নল খোলার দরকার নেই, বলল নার্স, স্ট্যাণ্ডগুলোরও চাকা আছে, গড়িয়ে নিয়ে যাওয়া যাবে।
আশপাশে কোথাও খালি কামরা আছে? ফিসফিস করে জানতে চাইল মাইকেল।
আছে, হলের শেষ মাথায়।
দ্রুত, দক্ষতার সাথে সারা হলো কাজটা। তারপর নার্সকে বলল মাইকেল, আমাদের লোকজন না আসা পর্যন্ত বাবার সাথে এখানেই থাকো তুমি। বাইরে তোমার নিজের জায়গায় থাকতে নিষেধ করছি, তার কারণ ওখানে থাকলে তুমিও আহত হতে পারো।
ঠিক এই সময় অপ্রত্যাশিতভাবে বিছানার দিক থেকে বাবার গলা ভেসে আসতে শুনল মাইকেল, ভাঙা ভাঙা, কিন্তু জোরাল আওয়াজ, কে, মাইকেল নাকি? কি ঘটেছে? ব্যাপারটা কি?
বিছানার উপর ঝুঁকে পড়ে বাবার একটা হাত ধরল মাইকেল। বলল, হ্যাঁ, আমি মাইক। ভয় পেয়ো না। শোনো, বারা, একটুও আওয়াজ কোরো না তুমি, বিশেষ করে কেউ যদি তোমার নাম ধরে ডাকে। কিছু লোক তোমাকে খুন করতে চাইছে, বুঝলে? কিন্তু আমি এখানেই আছি, তোমার ভায়ের কিছুই নেই।
তাঁর কি হয়েছে তা এখনও ভার্ল ঠাহর করতে পারছেন না ডন কর্লিয়নি, সারা শরীরে প্রচণ্ড ব্যথা, তবু ছোট ছেলের কথা শুনে অতি কষ্টে অমায়িক হাসলেন তিনি, বললেন, আজ কেন ভয় পাব? সেই বারো বছর বয়স থেকে কত অচেনা লোক আমাকে মেরে ফেলার জমে এসেছে।
২.২ ছোট বেসরকারী হাসপাতাল
০২.
এটা একটা ছোট বেসরকারী হাসপাতাল, ভিতরে ঢোকার একটাই পথ। জানালা দিয়ে নিচে রাস্তার দিকে তাকাল মাইকেল। উঁচু উঠান থেকে সিঁড়িটা রাস্তায় গিয়ে নৈমেছে, রাস্তার এদিক ওদিক কোথাও কোন লোক বা গাড়ি দেখা যাচ্ছে না। তীক্ষ্ণ দৃষ্টি বুলিয়ে বুঝে নিল, সে হাসপাতালের ভিতর কেউ যদি ঢুকতে চায় তাকে ওই একটা প্রবেশ পথ দিয়েই ঢুকতে হবে। কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে, এ-ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই তার। সময়ও হয়ে এসেছে। কামরা থেকে ছুটে বেরিয়ে এল সে, চারটে সিঁড়ির সবগুলো ধাপ টপকে নিচে পৌঁছুল, তারপর সদর দরজা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসার সময় লক্ষ করল, পাকা চত্বরটায় কোন গাড়ি বা অ্যাম্বুলেন্স নেই।
হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে এসে ফুটপাথে দাঁড়াল মাইকেল, সিগারেট ধরাবার সময় লক্ষ করুল হাত দুটো একটু একটু কাঁপছে তার। কোটের বোম খুলে ফেলল সে, এগিয়ে গিয়ে দাঁড়াল একটা লাইট-পোস্টের নিচে, যাতে সবাই ওর মুখ দেখতে পায়। বগলে একটা প্যাকেট নিয়ে নাইনথ এভিনিউ থেকে হন হন করে এগিয়ে আসছে এক যুবক, পরনে কষ্যাট জ্যাকেট, মাথা ভর্তি একরাশ আঁকড়া চুল। আলোর নিচে আসতেই তাকে চেনা চেনা লাগল মাইকেলের, কিন্তু এর আগে কোথায় দেখেছে তা স্মরণ করতে পারল না। ঠিক ওর সামনে এসে দাঁড়াল যুবক, হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে প্রকট ইতালীয় সুরে বলল, ডন মাইকেল, আমাকে আপনি চিনতে পারছেন না? আমি এনজো, বেকারী মালিক নাজরিনির সহকারী, তার জামাইও। সরকারকে বলে আমার আমেরিকায় থাকার ব্যবস্থা করে দিয়ে আপনার বাবা আমার মস্ত উপকার করেছিলেন।
করমর্দনের জন্যে এনজের হাতটা ধরল মাইকেল, এখন তাকে চিনতে পারছে ও।
আপনার বাবাকে শ্রদ্ধা জানাব বলে এসেছি, বলছে এনজো। এত রাতে ওরা কি আমাকে ঢুকতে দেবে ভিতরে?
