সিগারেট ফুঁকছে দশ মিনিটও হয়নি, আচমকা রাতের বাতাস চিরে তীক্ষ্ণ সুরে বেজে উঠল পুলিশের সাইরেন। নাইনথু এভিনিউয়ের মোড়ে একটা টহলদার পুলিশ কারের নাক দেখা গেল, এত দ্রুত বাক নিচ্ছে য়ে টায়ারের সাথে রাস্তার প্রচণ্ড ঘ লেগে বিকট শব্দে গোটা এলাকা সচকিত হয়ে উঠল। য্যাচ করে কে কবে হাসপাতালের সামনে থামল কারটা। ওটার পিছনে এসে দাঁড়াল আরও দুটো স্কোয়াড কার। হাসপাতালের গেটের সামনে ইউনিফর্ম পরা পুলিশের ভিড় লেগে গেল। স্বস্তির হাঁফ ছাউল মাইকেল। মনে মনে প্রশংসা করল সনির ভাবল, পুলিশে খবর পাঠাতে দেরি করেনি ও। লাইটপোস্টের নিচ থেকে ভিড়টার দিকে এগোল সে।
যেন সুযোগের অপেক্ষায় ছিল, মাইকেলকে নড়তে দেখেই দুদিক থেকে স্যাঁত করে এগিয়ে এসে ওর দুটো হাত চেপে ধরল দুজন পুলিশ। আরেকজন ওকে সার্চ করতে শুরু করল। ওদিকে ভিড় ঠেলে দ্রুত এগিয়ে আসছে একজন পুলিশ ক্যাপ্টেন, লোকটা যেমন লম্বা তেমনি চওড়া, চেহারায় রগচটা ভাব, সবাই তাকে, সসম্মানে পথ ছেড়ে দিচ্ছে। অমন প্রকাণ্ড শরীর নিয়ে এমন ক্ষিপ্রতার সাথে হাঁটছে, দেখে অবাক হয়ে গেল মাইকেল। সোনালী ফিতে বসানো টুপির নিচে পাকা চুল দেখা যাচ্ছে। কাঁচা গরুর মাংসের মত লাল মুখটা। সোজা এগিয়ে এসে মাইকেলের সামনে দাঁড়িয়ে বলল, তোমার মত সব হারামী গুণ্ডাকে হাজতে ভরতে পেরেছি বলে মনে করেছিলাম, এখন দেখছি ভুল হয়েছে আমার। কোথাকার মস্তান তুমি, এখানে কোন মতলবে?
ওর কাছে কোন অস্ত্র নেই, ক্যাপ্টেন, মাইকেলের পাশ থেকে একজন পুলিশ জানাল।
কোন কথা বলছে না মাইকেল। আবেগ বা ভাবের কোন চিহ্নমাত্র নেই ওর চেহারায়, শুধু ইস্পাতের মত নীল চোখের তীক্ষ্ণ কিন্তু ঠাণ্ডা দৃষ্টি দিয়ে দেখছে ক্যাপ্টেনকে।
ডনের ছেলে, মাইকেল কর্লিয়নি ও, সিভিল ড্রেস পরা একজন ডিটেকটিভ বলল।
বাবাকে পাহারা দিচ্ছিল গোয়েন্দারা, তারা হঠাৎ গেল কোথায়? কে সরিয়েছে তাদেরকে? মৃদু, শান্ত গলায় জানতে চাইল মাইকেল।
প্রচণ্ড রাগে টকটকে লাল হয়ে উঠল ক্যাপ্টেনের মুখ। ব্যাটা বদমাশ, গুণ্ডা, স্পর্ধা তো কম নয়। হুংকার ছেড়ে বলল ক্যাপ্টেন, শালা হারামী, আমার কাছে জুবাবদিহি চাও? নরকের কীট যত, সব গুণ্ডারা কে কাকে খুন করল না করল তাতে আমার বয়েই গেল। সে-ক্ষমতা যদি থাকত আমার, তোমার ওই স্বনামধন্য বাপকে বাঁচাবার জন্যে একটা আঙুলও তুলতাম না যাও, এবার ভাগো এখান থেকে। ফের যদি ভিজিটিং আওয়ারের আগে বা পরে এখানে দেখি তোমাকে, হাড় গুড়ো করে ফেলব।
