চারটে ছেলে নিয়ে বড় একটা পরিবার প্রতিপালন করছে সে। ছেলেদের কাউকে পুলিশে পাঠায়নি। সকলেই ফর্ডহ্যাম ইউনিভার্সিটিতে পড়ছে। ক্যাপ্টেনের পদে ওঠার পর তার পরিবারকে কখনও অভাবের মুখ দেখতে হয়নি। তবে একটা সময় এল যখন সবাই বলতে শুরু করল যে ম্যাকক্লাস্কির টাকার বাইবেড়ে গেছে। শহরের আর সব এলাকার চেয়ে তার এলাকার বুকমেকারদেরকে বেশি ঘুষ দিতে হচ্ছে। এর কারণ সম্ভবত চারটে ছেলেমেয়ের লেখাপড়ার খরচ যোগাবার জন্যে একটু বেশি লোভী হয়ে উঠতে হয়েছে তাকে।
ম্যাকক্লাস্কির পুরানো বন্ধুর মধ্যে একজন হলো ব্রুনো টাটাগ্লিয়া। তার এক ছেলের সাথে নো ফর্ডহ্যাম ইউনিভার্সিটিতে পড়েছে। পড়া শেষ করে একটা নাইট-ক্লাব খুলেছে ব্রুনো, কখনও যদি সপরিবারে শহরে বেড়াতে আসে ম্যাকক্কাস্কি, এই নাইট-ক্লাবে নিখরচায় ভুরিভোজন আর ক্যাবারে শো তার উপরি পাওনা হয়। প্রত্যেক নতুন বছরের আগের সন্ধ্যায় ম্যানেজমেন্টের তরফ থেকে মেহমান হবার জন্যে এনগ্রেভ করা দাওয়াতপত্র পায় তারা। তাদের জন্যে সবচেয়ে ভাল টেবিলগুলোর একটা বেছে রাখা হয়। ব্রুনোর উদ্দেশ্য ছিল ওর নাইটক্লাবে নাম করা যে সব মেহমানরা নাচ-গান করতে আসে তাদের সাথে ম্যাককারি। পরিচয় করিয়ে দেয়া। পরিচয় হয়। এদের মধ্যে অনেকে হলিউডের বিখ্যাত গাইয়ে আর তারকাও আছে। তবে মাঝেসাঝে ছোটখাটো ব্যাপারে সাহায্য দরকার হয় ব্রুনোর। হয়তো ক্যাবারেতে কাজ করার লাইসেন্স পাবার জন্যে কোন মেয়ে-কর্মীর রেকর্ড অনুমোদিত হওয়া দরকার, অথচ সুন্দরী মেয়েকমটির নামে পুলিশের খাতায় খারাপ রেকর্ড আছে। এ-ধরনের কাজ খুশির সাথেই করে দেয় ম্যাকক্লাস্কি।
কারও কীর্তিকলাপ সম্পর্কে যদি কিছু টের পায় তা তাকে বা আর কাউকে বুঝতে দেয় না সে। তাই সলোযো যখন তাকে অনুরোধ করল যে ডন কর্লিয়নিকে হাসপাতালে অরক্ষিত অবস্থায় রাখতে হবে, কোন প্রশ্ন করেনি সে। কিন্তু কাজটার জন্যে কত টাকা পাবে তা জেনে নিতেও ভুল করেনি। সলোযো দশ হাজার ডলারের কথা বলতেই সব রহস্য পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল তার কাছে। কাজটা করে। দেবার প্রতিশ্রুতি দিতে কোনরকম ইতস্তত ভাক দেখায়নি সে। তার জানা আছে, ডন কর্লিয়নি দেশের সবচেয়ে শক্তিশালী মাফিয়া দলের মাথা। তার যত রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষক আছে, আল কাপুরও তা নেই। তার বিশ্বাস, এই লোককে খতম করা গেলে দেশের একটা মস্ত উপকার হবে। অগ্রিম টাকা নিয়ে নিখুঁতভাবে সলোযোর কাজটা করে দিল সে।
কিন্তু খানিক পর সলোযো খবর দিল এখনও কর্লিয়নিদের দুজন লোক হাসপাতালে রয়েছে, খবরটা শুনে প্রচণ্ড রাগে প্রায় অন্ধ হয়ে গেল ম্যাককুাস্কি। টেসিওর সব লোককে কয়েদ করেছে সে, ডন কর্লিয়নির কামরার দরজা থেকে সরিয়ে দিয়েছে ডিটেকটিভদেরকে, অথচ এখন কিনা দশ হাজার ডলার ফিরিয়ে দিতে হবে তাকে। এই রাগেই হাসপাতালে মাইকেলকে ঘুসি মেরেছিল সে।
