খানিকটা রক্ত আর খুলির টুকরো হতভম্ব ওয়েইটারের কোটের গায়ে ছিটকে পড়ল। বুঝতে পারছে মাইকেল, সলোযোকে আর গুলি করতে হবে না, একটাই যথেষ্ট।
শেষ মুহূর্তে মাথা ঘুরিয়েছিল সলোযো, পরস্পরের চোখের দিকে এক সেকেণ্ডের জন্যে তাকিয়েছিল ওরা, তার চোখে প্রাণ প্রদীপের আলো নিভে যেতে দেখেছে মাইকেল-ঠিক যেভাবে মোমবাতির শিখা দপ করে নিভে যায়, সেই রকম স্পষ্ট ভাবে।
ঘুরে ক্যাপ্টেন ম্যাকক্লাস্কির দিকে পিস্তল তাক করতে এক সেকেণ্ডও লাগল না মাইকেলের। ম্যাকক্লাস্কি সলোযোর দিকে এমন নিরুদ্বেগ বিস্ময়ের সাথে তাকিয়ে আছে যেন, ব্যাপারটার সাথে তার কোন সম্পর্কই নেই। নিজের বিপদ হতে পারে তা সে বিশ্বাস করছে না, তাই তাকে একটুও বিচলিত দেখাচ্ছে না। মাংস গাঁথা কাঁটা চামচটা এখনও ধরে রয়েছে, এইমাত্র চোখ দুটো ফেরাচ্ছে মাইকেলের দিকে। মুখে এমন একটা ক্ষুব্ধ আত্মপ্রত্যয়ের ভাব, যেন আশা করে আছে হয় এখুনি মাফ চাইবে মাইকেল নয়ত ছুটে পালিয়ে যাবে। তাই দেখে ট্রিগার টেপার সময় মৃদু মৃদু হাসছে মাইকেল।
জায়গা মত লাগল না বুলেট, লোকটা বেঁচে রয়েছে। গালটা ষাঁড়ের মত মোটা, সেটার ভিতর দিয়ে ঢুকেছে বুলেট। বিষম খেলো ম্যাকক্লাস্কি, যেন মাংসের বড় একটা টুকরো আটকে গেছে গলায়। খক খক করছে সে, তারপর বিদীর্ণ ফুসফুস থেকে গাঢ় রক্তের ঝর্ণা উঠে এল। পরমুহূর্তে আশ্চর্য শান্তভাবে, অত্যন্ত নিপুণতার সাথে তার পাকা চুলে ঢাকা মাথায় দ্বিতীয়বার গুলি করল মাইকেল।
ঝট করে দেয়াল ঘেঁষে বসা লোকটার দিকে ফিরল মাইকেল। এক চুল নড়েনি। লোকটা। স্থির একটা মূর্তি হয়ে আছে। এবার সে খুব সাবধানে টেবিলের উপর তুলল খালি হাত দুটো, তারপর অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিল।
টলতে টলতে পিছু হটছে ওয়েইটার, রান্নাঘরের দিকে যাচ্ছে সে, এখনও আতঙ্কে বিস্ফারিত হয়ে আছে তার চোখ দুটো, অবিশ্বাস ভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মাইকেলের দিকে।চেয়ারে এখনও বসে আছে সলোযো, টেবিলের গায়ে হেলান দিয়ে আছে শরীরটা। ভারি শরীর নিয়ে নিচের দিকে ঝুলে পড়েছিল ম্যাককুাস্কি, চেয়ার থেকে মেঝেতে পড়ে গেছে সে। শরীরের পাশে ঝুলে থাকা হাত থেকে পিস্তলটা ছেড়ে দিল মাইকেল, গায়ে মৃদু ধাক্কা খেয়ে নিচে পড়ে গেল সেটা, কোন শব্দ হলো না। মাইকেল দেখে নিয়েছে দেয়াল ঘেঁষে বসা লোকটা বা ওয়েইটার কেউই ওর পিস্তল ফেলে দেয়াটা লক্ষ করেনি। কয়েক পা দ্রুত এগিয়ে দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াল ও, খুলে ফেলল দরজাটা। ফুটপাথ ঘেঁষে এখনও