একদৃষ্টিতে, গভীর মনোযোগর সাথে এখনও ক্যাপ্টেনকে লক্ষ করছে মাইকেল। লোকটার কথায় একটুও রাগ হয়নি ওর। মাথার ভিতর শুধু ঝড়ের গতিতে চিন্তা চলছে। তবে কি ওই প্রথম গাড়িটায় সনোযো ছিল, ওকে হাসপাতালের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে গেছে সে? এও কি সম্ভব যে সেই ফোন করে ক্যাপ্টেনকে বলেছে-ক্যাপ্টেন, তুমি কোন কাজেরই নও, কর্লিয়নি পরিবারের লোকেরা এখনও হাসপাতালের আশপাশে রয়েছে। এজন্যেই কি টাকা দেয়া হয়েছে তোমাদেরকে? গোটা ব্যাপারটাই পূর্বপরিকল্পিত, সনির এই কথাটাই কি তবে ঠিক? হ্যাঁ, ভাবছে মাইকেল, কাঁটায় কাঁটায় মিলে যাচ্ছে।
এতসব চিন্তা করেও মাথা ঠাণ্ডা রেখেছে মাইকেল। মৃদু শান্ত কণ্ঠে ক্যাপ্টেনকে জানাল, আগে তুমি বাবার কামরার চারদিকে পাহারা বসাও, তা নাহলে এখান থেকে যাচ্ছি না আমি।
ঝট করে পাশে দাঁড়ানো ডিটেকটিভের দিকে তাকাল ক্যাপ্টেন, ইঙ্কার ছেড়ে বলল, একে গ্রেফতার করো, ফিল।
ইতস্তত করছে ডিটেকটিভ। …মানে, ওর কাছে অস্ত্র পাওয়া যায়নি, ক্যাপ্টেন। যুদ্ধে বীরত্ব দেখিয়ে সুনাম কিনেছে, তাছাড়া এমনিতেও শান্ত প্রকৃতির ছেলে, কখনও কোন বেআইনী ঝামেলায় নিজেকে জড়ায়নি। এ নিয়ে কড়া সমালোচনা হতে পারে খবরের কাগজে।
মারমুখো হয়ে ডিকেটটিভের দিকে ফিরল ক্যাপ্টেন, রাগে অন্ধ হয়ে গেছে। ওকালতি করতে বলিনি, এই হারামজাদাকে গ্রেফতার করতে বলেছি তোমাকে, ফিল।
এখনও সম্পূর্ণ শান্ত মাইকেল। রাগের সাথে নয়, হিমশীতল বিদ্বেষের সাথে মৃদু গলায় বলল ও, বাবাকে শেষ করার জন্যে সলোযো তোমাকে কত টাকা দিয়েছে, ক্যাপ্টেন?
মাইকেলের দিকে ফিরল ক্যাপ্টেম। ওকে ধরো, মাইকেলের দুপাশে দাঁড়ানো ডিটেকটিভদের উদ্দেশ্যে চেঁচিয়ে উঠল সে।
মাইকেল অনুভব করল দুই জোড়া হাত ওর শরীরটাকে পেঁচিয়ে ধরেছে শক্ত করে। দেখতে পাচ্ছে ক্যাপ্টেনের পাকানো মুঠো ধনুকের মত বাঁকা হয়ে এগিয়ে আসছে ওর মুখের দিকে। মাথাটা সরিয়ে নেবার চেষ্টা করল ও, নাকে না লেগে ঘুষিটা লাগল চোয়ালের হাড়ে। মাথার ভিতরটা যেন বিস্ফোরিত হলো ওর, রক্ত আর ছোট ছোট হাড়ের কুঁচিতে ভরে গেছে মুখের ভিতরটা, সেগুলো যে দাঁতের টুকরো, বুঝতে পারল মাইকেল। মাথার একটা দিক তেকোণা আলুর মত ফুলে উঠেছে ওর। শক্তি পাচ্ছে না পায়ে, পড়েই যাচ্ছিল, কিন্তু ওকে টেনে দাঁড় করিয়ে রাখল পুলিশ দুজন। তবে জ্ঞান আছে এখনও ওর। ক্যাপ্টেন আর ওর মাঝখানে সিভিল ড্রেস পরা সেই ডিটেকটিভ লোকটা এসে দাঁড়াল, অনেকটা ক্যাপ্টেনকে বাধা দেবার ভঙ্গিতে। সে বলল, হায়হায়, ক্যাপ্টেন, আপনি সত্যিই ওকে মারলেন!