তবে শেষ পর্যন্ত যা হবার তা ভালই হয়েছে। টাটাগ্লিয়া নাইটক্লাবে তার সাথে দেখা হয়েছিল সলোযোর, এবং ওর সাথে আগের চেয়ে লাভজনক রফায় পৌঁছানো গেছে। এবারও কোন প্রশ্ন করেনি সে, শুধু টাকার ব্যাপারটা জেনে নিয়েছে। ঘুণাক্ষরেও ভাবেনি সে এর মধ্যে তার জন্যে কোন বিপদ থাকতে পারে। তা ভাবার কোন কারণও নেই। অতি বড় দুঃসাহসীও একজন পুলিশ ক্যাপ্টেনকে খুন করার কথা ভাবতে পারে না। মাফিয়াদের সবচেয়ে শক্তিশালী গুণ্ডাও নিচু স্তরের একজন পুলিশের চড় খেয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে, এটাই স্বাভাবিক। আসনে পুলিশ মেরে লাভ নেই। তেমন ঘটনা যদি ঘটে শুধু শুধু একগাদা গুণ্ডা গ্রেফতার এড়াতে গিয়ে গুলি খেয়ে মারা পড়বে। এ ধরনের ব্যাপারে পুলিশ বিভাগ কখনও আপস করবে না। গোলমালটা লেগেই থাকবে, এর কোন সুরাহা হবে না।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে থানা থেকে বেরুবার জন্যে তৈরি হচ্ছে ম্যাকক্লাস্কি। মাথার ভিতর নানা সমস্যা গিজগিজ করছে তার। সবে আয়ারল্যাণ্ডে মারা গেছে তার শ্যালিকা, ক্যানসার বাধিয়ে প্রচুর টাকা খসিয়ে দিয়ে গেছে তার, এখন তাকে কবর দেবার জন্যে আরও টাকা খরচ করতে হবে। দেশে রয়েছে বুড়ো কাকা আর ফুফুরা, তাদেরও সাহায্য করতে হয়। যাই হোক, হাতে এতগুলো টাকা এসে যাচ্ছে, এবার স্ত্রীকে নিয়ে আরেকবার দেশে যাওয়া যেতে পারে, বিশেষ করে যুদ্ধ যখন থেমে গেছে। তাকে কোথায় পাওয়া যেতে পারে তা একজন কেরানীকে জানিয়ে বেরিয়ে পড়ল সে। কোনরকম সতর্কতা অবলম্বন করার কথা ভাবল না। যদি প্রয়োজন দেখা দেয়, তখন বললেই হবে যে সলোযো কিছু তথ্য দেবে বলে ডেকে পাঠিয়েছিল। একটা ট্যাক্সি নিয়ে সনোযোর দেয়া ঠিকানা অনুযায়ী একটা বাড়িতে এসে পৌঁছল সে।
.
মাইকেলের দেশ ত্যাগের সব ব্যবস্থা করে ফেলেছে টম হেগেন। নকল পাসপোর্ট, ন্যাভাল কার্ড, একটা ইতালীয় মালবাহী জাহাজে ওর জন্যে বার্থ—সব ব্যবস্থা সারা। একটা সিসিলীয় বন্দরে গিয়ে পৌঁছুবে জাহাজটা। এরই মধ্যে প্লেনে চড়ে ওদের অনুচর চলে গেছে, সে সিসিলির পাহাড়ী এলাকার একজন মাফিয়া নেতার কাছে মাইকেলের লুকিয়ে থাকার ব্যবস্থা করবে।
একটা গাড়ি আর একজন অতি বিশ্বস্ত ড্রাইভারের বন্দোবস্ত করে রেখেছে সনি। সলোযোর সাথে যে রেস্তোরাঁয় দেখা করার ব্যবস্থা হয়েছে সেখান থেকে বেরিয়েই ওই গাড়িতে উঠতে পারবে মাইকেল। ড্রাইভার স্বয়ং টেসিও। নিজে যেচে পড়ে কাজটা নিয়েছে ও। গাড়িটার চেহারা খুবই খারাপ, যেন যে-কোন মুহূর্তে ভেঙে পড়বে, কিন্তু এঞ্জিনটা প্রায় আনকোরা নতুন। নকল লাইসেন্স প্লেট ঝুলানো থাকবে গাড়িতে, কেউ এর হদিস খুঁজে বের করতে পারবে না। এই গাড়িটা তুলৈ রাখা হয়েছিল বিশেষ প্রয়োজনের কথা মনে রেখেই।
