ভারি, হেঁড়ে গলায় ক্যাপ্টেন ম্যাকক্লাস্কি বলল, ছেলে হিসেবে এটি খুব ভাল, এর ব্যাপারে কোন চিন্তা নেই। সামনে একটু ঝুঁকে সস্নেহে মাইকলের কাঁধ চাপড়ে দিল সে। সেদিনের ঘটনার জন্যে আমি দুঃখিত, মাইক। এই কাজের জন্যে একটু বোধহয় বেশি বুড়ো হয়ে গেছি, মেজাজ ঠিক রাখতে পারি না। সভবত তাড়াতাড়ি অবসর নেয়া উচিত আমার। ঝামেলা একেবারেই সহ্য হয় না, সুখচ একের পর এক ঝামেলা লেগেই আছে। বোঝোই তো কি রকম.জালা! এরপর হতাশ ভঙ্গিতে একটা মস্ত দীর্ঘশ্বাস ফেলে খুব ভালভাবে সার্চ করে দেখে নিল সে মাইকেলের কাছে কোন অস্ত্র আছে কিনা।
ড্রাইভারের মুখে মৃদু একটু হাসি লক্ষ করল মাইকেল। পশ্চিম দিকে যাচ্ছে ওরা, ভাব্য অনুসরণকারীকে খসিয়ে ফেলার কোন চেষ্টা লক্ষ করছে না মাইকেল। নানা ধরনের যানবাহনের মাঝখান দিয়ে ওয়েস্ট সাইড হাইওয়ে ধরে ছুটছে গাড়ি। কেউ পিছু নিয়ে থাকলে তাকেও এই রাস্তা ধরেআসতে হবে। হঠাৎ মন খারাপ হয়ে গেল মাইকেলের, কারণ জর্জ ওয়াশিংটন ব্রিজে ঢোকার পথটা ধরেছে গাড়ি। নিউ জার্সির দিকে যাচ্ছে ওরা। আলোচনায় বসার জায়গা সম্পর্কে যে খবর পেয়েছিল সনি সেটা তা হলে ভুয়া খবর ছিল! ভাবছে মাইকেল।
ব্রিজ পেরিয়ে এল গাড়ি, পিছনে পড়ে রইল আলোক মালায় সাজানো শহর। মুখের চেহারায় নির্বিকার একটা ভাব ফুটিয়ে রেখেছে মাইকেল। দূরে কোথাও নিয়ে গিয়ে ওরা তাকে পানিতে চুবিয়ে মেরে ফেলবে নাকি।ভাবছে ও। নাকি শেষ মুহূর্তে জায়গা বদল করেছে সলোযো? কিন্তু রাস্তার প্রায় সবটা পেরিয়ে এসে হুইল ধরে মোচড় দিল ড্রাইভার। শহরে ফিরে যাবার লেনগুলোকে আলাদা করে রেখেছে যে বেড়াটা সেটার সাথে ধাক্কা খেয়ে শূন্যে লাফিয়ে উঠল ভারি গাড়িটা, প্রচণ্ড ঝাঁকি খেয়ে ফিরতি পথে ছুটতে শুরু করেছে। ঝট করে ঘাড় ফিরিয়ে পিছন দিকে তাকাল সোযযা আর ম্যাকাস্কি। ওদের মত আর কেউ বেড়া ডিঙাবার চেষ্টা করছে কিনা দেখছে। আবার নিউ ইয়র্কে ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে ড্রাইভার ওদেরকে। ঝড়ের বেগে ছুটছে গাড়ি। ব্রিজ পেরিয়ে বাক নিয়ে এখন ইস্ট ব্রঙ্কসের দিকে যাচ্ছে। রাস্তাটা এদিকে ছোট, বোঝাই যাচ্ছে কেউ পিছু নেয়নি। ইতিমধ্যে প্রায় নটা বেজে গেছে। ম্যাকক্লাস্কি, আর মাইকেলকে সিগারেট অফার করল সলোযো, কিন্তু ওরা কেউ নিল না, সে একাই ধরাল একটা। ড্রাইভারকে বলল, দারুণ দেখিয়েছ, ব্যাপারটা আমার মনে থাকবে।
