সারা শরীরে আরেকবার হিমশীতল একটা সজীবতার আবেশ অনুভব করল মাইকেল। সনিকে বলল, এ-ধরনের একটা বিষয়ে বান্ধবী বা আর কাউকে কিছু বলব বলে মনে করে আমাকে সাবধান করে দেবার কোন মানে হয় না। ফোন করে বিদায় নেব ওর কাছ থেকে তা তুমি ভাবলে কিভাবে?
তাড়াতাড়ি বলল সনি, ঠিক আছে, ভুল স্বীকার করছি কিন্তু এখনও তো তুই একজন রংরুট; তাই ভাবলাম বানান-টানানগুলো শিখিয়ে দেবার দরকার আছে। যাক, কি বলেছি ভুলে যা।
একমুখ হেসে বলল মাইকেল, এ আরার কি কথা হলো? রংরুট? তুমি যেমন মন দিয়ে বাবার কথা শুনতে, আমিও তেমনি শুনতাম। তা নাহলে এত চালাক হলাম কিভাবে?
ওরা দুজনেই হাসতে শুরু করল।
সবার জন্যে গ্লাসে হুইস্কি ঢালল হেগেন। গম্ভীর দেখাচ্ছে তাকে। রাজনীতিবিদকে জোর করে যুদ্ধে পাঠানো হচ্ছে, আর আইনবিদকে শরণ নিতে হচ্ছে আইনের-গোটা ব্যাপারটাকে এভাবে দেখছে সে। অবশেষে বলল, তা সে। যাই হোক গে, কি করা হবে সেটুকু অন্তত জানা গেল।
২.৩ রেসের তিনটে বাজির স্লিপ
০৩.
অফিসে বসে রেসের তিনটে বাজির স্লিপ নাড়াচাড়া করছে ক্যাপ্টেন ম্যাককাশ্মি। কপালে চিন্তার রেখা, ভাবছে, স্লিপে লেখা সাংকেতিক শব্দগুলো পড়তে পারলে কাজ হত। গত রাতে ওর লোকেরা কর্লিয়নিদের এক বুকমেকারের আস্তানায় হানা দিয়ে সংগ্রহ করেছে এগুলো। দাম দিয়ে এগুলো আবার ফিরিয়ে নিতে হবে বুকমেকারকে, তা না হলে খেলোয়াড়েরা তাদের জেতা টাকা দাবি করতে পারবে না–আর তা যদি ঘটে, বুকমেকারের পিঠের ছাল তুলে ফেলবে তারা।
স্লিপে লেখা কথাগুলোর অর্থ উদ্ধার করা ম্যাকক্লাস্কির জন্যে খুব গুরুত্বপূর্ণ, তা না হলে বুকমেকারের কাছে এগুলো ক্বিক্রি করার সময় ঠকতে হবে তাকে। কারবার যদি পঞ্চাশ হাজার ডলারের হয় তাহলে পাঁচ হাজার দাবি করা যেতে পারে, কিন্তু বাজিগুলো যদি অস্বাভাবিক বড় ধরনের হয়ে থাকে। যদি লাখ লাখের ব্যাপার হয়, তাহলে তো সেই অনুপাতে দামও অনেক বাড়বে। ঠিক আছে, বুকি ব্যাটা খানিক ভেবে মরুক, তারপর সেই একটা প্রস্তাব দিক, তখন বোঝা যাবে ঠিক কত দাম চাওয়া যেতে পারে।
দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে ম্যাকক্লাস্কি দেখল তুর্ক সলো:কে তুলে নেবার সময় হয়েছে, কর্লিয়নিদের সাথে কথা বলার জন্যে কোথায় যে কে নিয়ে যেতে হবে। পোশাক পাল্টে ইউনিফর্ম পরল সে, স্ত্রীকে ফোনে ডেকে বলে দিল আজ রাতে বাড়িতে খাবে না, জুরুরী একটা কাজে যাচ্ছে সে, ফিরতে দেরি হবে। পেশা সংক্রান্ত কোন কথা স্ত্রীকে কখনও জানায় না সে, তার কারণ স্ত্রীর ধারণা পুলিশ স্বামীর বেতনেকটাকাতেই তাদের সংসারে এই সচ্ছলতা। আপন মনে হাসল সে, মনে পড়ে গেছে তার মায়েরও এই রকম ধারণা ছিল। কিন্তু তার নিজের ব্যাপারটা আলাদা, খুব কম বয়সেই সব শেখা হয়ে গিয়েছিল তার। বাবাই তাকে পথ চিনিয়ে ছিলেন।
