এবার নিয়ে এই দ্বিতীয়বার দেখল হেগেন, নিমেষে মাইকেলের মুখটা জমাট পাথরের মত হয়ে গেল, ঠিক যেন ডনের মুখের হবহু প্রতিকৃতি।
টম, নিজেকে বোকা বানিয়ো না, বলল মাইকেল এর সমস্তটাই ব্যক্তিগত বিষয়, ব্যবসার প্রতিটি বিন্দুমাত্রই তাই। যে অপমান মানুষকে রোজ সারা জীবন ধরে হজম করতে হয় তার সবটুকুই নিখাদ ব্যক্তিগত ব্যাপার। তোমরা এটাকে ব্যবসা বলছ। বেশ, তাই। কিন্তু তবু নরকযন্ত্রণার মত সবটাই একান্ত ব্যক্তিগত। কার কাছ থেকে শিখেছি এ কথা, জানো? উন। আমার বাবা। গড ফাদার। তার কোন বন্ধুর মাথায় বজ্রাঘাত হলে বাবা সেটাকে ব্যক্তিগত ভাবে নেন। নৌ বাহিনীতে যোগ দিয়েছিলাম আমি, বাবা সেটাকে ব্যক্তিগত ভাবে নিয়েছিলেন। তাই তিনি মহৎ। সেজন্যেই তিনি মহান ডন। যাই ঘটুক, সব তাকে ব্যক্তিগতভাবে আঘাত করে। সৃষ্টিকর্তার মত চড়ুই পাখির লেজ থেকে যদি একটা পালক খসে পড়ে, তাও তিনি জানতে পারেন, কোন চুলোয় গেল সেটা তাও তার অজানা থাকে না। ঠিক? আর কি জানো? দুর্ঘটনাকে যারা ব্যক্তিগত অপমান হিসেবে নেয় তাদের জীবনে কখনও দুর্ঘটনা ঘটে না। স্বীকার করি, দেরিতে এসেছি, কিন্তু সবটা পথ পেরিয়ে এসেছি আমি। হ্যাঁ, ঠিকই বলেছ, ভাঙা চোয়ালটাকে ব্যক্তিগতভাবে নিচ্ছি আমি। হ্যাঁ, বাবাকে মারার জন্যে সোযোর এই যে নাছোড় চেষ্টা, এটাকে ব্যক্তিগত ভাবে নিচ্ছি! হাসল মাইকেল। গড ফাদারকে জানিয়ো এসব আমি তার কাছেই শিখেছি। আর, জানাতে ভুলো না, তিনি যে আমার জন্যে এত কিছু করেছেন, তার বিনিময়ে সামান্য কিছু করার এই সুযোগটা পেয়ে আমি ভীষণ সুখী। বাবা আমার খুব ভাল মানুষ।
একটু থেমে, চিন্তিতভাবে আবার হেগেনকে বলল মাইকেল, জানোবাবা আমাকে কবে মেরেছেন তা আমি মনে করতে পারি না।-সনি বা ফ্রেডিকেও মেরেছেন বলে মনে পড়ে না। আর কনিকে তো জোরে বকেননি পর্যন্ত। ঠিক করে বলো তো, টম, কয়জন লোককেই বা খুন করেছেন ডন বা করিয়েছেন?
অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে টম হেগেন বলল, আমিও তোমাকে একটা জিনিস মনে করিয়ে দিচ্ছি, যা তোমার বাবার কাছ থেকে শেখোনি তুমি–এখন যেভাবে কথা বলছ,। এমন অনেক ব্যাপার আছে যা শুধু কাজ করে দেখাতে হয়, করতে হয়, তা নিয়ে কথা বলতে হয় না, সেটার ন্যায্যতা প্রমাণ করার চেষ্টা করতে হয় না। আসলে তা প্রমাণ করা যায় না। কাজটা শুধু করে ফেলতে হয়। এবং তারপর ভুলে যেতে হয়।
ভুরু কুঁচকে উঠল মাইকেল কর্লিয়নির। শান্ত গলায় জানতে চাইল সে, কনসিলিয়রি হিসেবে স্বীকার করো তুমি সলোযোকে বাঁচিয়ে রাখা বাবা, আর আমাদের পরির্বারের জন্যে বিপদজনক?