দশ মিনিট পর ইতালীদের পাড়ায় ছোট একটা রেস্তোরাঁর সামনে থামল গাড়ি। রাস্তাটা একেবারে ফাঁকা, রাত হয়েছে, ভিতরেও মাত্র কয়েকজন লোক ডিনার খাচ্ছে। ড্রাইভারও ওদের সাথে ভিতরে ঢুকবে কিনা ভেবে দুশ্চিন্তা হচ্ছে। মাইকেলের। কিন্তু গাড়িতেই থেকে গেল সে। মধ্যস্থতাকারী লোকটা বা আর কেউ ড্রাইভারের উপস্থিতি সম্পর্কে কিছু বলেনি। নিয়মের কথা উঠলে, ড্রাইভারকে নিয়ে এসে চুক্তি ভেঙেছে সোয়য়া। মাইকেল সিদ্ধান্ত নিল প্রসঙ্গটা তুলবে না সে, জানে, না তুললে ওরা ভাববে ভয় পেয়েছে সে আলোচনা ভেঙে যাবার ঝুঁকি নিতে।
কেবিনে বসতে রাজি হলো না সলোযো, তাই কামরার একমাত্র গোল টেবিলটায় বসল ওরা তিনজন। এখন আর মাত্র দুজন লোক আছে রেস্তোরাঁয়। মাইকেল ভাবছে, এরা সোযোরই লোক কিনা। তা হলেও কিছু এসে যাবে না, ওরা নাক গলাবার আগেই ঝামেলা চুকিয়ে ফেলবে সে।
এখানের ইতালীয় খাবার নাকি খুব ভাল? অকৃত্রিম আগ্রহের সাথে জানতে চাইল ম্যাকক্লাস্কি।
ভীলটা খেয়ে দেখো, সায় দিয়ে বলল সনোযো, এত ভাল নিউ ইয়র্কের কোথাও পাবে না।
একজন মাত্র ওয়েইটার, ওদের জন্যে ওয়াইন নিয়ে এসে বোতলের ছিপি খুলে দিল সে, তিনটে গ্লাসে মদ ঢালল। আমিই বোধহয় একমাত্র আইরিশ যে মদ ছোঁয় না, বলল ম্যাকক্কাস্কি। মদখোর বহু লোককে বিপদে পড়তে দেখেছি কিনা।
আবদারের সুরে ক্যাপ্টেনকে বলল সলোয়যা, তোমাকে বিশ্বাস করি না বলে নয়, ইংরেজী ভাষায় আমার ভাল দখল নেই বলে আমি মাইকের সাথে ইতালিয়ানে কথা বলব। আমার উদ্দেশ্যটা যে ভাল সেটুকু অন্তত মাইক বুঝুক, এই চাই আমি। আজ রাতে আমরা একটা রফা করে ফেলতে পারলে তাতে সবারই মস্ত সুবিধে হয়ে যাবে। তুমি কিন্তু অপমানিত বোধ কোরো না। ভেব না যে তোমাকে আমি অবিশ্বাস করি।
শুকনো হেসে ক্যাপ্টেন ম্যাকক্লাস্কি বলল, অবশ্যই, তোমরা শুরু করে দাও, আমি বরং ভীল আর স্প্যাগেটির দিকে একটু নজর দিই।