দাঁড়িয়ে রয়েছে সলোযোর গাড়িটা, কিন্তু কোথাও ছায়া পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না ড্রাইভারের। বাঁদিকে ফিরে হনহন করে এগোচ্ছে মাইকেল, বাক নিয়ে হাঁটার গতি বাড়িয়ে দিল আরও। প্রায় সাথে সাথে হেডলাইট জ্বালা একটা ভাঙাচোরা সিডান ঘ্যাচ করে বেক করে দাঁড়িয়ে পড়ল ওর পাশে, দ্রুত খুলে গেল দরজাটা। লাফ দিয়ে গাড়িতে উঠে পড়ল মাইকেল, পরমুহূর্তে গাড়িটাও লাফ দিয়ে সগর্জনে ছুটতে শুরু করল। টেসিওকে গাড়ি চালাতে দেখছে মাইকেল। তার মেদহীন, নিশেভ, পরিচ্ছন্ন মুখটা শ্বেত পাথরের মত কঠোর।
সলোযোকে করলে? জানতে চাইল টেসিও।
টেসিওর ভাষা শুনে মুহূর্তের জন্যে বিমূঢ় হয়ে গ্লোল মাইকেল। কথার এই ভঙ্গি সাধারণত যৌন সঙ্গমের বেলায় ব্যবহার করা হয়। কোন মেয়েকে করা মানে তার সাথে সহবাস করা। তাই এক্ষেত্রে কথাটা টেসিও ব্যবহার করায় কেমন যেন অদ্ভুত শোনাল মাইকেলের কানে। দুজনকেই, বলল মাইকেল।
কোন সন্দেহ নেই তো? জানতে চাইল টেসিও।
হলুদ মগজ দেখেছি ওদের।
গাড়িতে কাপড় রয়েছে, পোশাক পাল্টে নিল মাইকেল। বিশ মিনিট পর একটা সিসিলিগামী ইতালীয় মালবাহী জাহাজে উঠল ও। এরদু ঘণ্টা পর সাগর পাড়ি দিতে শুরু করল জাহাজটা, নিজের কেবিন থেকে মাইকেল দেখছে নিউ ইয়র্ক শহরের আলোগুলো নরকের মত দাউ দাউ জ্বলছে। গভীর একটা স্বস্তির ঝিরঝির শান্তি অনুভব করছে ও। সব ছেড়েছুঁড়ে এবার তাহলে সত্যি বেরিয়ে পড়া গেল। ভাবছে ও। এবার যা হয় হোক, শহরের মাথার ওপর ভেঙে পড়ুক নরক, কিন্তু সে এখানে থাকছে না।
.
ক্যাপ্টেন ম্যাকক্লাস্কি এবং সলোযো খুন হবার পরদিন নিউ ইয়র্ক শহরের প্রত্যেক থানা থেকে পুলিশ ক্যাপ্টেন আর লেফটেন্যান্টরা কঠোর নির্দেশ পাঠাল-খুনী ধরা না পড়া পর্যন্ত আজ থেকে জুয়া খেলা বন্ধ, নারী ব্যবসা বন্ধ, কোন রকম বেচাল সহ্য করা হবে না। শহর জুড়ে সর্বত্র ব্যাপক ভাবে হানা দিতে শুরু করল পুলিশ। বে আইনী সমস্ত কার্যকলাপ রাতারাতি একেবারে স্তব্ধ হয়ে গেল।
সেদিন পরিবারগুলো তাদের একজন নির্বাচিত প্রতিনিধি পাঠিয়ে কর্লিয়নিদেরকে জিজ্ঞেস করল খুনীকে তারা হস্তান্তর করতে রাজি আছে কিনা। তাদেরকে জানানো হলো এই খুন-খারাবির সাথে কর্লিয়নিদের কোন সম্পর্ক নেই। সেই রাতে লং বীচে কর্লিয়নিদের প্রাঙ্গণে একটা বোমা বিস্ফোরিত হলো। প্রবেশ পথের মুখে শিকলের কাছে এসে বোমাটা ছুঁড়ে বিদ্যুৎ গতিতে আবার চলে গেল একটা গাড়ি। সেই রাতেই কর্লিয়নিদের দুজন বাটন-ম্যান খুন হয়ে গেল গ্রিনিচ ভিলেজে। ছোট একটা রেস্তোরাঁয় বসে ডিনার খাচ্ছিল তারা।
