সিসিলীয় ভাষায় বলল মাইকেল, ঠিক কিভাবে ব্যবসা করতে যাচ্ছেন আপনি তা আরেকটু খোলসা করে বলুন–আমি জানতে চাই, আমাদের পরিবার ঠিক কি ভূমিকা নিতে পারে, আর তাতে লাভের পরিমাণই বা কতটা আশা করা যায়।
তবে কি তুমি গোটা পরিকল্পনাটা প্রথম থেকে নতুন করে শুনতে চাও? উৎসাহের সাথে জানতে চাইল সলোযো.
আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার একটাই, গম্ভীর মুখে বলল মাইকেল, বাবার প্রাণের ওপর আর কোন হামলা হবে না, এ-ব্যাপারে নিশ্চিত গ্যারান্টি চাই আমি।
আবেগ ভরা উত্তেজনায় দুই হাত উপরে তুলে বলল সলোযো, আমি কি গ্যারান্টি দেব তোমাকে? আমিই তো শিকার। সুবর্ণ সুযোগটা আমিই তো হারিয়েছি। তুমি আমাকে বড় বেশি সম্মান দেখাচ্ছ, বন্ধু। আমি অতবড় সম্মানের যোগ্য নই।
নিশ্চিতভাবে এতক্ষণে বুঝতে পারছে মাইকেল, আলোচনার একমাত্র উদ্দেশ্য হলো হাতে কিছু সময় পাওয়া। তার মানে, আরেকবার চেষ্টা করবে সোযো ডনকে খুন করার। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো শয়তানটা তাকে একেবারে আনাড়ী ছোকরা ভেবে নিয়েছে। আরও একবার সারা শরীরে হিমশীত শিহরণ অনুভব করল মাইকেল। মুখের চেহারায় জোর করে উদ্বেগের ভার ফুটিয়ে তুলল ও।
সাথে সাথে তীক্ষ্ণ কণ্ঠে জানতে চাইল সলোযো, কি ব্যাপার?
আড়ষ্ট ভঙ্গিতে বলল মাইকেল, মটা একেবারে আমার রাডারে গিয়ে পৌঁছেছে। কতক্ষণ চেপে রাখা যায়। একবার টয়লেটে যেতে পারলে হত।
কালো চোখের নিবিষ্ট দৃষ্টি দিয়ে মাইকেলের মুখ দেখছে সলোযো। ঝট করে হাতটা বাড়িয়ে দিল সে, কর্কশ ভাবে মাইকেলের কুঁচকির-চারদিকে হাতড়ে কোন অস্ত্র আছে কিনা দেখে নিল। মুখে রাগের ভাব নিয়ে বসে আছে মাইকেল। ম্যাকক্লাস্কি দ্রুত বলল, দেখেছি আমি। অমন হাজার হাজার পাণ্ডাকে সার্চ করেছি। ওর কাছে নেই কিছু।
ব্যাপারটা মেনে নিতে পারছে না সলোযো। কোন কারণ নেই, তবু ভাল ঠেকছে না তার। ওদের উল্টোদিকের একটা টেবিলে বসে থাকা একজন লোকের দিকে তাকাল সে, ইঙ্গিতে তাকে টয়লেটের দরজাটা দেখিয়ে দিল। উত্তরে নোকটাও নিঃশব্দে মাথা নেড়ে জানিয়ে দিল যে আগেই সে পরীক্ষা করেছে জায়গাটা, ভিতরে নেই কেউ। অগত্যা অনিচ্ছাসত্ত্বেও মাইকেলকে বলল সলোযো, যাও, কিন্তু বেশি দেরি কোরো না। আশ্চর্য প্রখর ওর অনুভূতি, কিছু একটা ঘটার আশঙ্কায় টান টান হয়ে উঠেছে শরীরের পেশী, ভয়ে ধুকধুক করছে বুকের ভিতরটা।