পুলিশ সার্জেন্ট ছিলেন বাবা। ছেলেকে সাথে নিয়ে হপ্তায় ছয়বার নিজের এলাকায় যেতেন তিনি, দোকানদারদেরকে বলতেন, এটি আমার ছেলে। দোকানদাররা ওর গায়ে মাথায় আদরের হাত বুলাত, ওর সাথে করমর্দন করত, ওর উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করত, পাঁচ-দশ ডলার উপহারও দিত। দিনের শেষে দেখা যেত, খুদে ম্যাকক্লাস্কির সবগুলো পকেট কাগুঁজে নোটে বোঝাই হয়ে গেছে। ছোট তো, তাই ভাবত যে তার বাবার বন্ধুরা এত ভাল আর ধনী যে যতবার দেখা হয় ততবারই তাকে টাকা উপহার দেয়। টাকাগুলো ব্যাংকে তার নামে জমা রাখতেন বাবা, তার কলেজের খরচ মেটানো হবে বলে। খোকা মার্কের কপালে বড়জোর পঞ্চাশ সেন্ট জুটত হত-খরচের জন্যে।
বাড়িতে পুলিশ কাকারা জানতে চাইত, বড় হলে তুমি কি হবে? সাথে সাথে জবাব দিত সে, পুলিশ হব। গলা ছেড়ে হাসত সবাই। বাবার ইচ্ছা ছিল আগে কলেজের পড়া শেষ করুক সে, তারপর না হয় পুলিশেই ভর্তি হবে, কিন্তু হাই স্কুল শেষ করেই পুলিশে ঢোকার জন্যে পড়াশোনা শুরু করে দিল সে।
পুলিশ হিসেবে খুব সাহসী আর কড়া ম্যাকক্লাস্কি, প্রথম দিকে রাস্তার মোড়ে যত গুণ্ডা আর রংবাজ শয়তানি করে বেড়াত তারা ওকে আসতে দেখলেই ছুটে পালাতে দিশা পেত না। টিকতে না পেরে শেষ পর্যন্ত তারা ওর এলাকা ছেড়েই চলে গেছে। ওর বিচক্ষণতারও প্রশংসা করতে হয়, নিজের ছেলেকে কখনও দোকানদারদের কাছে নিয়ে যায় না। ঘুষ খায়, নিজেই হাত পেতে খায়। আর সব পুলিশের মত পায়ে হেঁটে টহল দেবার সময় শীতের ভয়ে সিনেমায় বা কোন রেস্তোরাঁয় ঢুকে পড়বে না সে। ব্যবসায়ী আর দোকানদারদের নিরাপত্তার দিকটা তো দেখেই, তাদের অনেক সুবিধেও করে দেয়। মদ্যপ মাতাল, আর গুণ্ডা পাণ্ডারা বাওয়ারির দিক থেকে ওর এলাকায় এসে উৎপাত শুরু করলে রক্ষচক্ষু মেলে এমনভাবে তাড়া করে যে বাছাধনেরা ভুলেও আর এদিকে পা বাড়াতে সাহস পায় না। এসব কারণে দোকানদাররা তার প্রতি কৃতজ্ঞ।
সব ব্যাপারে একটা নিয়ম মেনে চলতে চেষ্টা করে ম্যাকক্লাস্কি। তার এলাকার বুকিরা সবাই জানে নিজে বেশি লাভ করার জন্যে সে কখনও ওদেরকে বিপদে ফেলবে না। থানার কমিশনের বরাদ্দ ভাগ নিয়েই খুশি সে। আসলে কাজে ফাঁকি দেয় না লোকটা, ঘুষ খায় ন্যায্য ভাবে, তাই চাকরিতে তার পদোন্নতি নিয়মিত ভাবেই হয়ে আসছে।
