অবিশ্বাস ভরা চার জোড়া চোখ অপলক তাকিয়ে আছে ওর দিকে। ক্লেমেঞ্জা আর টেসিও হতভম্ব। হেগেন অবাক হয়নি, কিন্তু বিষণ্ণ দেখাচ্ছে তাকে। শুধু কিউপিড় মুখটা কৌতুকে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে সনির।
হঠাৎ পাগলের মত হো হো করে হেসে উঠল সনি। কৃত্রিম নয়, তলপেটের ভিতর থেকে উঠে আসা অট্টহাসি। মাইকেলের দিকে আঙুল তুলে প্রচণ্ড হাসির ফাঁকে কথা বলার চেষ্টা করছে সে। তুই, কলেজের সেরা ছেলে তুই, পারিবারিক ব্যবসার সাথে নিজেকে কখনও জড়াতে চাসনি, আর আজ হঠাৎ কথা নেই বার্তা নেই সেই তুই-ই কিনা দুদুজন লোককে একেবারে খুন করে ফেলতে চাইছিস? তাও শুধু সলোযোকে নয়, তার সাথে একজন পুলিশ ক্যাপ্টেনকেও? কারণ ক্যাপ্টেন ম্যাককুাস্কি তোর মুখ ভেঙে দিয়েছে। দেখ মাইক, ব্যাপারটাকে তুই ব্যক্তিগতভাবে নিচ্ছিস। আহা, বুঝছিস না কেন, এটা ব্যবসা-ব্যক্তিগত কিছু নয়। সামান্য একটা চড় খেয়েই তোর এই অবস্থা? এতেই দুজন লোককে মেরে ফেলতে চাইছিস? যত্তোসব! এই করেই এতগুলো বছর কাটিয়ে দিয়েছিস!
ব্যাপারটা সম্পূর্ণ ভুল বুঝল ক্লেমেঞ্জা আর টেসিও। ওরা ভাবছে ছোট ভাইয়ের এমন একটা দুঃসাহসিক প্রস্তাব শুনে প্রশংসায় হাসছে সনি। তাই ওরাও মাইকেলের দিকে ফিরে তাকে উৎসাহ দিয়ে হাসতে শুরু করল। শুধু হেগেন ব্যাপারটা ধরতে পেরে সাবধান হয়ে গেল, সতর্কতার সাথে সব রকম ভাব মুছে ফেলল মুখ থেকে।
এক এক করে সবার দিকে তাকাল মাইকেল, তারপর ফিরল সনির দিকে। এখনও হাসি থামাতে পারেনি সনি। বলে চলেছে, এ কি শুনছি আমি? আমার ছোট ভাই মাইকেল, তুই, তুই কিনা দুজন লোককে খুন করবি? দেখ ভাই, এ-কাজে তুই কিন্তু কোন পদক পাবি না। বিনিময়ে ওরা তোকে ইলেকট্রিক চেয়ারে বসাবে। জানিস তো? আবার একচোট হেসে নিল সনি। এটা ছেলেমানুষি কোন কাজ নয়, ভাই, এক মাইল দূর থেকে কাউকে গুলি করা নয়। একজন লোকের চোখের সাদা অংশটা পরিষ্কার দেখা গেলে তবে গুলি করতে হয়, মনে আছে, স্কুলে শেখানো হয়েছিল? একেবারে গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে খুলি উড়িয়ে দিতে হয়, তাতে তোমার সুন্দর আইভি লীগের সটে তার মাথার মগজ ছিটকে এসে লাগে। এক ব্যাটা হাঁদারাম পুলিশ তোমাকে চড় মেরেছে আর তাতেই এইসব করতে ইচ্ছা করছে তোমার? হাসিটা এখনও থামাতে পারছে না সনি।
সবাই তাকিয়ে আছে ওর দিকে, বুঝতে পারছে মাইকেল। ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল ও। এবার হাসিটা থামাও তোমার শান্ত কিন্তু আশ্চর্য দৃঢ়তার সাথে বলল মাইকেল। ঋজু ভঙ্গিতে, শক্ত পাথরের মূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ও। ওর মধ্যে এমন অভাবিত পরিবর্তন দেখে নিমেষে মুখের হাসি মুছে গেল ক্লেমেঞ্জা আর টেসিওঁর। মুহূর্তে বদলে গেছে পরিবেশটা। তেমন বিশালদেহী বা শক্তিশালী নয় মাইকেল, প্রচণ্ড রাগে গনগনে আগুনের মত চেহারা হয়েছে ওর, এখন ওর দিকে তাকিয়ে থাকার জন্যে সাহসের দরকার। সটান অনড় দাঁড়িয়ে থাকার ভঙ্গির মধ্যে বিচ্ছুরিত হচ্ছে বিপদের সংকেত। চোখের রঙ হয়ে উঠেছে আশ্চর্য ফিকে বাদামী, মুখের চেহারা সম্পূর্ণ বিবর্ণ। ভয়ে টিপটিপ করছে সবার বুক, এই বুঝি বড় ভাইয়ের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল মাইকেল। বুঝতে বাকি নেই কারও, এখন যদি হাতে অস্ত্র থাকত মাইকেলের, বিপদ হত অগ্রজের।
ধীরে ধীরে মুখের হাসি মান হয়ে গেল সর্নির।
মৃদু, ঠাণ্ডা গলায় জানতে চাইল মাইকেল, তুমি বলতে চাইছ কাজটা আমি করতে পারব না?