হ্যাঁ, বলল হেগেন।
ঠিক আছে, বলল মাইকেল, তাহলে সলোযোকে খুন করতেই হয় আমার।
২.৪ জ্যাক ডেম্পসির রেস্তোরাঁ
০৪.
ব্রডওয়েতে, জ্যাক ডেম্পসির রেস্তোরাঁর সামনে দাঁড়িয়ে গাড়ির জন্যে অপেক্ষা করছে মাইকেলরিস্টওয়াচ দেখল ও, আটটা বাজতে পাঁচ মিনিট বাকি। ঠিক সময় মতই আসবে সলোঁযো! ইচ্ছা করেই হাতে একটু বেশি সময় রেখেছে মাইকেল। প্রায় মিনিট পনেরো হলো এখানে অপেক্ষা করছে ও।
লং বীচ থেকে শহরে আসার পথে হেগেনকে বলা ওর কথাগুলো ভুলতে চেষ্টা করেছে মাইকেল, কারণ যা সে বলেছে তা যদি বিশ্বাস করে থাকে তাহলে দুড়ে দেয়া একটা ঢিলে পরিণত হয়েছে তার জীবন, অপ্রতিহত গতিতে এখন শুধু ছুটে যাওয়া, থেমে যাবার উপায় নেই। আজ রাতের পর অন্য আর কিছু আশা করা যায় কি? এসব আজেবাজে চিন্তা মাথা থেকে না সরালে আজ রাতে ওর মৃত্যুও হতে পারে, গভীরভাবে ভাবল মাইকেল। সামনে একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ রয়েছে, যেটা সম্পূর্ণ মনোযোগ দাবি করে। নিষ্প্রাণ পুতুল নয় সলোযো, আর ক্যাপ্টেন ম্যাকক্লাস্কিকেও হালকা ভাবে নেয়া উচিত হবে না। তার দিয়ে বাঁধা চোয়ালে ব্যথা অনুভব করছে, ব্যথাটাকে স্বাগত জানাল ও, এর জন্যেই সজাগ থাকতে হবে তাকে।
থিয়েটার ভাঙার সময় হলেও ঠাণ্ডা শীতের রাতে তেমন ভিড় নেই ব্রডওয়েতে। লম্বা কালো একটা গাড়ি ফুটপাথের কিনারা ঘেঁষে থামতেই কুঁকড়ে উঠল মাইকেল। দরজা খুলে বাইরের দিকে ঝুঁকে ড্রাইভার বলল, উঠে এসো, মাইক। ড্রাইভারকে চেনে না মাইকেল। ছোকরা রঙবাজের মাথায় একরাশ কালো চুল, গায়ে বুক খোলা শার্ট, তবু গাড়িতে উঠল মাইকেল। তারপর দেখল পিছনের সীটে বসে রয়েছে ক্যাপ্টেন ম্যাককুাস্কি আর সলোযো।
সীটের উপর দিয়ে হাত বাড়িয়ে দিল সলোযো, হ্যাণ্ডশেক করল মাইকেল। স্থির, গরম, শুকনো একটা হাত। তুমি এসেছ, সেজন্যে আমি খুব খুশি হয়েছি, মাইক, বলল সলোযো। আশা করি আমরা সব মিটিয়ে ফেলতে পারব। গোটা ব্যাপারটা সাংঘাতিক এক পর্যায়ে চলে গেছে, পরিস্থিতি যে এরকম দাঁড়াবে তা আমি আদৌ ভাবিনি, চাইওনি। আসল কথা, এমনটি হওয়া উচিত হয়নি।
অত্যন্ত শান্তভাবে বলল মাইকেল, আমিও আশা করি আজ রাতে সব ঠিক করে ফেলা যাবে। বাবাকে আবার বিরক্ত করা হোক তা আমি চাই না।
তাকে আর বিরক্ত করা হবে না, আন্তরিকতার সাথে বল সনোযো। মিথ্যে কথা বললে আমার ছেলে মেয়েদের মাথা খাব, তাকে আর বিরক্ত করা হবে না। আলোচনার সময় তুমি শুধু মনটাকে ভোলা রেখো। আশা করি সনির মত তোমারও মাখাটা গরম শ্ম। ওর এত রাগ যেকোন কাজের কথা তোলাই সম্ভব নয়।