একটু হেসে এদিক ওদিক মাথা, দোলাল মাইকেল, বলল, না, তা দেবে না–তুমি এসেছ সেজন্যে তোমাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। তুমি যে এসেছিলে তা আমি ডনকে জানাব। ঝড়ের বেগে, প্রচণ্ড গর্জন তুলে একটা গাড়ি আসছে দেখে সতর্ক হয়ে উঠল মাইকেল, এনজোকে দ্রুত বলল, তুমি বরং শিগগির পালাও। এখানে একটা গোলমাল হবে। পুলিশের ঝামেলায় জড়িয়ে কাজ নেই।
ভয়ে শুকিয়ে গেল এনজোর মুখ। পুলিশেব কুনজরে পড়লে আমেরিকা থেকে বের করে দেয়া হতে পারে-ওকে, হয়তো নাগরিকত্বও পাবে না সে। তবু একচুল নড়ল না, সটান নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। ফিসফিস করে ইতালী ভাষায় বলল, যদি গোলমাল বাধে, এখানে দাঁড়িয়ে আপনাকে সাহায্য করতে চাই। গড ফাদারের ঋণ শোধ করার একটা সুযোগ যদি পাই, মন্দ কি?
কথাগুলো হৃদয় স্পর্শ করল মাইকেলের। কেটে পড়ার জন্যে আবার তাড়া লাগাতে যাচ্ছিল, হঠাৎ কি মনে করে ভাবল, না হয়থেকেই যাক না ছোকরা। কাজ হাসিল করার জন্যে সলোমো যাদেরকে পাঠাবে তারা হাসপাতালের সামনে দুজনকে দেখলে হয়তো পিছু হটতেও পারে। একজনকে দেখলে অবশ্যই পিছু হটবে না। এনজোর হাতে একটা সিগারেট গুঁজে দিয়ে সেটা ধরিয়ে দিল মাইকেল। ডিসেম্বরের হাড় কাঁপানো শীতের রাতে লাইটপোস্টের আলোর নিচে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে ওরা। বড়দিন উপলক্ষ্যে হাসপাতালের জানালাগুলো সবুজ পাতার মালা দিয়ে সাজানো হয়েছে, হলুদ সার্সিগুলো দুভাগ হয়ে গিয়ে জোড়া চোখের মত, লাগছে, জুল জুল চোখে তাকাচ্ছে ওদের দিকে।
ওদের সিগারেট প্রায় শেষ হয়ে এসেছে, এই সময় নিচু, লম্বা, কালো একটা গাড়ি নাইন এভিনিউ থেকে বাঁক নিয়ে থার্টিয়েথ স্ট্রীটে ঢুকল। ফুটপাথ ঘেঁষে আসছে গাড়িটা, সোজা ওদের দিকে।
প্রায় দাঁড়িয়ে পড়েছে গাড়িটা। সামনের দিকে ঝুঁকে নিচু হলো মাইকেল, উঁকি দিয়ে গাড়ির ভিতরটা দেখতে চেষ্টা করছে। নিজের অজ্ঞাতেই কুঁকড়ে যাচ্ছে তার শরীরটা। স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ছে গাড়িটা, কিন্তু হঠাৎ স্পীড বাড়িয়ে দিয়ে হুস করে ছুটে গেল। গাড়ির ভিতর থ্রেকে চিনতে পেরেছে ওরা মাইকেলকে। আরেকটা এনজোর দিকে সিগারেট বাড়িয়ে দিল মাইকেল লক্ষ করল, এনজার হাত দুটো কাঁপছে, কিন্তু এখন আর ওর নিজের হাত কাঁপছে না দেখে আশ্চর্য হয়ে গেল সে।