হাসির শেষ রেশটুকুও মুখ থেকে মুছে নিয়েছে সনি। আপসের সুর ফুটল তার গলায়, বলল, পারবি না তা বলিনি, আমি জানি তুই পারবি। আমি তোর বক্তব্য শুনে হাসিনি। শেষ পর্যন্ত ব্যাপারটা কি রকম অদ্ভুত দাঁড়াচ্ছে তাই ভেবে হাসছি। আর কেউ না জানুক, আমি তো জানি আর সব সময় বলেও এসেছি যে কর্লিয়নি পরিবারে তুই-ই সবচেয়ে শক্ত বান্দা, এমন কি ডনের চেয়েও কঠিন পাত্র। বাবার প্রভাব এড়িয়ে একমাত্র তুই-ই তো মাথা তুলে নিজের শক্তির জোরে গড়ে উঠেছিস। ছোট বেলার কথা ভুলে গেছি মনে করেছিস? এমন বেপরোয়া আর মেজাজী ছিলি, বাপরে! আমার সাথে মারামারি করতেও তুই পিছপা হতিস না, অথচ তোর চেয়ে আমি কত বড়। আর ফ্রেডিকে তো হপ্তায় অন্তত একবার না পেটালে তোর পেটের খাবার হজম হত না। কিন্তু এসব কথা জানে কে? সবাই জানে তুই ভীতুর ডিম না হলেও সাদাসিধে গোবেচারা তো বটেই, যাকে বলে ভাল-মানুষ। সলোয়যাও তোকে সেই রকম বোকাসোকা আর নিরীহ কিছু একটা ধরে নিয়েছে, সেজন্যে তাকে দোষ দেয়া যায় না। পারিবারিক হাঙ্গামা থেকে তুই তো সব সময় দূরে সরে থেকেছিস। ম্যাকক্লাস্কিও ধরে নিয়েছে তোর সাথে মুখোমুখি দেখা করলে বিপদের কোন ভয় নেই।
একটু থেমে, গলার স্বর খাদে নামিয়ে আবার বলল সনি, কিন্তু, ওরে হারামজাদা, তুইও একজন কর্লিয়নি! কথাটা শুধু আমারই মনে ছিল, তাই বাবা গুলি খাবার পর থেকে এখানে বসে অপেক্ষা করছি কখন তুই খোলস ছেড়ে বেরিয়ে পড়বি। অপেক্ষা করছি কখন তুই আমার ডান হাত হয়ে উঠবি। যারা আমাদের পরিবারকে ধ্বংস করতে চাইছে তুই আর আমি মিলে তাদের সব কটাকে মুছে ফেলব দুনিয়ার বুক থেকে। আমি কি ছাই জানতাম, সেফ চোয়ালে একটা ঘুসির অপেক্ষায় আছে সব? জানলে তো…এবার কি বলবি, বল। সকৌতুকে একটা ঘুসি পাকাল সনি; তারপর আবার বলল, বল, এবার কি বলবি?
