ট্যাক্সি থেকে ফ্রেঞ্চ হাসপাতালের সামনে নামল মাইকেল। নেমেই হকচকিয়ে গেল সে। কোথাও কেউ নেই, রাস্তা একেবারে খা খা করছে-ব্যাপার কি? আরও বিস্ময় অপেক্ষা করছে তার জন্যে, হাসপাতালের ভিতর ঢুকে দেখল লবিতেও কেউ নেই। এর মানেটা কি? ভাবছে মাইকেল। ক্লেমেঞ্জা আর টেসিওর এ কেমন দায়িত্ববোধ? ওয়েস্ট পয়েন্টের সামরিক ট্রেনিং না হয় পায়নি ওরা, তবু পাহারাদার রাখা যে দরকার এটুকু সামরিক শিক্ষা তো ওদের থাকা উচিত।
সতর্ক হয়ে উঠেছে মাইকেল, বুঝতে পারছে, সাংঘাতিক কোন গোলমাল হয়েছে কোথাও। প্রায় সাড়ে দশটা বাজে, শেষ আগন্তুকও অনেক্ষণ আগে চলে গেছে। অনুসন্ধান ডেস্কে দাঁড়াল না ও, চার তলায় বাবার কামরার নম্বর জানা আছে ওঁর। এলিভেটরে চড়ে সোজা উপরে উঠে এল। চারতলায় নার্সদের বসবার জায়গায় না পৌঁছানো পর্যন্ত কেউ ওকে বাধা দিল না দেখে আশ্চর্য হয়ে গেল। একজন মাত্র নার্স, তার প্রশ্ন গায়ে না মেখে সোজা বাবার কামরার দিকে এগোল। কেউ নেই দরজার সামনে। দুজন গোয়েন্দার থাকার কথা ওখানে, কেউ যদি ভিতরে ঢুকতে চায় তাকে প্রশ্ন করার এবং বাবাকে পাহারা দেয়ার কথা ওদের–এরাই বা কোন চুলোয় গেছে? তাছাড়া, ভাবছে মাইকেল, টেসিও? ক্লেমেঞ্জা? ওরা কি কামরার ভিতর রয়েছে?
দরজাটা খোলা। ভিতরে ঢুকল মাইকেল। কেউ নেই কামরায়। শুধু বিছানায় শুয়ে আছে একজন। ডিসেম্বরের ঠাণ্ডা চাঁদের আলো জানালার কাঁচ ভেদ করে বিছানার উপর এসে পড়েছে, বাবার মান মুখটা পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছে মাইকেল। চেহারায় ভাবের লেশ মাত্র নেই, নিঃশ্বাসগুলো ছোট-বড়, বুকের উত্থান-পতন টের পাওয়া যায় কি যায় না। একটা নল এসে ঢুকেছে নাকের ফুটোয়, নিচের মেঝেতে কাঁচের একটা পাত্র, তাতে পেটের যত অশুদ্ধ তরল পদার্থ নল বেয়ে এসে জমা হচ্ছে। মাত্র কয়েক সেকেণ্ড দাঁড়াল মাইকেল, দেখল ভালভাবেই আছেন বাবা। তারপর ধীরে ধীরে পিছু হটে বেরিয়ে এল কামরা থেকে।
আমার নাম মাইকেল কর্লিয়নি, নার্সকে বলল সে, বাবার পাশে শুধু একটু বসে থাকতে চাই আমি। আচ্ছা, বলতে পারো, এখানে যাদের পাহারা দেবার কথা ছিল তারা কোথায় গেছে?
বয়স কম নার্সের, দেখতে ভাল, নিজের পদ-মর্যাদা সম্পর্কে পূর্ণ সচেতন। জানাল, আপনার বাবাকে দেখার জন্যে বড় বেশি লোকজন আসছিল কিনা, তাতে, কাজের খুব অসুবিধে হচ্ছিল, তাই পুলিশ এসে সবাইকে ভাগিয়ে দিয়েছে। তারপর, এই তো পাঁচ মিনিট আগে হেডকোয়ার্টার থেকে জরুরী ফোন পেয়ে পুলিশরাও সবাই চলে গেল। অবশ্য চিন্তার কিছু নেই, একটু পরপরই উঁকি দিয়ে দেখে আসছি আমি আপনার বাবাকে। এখনও কোন সাড়া পাচ্ছি না তার। দরজা তো সেই জন্যেই খুলে রেখেছি।
ধন্যবাদ, বলল মাইকেল। বাবার কাছে আমি একটু বসি, কেমন?
