যে পিস্তলটা ওকে দেয়া হবে সেটা ক্লেমেঞ্জার সাথে প্র্যাকটিস করে দিনটা কাটল মাইকেলের। ২২ পিস্তলটায় নরম নাকের বুলেট ভরা হয়েছে, বৈশিষ্ট্য হলো ঢোকার সময় পিন ফোঁটার খুদে ফুটো আর বেরুবার সময় বিরাট হাঁ করা গর্ত তৈরি করে। প্র্যাকটিস করতে গিয়ে মাইকেল আবিষ্কার করল টার্গেটের কাছ থেকে পাঁচ পা দূরে থাকলে লক্ষ্য অব্যর্থ হয়। এর চেয়ে দূর থেকে গুলি ছুঁড়লে গুলিটা, এদিক সেদিক সরে যেতে চায়। ট্রিগারটা বড় শক্ত, তরে কয়েকটা যন্ত্র দিয়ে ঠোকাঠুকি করে সেটাকে ঢিলে করে দিল ক্লেমেঞ্জা। আগেই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে, বিস্ফোরণের শব্দ চাপা দেয়া হবে না। পরিস্থিতিটা বুঝতে না পেরে কোন নির্দোষ পথিক মিছেমিছি বীরত্ব, দেখাবার অর্থাৎ নাক গলাবার চেষ্টা করুক তা ওরা চায় না। পিস্তলের আওয়াজ শুনতে পেলে মাইকেলের কাছ থেকে দূরে সরে থাকবে তারা।
মাইকেলকে তালিম দেবার সময় বার বার পাখি-পড়ানো করছে ক্লেমেঞ্জা, গুলি করা হয়ে গেলেই হাত থেকে ফেলে দিবে পিস্তলটা। শরীরের পাশে ঝুলিয়ে দেবে হাতটা, ছুঁড়ে নয়, বেফ ছেড়ে দেবে পিস্তলটা। কেউ দেখতে পাবে না। সবাই মনে করবে তখনও তোমার হাতে আছে সেটা। কারণ সবাই ওরা তাকিয়ে থাকবে তোমার মুখের দিকে। তারপর? অভয় দিয়ে মিটিমিটি হাসছে ক্লেমেঞ্জা।
তারপর, আবার বলতে শুরু করল সে, খুব তাড়াতাড়ি, হনহন করে হেঁটে বেরিয়ে আসবে ওখান থেকে। কিন্তু খবরদার, দৌড় দেবে না। সরাসরি কারও চোখের দিকে তাকাবে না, আবার কারও দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে নেবারও দরকার নেই। বিশ্বাস করো, ওরা সবাই ভয় করবে তোমাকে যমের মত। কেউ বাধা দিতে এগিয়ে আসবে না। বাইরে বেরিয়ে এসেই দেখবে গাড়ি নিয়ে তোমার জন্যে অপেক্ষা করছে টেসিও। দ্রুত উঠে বসবে তুমি, তারপর আর কিছু করার নেই তোমার, বাকিটা টেসিওর ওপর নিশ্চিন্তে ছেড়ে দিয়ে। দুর্ঘটনা ঘটবে মনে করে ভয় কোরো না। এই আমি বলছি এসব এমন সুই আর সহজভাবে সমাধা হবে যে দেখে তুমি অবাক হয়ে যাবে। এই টুপিটা পরো এবার। দেখি কেমন মানায়।
ছাই রঙের একটা ফিডরা টুপি মাইকেলকে পরিয়ে দিল ক্লেমেঞ্জা। মুখ বাঁকাল মাইকেল, টুপি পরার অভ্যাস নেই ওর।
ওকে আশ্বাস দিয়ে ক্লেমেঞ্জা বলল, সে-রকম পরিস্থিতি যদি দেখা দেয়, এই টুপি থাকায় তোমাকে চিনতে অসুবিধে হবে। সাধারণত সাক্ষীদেরকে যদি আমাদের অনুকূলে কথা বলতে রাজি করাতে পারি, এই টুপি তখন ওদের মত পাল্টাবার একটা অছিলা এনে দেয়। মনে রেখো, আঙুলের ছাপ নিয়ে মাখা ঘামাতে হবে না তোমাকে। পিস্তলের ট্রিগার আর হাতলে বিশেষ টেপ লাগানো থাকছে। তবে পিলের অন্য কোথাও হাত দিয়ো না।