উঠে দাঁড়াল মাইকেল। স্বাভাবিকভাবে হেঁটে এগিয়ে যাচ্ছে টয়লেটের দিকে। ভিতরে ঢুকে দেখল প্রস্রাব পাত্রে তারের জালের উপর গোলাপী রঙের এক টুকরো সাবান রয়েছে। বুথে ঢুকল মাইকেল। সত্যি পেচ্ছাব পেয়েছে ওর, টন-টনে একটা মৃদু বেদনা অনুভব করছে তলপেটে। তাড়াতাড়ি কাজটা সারুল ও, তারপর এনামেল দিয়ে পালিশ করা জলাধারের পিছনটা হাতড়াতে শুরু করল। টেপ দিয়ে আটকানো ছোট্ট, ভোতা নাকের পিস্তলটা ঠেকল ওর হাতে। সেটাকে টেনে বের করে আনার সময় মনে পড়ল, ক্লেমেঞ্জা বলেছিল, আঙুলের ছাপ পড়লেও ঘাবড়াবার কিছু নেই। পিস্তলটা কোমরে খুঁজে নিয়ে সেটার উপর কোটের বোতাম এঁটে দিল ও। তার হাত ধুলো, চুল ভিজিয়ে নিল, কলের গায়ে রুমাল ঘষে মুছে ফেলল আঙুলের ছাপ।
বাথরূমের দরজার দিকে তাকিয়ে বসে আছে সলোযো; কালো চোখ দুটো সজাগ সতর্ক-চকচক করছে। দূরজা খুলে বেরিয়ে এল মাইকেল, সাথে সাথে চোয়াল দুটো শক্ত হয়ে উঠল তার। মাইকেলের অন্তরের অন্তস্তল পর্যন্ত দেখে নিতে চাইছে তার তীক্ষ্ণ চোখের দৃষ্টি।
একটু হেসে হাঁফ ছাড়ার ভঙ্গি করল মাইকেল। বলল, এখন আর কথা বলতে কোন অসুবিধে হবে না।
ভীল আর স্প্যাগেটি এসে পৌঁছেছে, পুরোদমে সেগুলোর উপর হামলা চালাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে ক্যাপ্টেন ম্যাকক্লাস্কি। দেয়াল ঘেঁষে বসে আছে যে লোকটা, এতক্ষণে ঢিল পড়ল তার পেশীতেও।
নিজের চেয়ারে আবার বসল মাইকেল। ক্লেমেঞ্জা ওকে বসতে নিষেধ করেছিল, মনে আছে ওর। কোন সহজ ত সতর্কবোধ-এর কারণেই হোক বা স্রেফ ভয়েই হোক, নিষেধটা পালন করছে না ও। ওর মনে হচ্ছে তাড়াহুড়োর সাথে কিছু করতে গেলেই ওকে ওরা ধরে ফেলে দুটুকরো করে ফেলবে। তবে এখন তবু অনেকটা নিরাপদ লাগছে নিজেকে। ভয় যে একটু পেয়েছিল তাতে সন্দেহ নেই, কারণ পায়ের উপর দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে না বলে এখন বেশ আরাম লাগছে ওর।
মাইকেলের দিকে ঘুরে বসল সলোযো। আবার শুরু করল সে।
টেবিলটা তলপেট আড়াল করে রেখেছে মাইকেলের, কোটের বোতাম খুলে সলোযোর কথা মন দিয়ে শুনতে চেষ্টা করছে ও। কিন্তু কি ছাই বলছে লোকটা, তার একটা হরফও বুঝতে পারছে না। মনে হচ্ছে পাগলের অর্থহীন প্রলাপ বকে চলেছে। শরীরের ভিতর ছুটোছুটি শুরু হয়ে গেছে উত্তেজিত রক্তস্রোতের। ধীরে ধীরে হাত নামাচ্ছে ও, কোমরে গোজা পিস্তলে আঙুল ঠেকতেই দম আটকে এল ওর। তারপর সেটাকে টেনে বের করে আনল। এই সময় ওদের অর্ডার নিতে এল ওয়েইটার। তার সাথে কথা বলার জন্যে মুখ ফেরাল সলোযো। পরমুহূর্তে মাইকেলের বা হাতে বিদ্যুৎ খেলে গেল। এক ধাক্কায় টেবিলটাকে সরিয়ে দিয়ে স্যাঁত করে বাড়িয়ে দিল পিস্তুল ধরা হাতটা, পিস্তলের নলটা প্রায় ছুঁয়ে ফেলেছে সলোযোর মাথা।
বিস্ময়কর ক্ষিপ্রতার সাথে মাইকেলের হাত নড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে নিজের শরীরটাকে একপাশে সরিয়ে নিতে চেষ্টা করল সে। কিন্তু বয়স কম বলে তার চেয়েও ক্ষিপ্রগতির অধিকারী মাইকেল, সলোযো মাথা সরিয়ে নেবার আগেই পিস্তলের ট্রিগার টিপে দিল ও।