দ্রুত একনাগাড়ে সিসিলীয় ভাষায় মাইকেলকে বলতে শুরু করল সোযো, সবচেয়ে আগে বুঝতে হবে তোমাকে যে তোমার বাবার সাথে যাই ঘটে থাকুক আমার, ব্যাপারটা ব্যবসা ছাড়া আর কিছু নয়। তোমার বাবা, ডন কর্লিয়নিকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করি আমি, তাকে সাহায্য করার একটা সুযোগ ভিক্ষা চাই শুধু। কিন্তু এ-কথাও তোমাকে বুঝতে হবে যে উনি বড্ড সেকেলে টাইপের মানুষ। উন্নতির পথে তিনি একটা বাধা। আমার ব্যবসার ভবিষ্যৎ, এক কথায় উজ্জ্বল। এই ব্যবসার তুঙ্গে উঠে যে-কেউ কোটি কোটি ডলার কামাতে পারে। কিন্তু নিজের কিছু অযৌক্তিক সংস্কারের জন্যে তোমার বাবা এই উন্নতিতে বাধা দিচ্ছেন। আর বাধা দিতে গিয়ে তিনি আমার মত লোকজনের ওপর নিজের ইচ্ছাটা চাপিয়ে দিচ্ছেন। হ্যাঁ, হ্যাঁ, জানি, আমাকে তিনি বলেছেন–তোমার ব্যবসা তুমি চালিয়ে যাও। কিন্তু কথাটা যে কতটা অবাস্তব তা আমরা দুজনেই বুঝতে পারি, তাই নয় কি? ব্যবসা চালিয়ে গেলে আমি তার বিরক্তির কারণ হব। আসলে তিনি বলতে চান, এ ব্যবসা আমার করা চলবে না। আমি একজন আত্মমর্যাদাজ্ঞান সম্পন্ন লোক, আরেকজন লোক আমার ওপর তার যা খুশি ইচ্ছা চাপিয়ে দেবে তা আমি হতে দিতে পারি না। এর পরিণতিতে যা হবার তাই হয়েছে। তোমাকে শুধু এটুকু জানাতে চাই যে নিউ ইয়র্কের সবগুলো পরিবার নীরবে সমর্থন করছে আমাকে। আর টাটাগ্লিয়া পরিবার আমার পার্টনার হয়েছে। বুঝতেই পারছ, ঝগড়া যদি চলতেই থাকে, সমস্ত পরিবারগুলোর বিরুদ্ধে একা পঁড়াতে হবে কর্লিয়নিদেরকে। জানি, তোমার বাবা সচল থাকলে সেটা তিনি চাইতেন না। আমি কাউকে কোন রকম অসম্মান করতে চাই না, কিন্তু তবু এ-কথা বলব যে তার বড় ছেলেটি গড ফাদারের মত হয়নি। তাছাড়া, তোমাদের এই আইরিশ কনসিলিয়রি হেগেন কোন দিক থেকেই গেনকো আবানদাণ্ডোর মত নয়, যীশু তার মঙ্গল করুন। তাই শান্তি প্রস্তাব আনছি আমি, যুদ্ধ বিরতির প্রস্তাব আনছি। তোমার বাবা যতদিন না সুস্থ হয়ে উঠে দরকষাকষির দায়িত্ব নিতে পারেন ততদিন বিরোধিতা বন্ধ থাকুক। আমার খাতিরে, আমার জামিনে ব্রুনোর প্রতিশোধ নেবার দাবি ছেড়ে দিতে রাজি আছে টাটাগ্লিয়া পরিবার। আমরা এ-পক্ষরা সবাই শান্তি চাই। আমাদের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হোক। মাঝখানে শুধু একটা কথা বলতে চাই, আমাকেও তো ব্যবসা করে বেঁচে থাকতে হবে। তোমরা না হয় সাহায্য না করলে, কিন্তু অনুরোধ করছি কর্লিয়নি পরিবার যেন আমাকে ব্যবসা করতে বাধা না দেয়। আমার তরফ থেকে এটাই প্রস্তাব। আপস করার অধিকার তোমাকে দেয়া হয়েছে তা আমি ধরেই নিচ্ছি।