সনি কি জানতে পেরেছে আমাকে কোথায় নিয়ে যাবে সলোযো? প্রশ্ন করুল মাইকেল।
মৃদু কাঁধ ঝাঁকাল ক্লেমেঞ্জা। বলল, না, এখনও জানতে পারেনি। সাংঘাতিক সতর্কতার সাথে কাজ করছে সলোযো। কিন্তু তাই বলে ভেব না সে তোমার কোন ক্ষতি করতে পারবে। তুমি না ফেরা পর্যন্ত তো মধ্যস্থতাকারী আমাদের হাতে থাকছেই। তোমার কিছু হলে ওকে তার দাম দিতে হবে।
সে বিপদের ঝুঁকি নিচ্ছে কেন? জানতে চাইল মাইকেল।
মোটা লাভ পাবে, তাই। ছোটখাটো একটা রাজার ভাণ্ডার বলতে পারো। তাছাড়া, পরিবারগুলোর মধ্যে এই লোকের যথেষ্ট সম্মান রয়েছে, সে জানে, তার কোন ক্ষতি হতে দেবার সাধ্য সলোযোর নেই। আসলে এই মধ্যস্থর্টির প্রাণের মূল্য তোমার প্রাণের মূল্যের চেয়ে বেশি। পানির মত সহজ ব্যাপার। কোন বিপদ হতে পারে না তোমার। পরে অবশ্য যা করছি সেজন্য আমাদেরকে ভূগতে হবে।
অবস্থা কতটা খারাপ দাঁড়াবে বলে মনে করো তুমি? জানতে চাইল মাইকেল।
যতটা খারাপ হতে পারে, বলল ক্লেমেঞ্জা! কর্লিয়নিদের সাথে টাটাগ্লিয়া পরিবারের সামগ্রিক যুদ্ধ। অন্যান্য পরিবারগুলো প্রায় সবাই ওদের ক্ষ নেবে। প্রচণ্ড শীতে স্বাস্থ্য সংরক্ষণ বিভাগকে এক গাদা লাশ সরাতে হবে। শ্রাগ করে একটু গম্ভীর হলো ক্লেমেঞ্জা। সাধারণত দশ বছর পর পর একবার করে এইধরনের গোলমাল দেখা দেয়। ব্যাপারটা ঠিক খারাপ না, এতে দৃষিত রক্ত সব দূর হয়ে যায়। আমরা ওদেরকে এমনিতে ছেড়ে দিতে পারি না। কারণ ছোটখাটো ব্যাপারে ওদের কাছে যদি হার মানি, একেবারে পেয়ে বসবে ওরা আমাদেরকে, আমাদের যথাসর্ব গিলে নিতে চাইবে। প্রথমেই ওদের জড় কেটে দেয়া ভাল। ঠিক যেমন উচিত ছিল মিউনিকেই হিটলারের জড় কেটে দেয়া ওখানে তাকে ছেড়ে দেয়া বুদ্ধিমানের কাজ হয়নি।
মাইকেলের মনে আছে, উনিশশো উনচল্লিশ সালে যুদ্ধ শুরুর ঠিক আগে, বাবাও এই কথা বলত। নিঃশব্দে হেসে ভাবল সে, নিউ ইয়র্কের পাঁচ পরিবারের হাতে যদি দেশ পরিচালনার দায়িত্ব থাকত তাহলে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ ঘটতই না।
প্রাঙ্গণে ডনের বাড়িতে ফিরে এল ওরা, এখনও এটা সনির হেডকোয়ার্টার। ভাবছে মাইকেল, আর কত দিন প্রাঙ্গণের নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে পারবে সনি? বেরুতে তো ওকে হবেই।
দুপুরে দেরি করে খেয়েছে সনি, একটা কফি টেবিলে অভুক্ত খাবার পড়ে আছে-স্টেকের টুকরো, রুটির ছাল, আধ বোতল হুইস্কি। একটা কাউচে শুয়ে আছে সনি, ঘুমাচ্ছে সে।
ডরে পরিষ্কার কামরাটা নোংরা হয়ে গেছে। বড় ভাইকে ধরে ঝাঁকি দিয়ে জাগাল মাইকেল। বলল, এই রকম ছন্নছাড়ার মত কত দিন থাকবে আর এখানে? জায়গাটা একটু পরিষ্কার করিয়ে নিলে তো পারো।