একটু হাসল মেয়েটা, বলল, কিন্তু একটু পরই চলে যেতে হবে আপনাকে, তাই না? নিয়মের কথা আপনার তো জানাই আছে।
বাবার কামরায় ফিরে এল মাইকেল। দ্রুত ফোনের রিসিভার। তুলে হাসপাতালের অপারেটরকে লং বীচের নম্বর দিতে বলল। উত্তর দিল সনি। ফিসফিস করে তাকে বলল মাইকেল, হাসপাতাল থেকে বলছি, ভাই। দেরি করে এখানে এসে দেখি কোথাও কেউ নেই। টেসিও, ক্লেমেঞ্জা-ওদের কারও একজন মোকও দেখিনি। দরজায় যাদের থাকার কথা ছিল, সেই গোয়েন্দারাও বাতাসে মিলিয়ে গেছে। বাবা এখন সম্পূর্ণ অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছেন।
ভয়ে আর বিস্ময়ে অনেকক্ষণ কোন কথা বলতে পারল না সনি, তারপর চাপা উদ্বিগ্ন কণ্ঠস্বর শুনতে পেল মাইকেল, তোর মনে আছে, বলেছিলি সনোযো একটা চাল চালবে? এটা হলো তার সেই চাল, বুঝলি?
আমারও তাই মনে হচ্ছে, বলল মাইকেল। কিন্তু পুলিশের সব লোকদের সরাতে পারল কিভাবে? তারা গেছেই বা কোথায়? আর টেসিওর লোকজন? কি সর্বনাশ, তুমি কি বলতে চাও..মাই গড! তবে কি বিশ্বাস করতে হবে ব্যাটা শয়তান সলোযো নিউ ইয়র্কের পুলিশ বিভাগকেও হাত করে ফেলেছে?
অভয় দিয়ে ছোট ভাইকে বলল সনি, শান্ত হ মাইক। কপাল ভাল বলতে হবে যে তুই এত দেরি করে হাসপাতালে পৌচেছিস। বাবার কামরা ছেড়ে কোথাও এক পা নড়বি না। ভেতর থেকে বন্ধ করে দে দরজাটা। কয়েকটা ফোন করতে যেটুকু সময় লাগবে, তারপরই পনেরো জন নোক পৌঁছে যাচ্ছে তোর কাছে। শান্ত হয়ে বসে থাক, একটুও ঘাবড়াবি না। ঠিক আছে?
না, ঘাবড়াচ্ছি না, বলল মাইকেল। ব্যাপারটা শুরু হবার পর এই প্রথম প্রচণ্ড রাগে সারা শরীর উত্তপ্ত হয়ে উঠল ওর, বাবার শত্রুদের উপর ঠাণ্ডা একটা ঘৃণা আর বিদ্বেয়ে ছেয়ে গেল মন। রিসিভার নামিয়ে রেখে কলিংবেলের বোতামে চাপ দিল ও। কামরায় নার্স ঢুকতেই তাকে বলল, তুমি ভয় পাও তা চাই না, তবে এক্ষুণি এখান থেকে সরাবার ব্যবস্থা করতে হবে বাবাকে। অন্য কোন কামরায় অথবা অন্য কোন ফ্লোরে। নলগুলো খুলতে পারবে? পায়ার সাথে চাকা রয়েছে, খার্টটাকে আমি ঠেলে বের করে নিয়ে যেতে চাই।
আপনার কি মাথা খারাপ হয়েছে? চোখ কপালে তুলে বলল নার্স। ডাক্তারের অনুমতি ছাড়া এসব কিছুই সম্ভব নয়।
কাগজে বাবার কথা পড়েছ তুমি, তাই না? দ্রুত এবং জরুরী ভঙ্গিতে কথা বলতে শুরু করেছে মাইকেল। আমি এক্ষুণি খবর পেলাম, ওঁকে খুন করার জুন্যে রওনা হয়ে গেছে কয়েকজন লোক। যে-কোন মুহূর্তে এই হাসপাতালে এসে পৌঁছুবে তারা। পাহারা দেবার জন্যে এই যে কাউকে দেখছ না, এটাও ওই পক্ষের একটা চাল। দয়া করে বিশ্বাস করো আমার কথা। সাহায্য করো আমাকে। প্রয়োজনের সময় ইচ্ছা করলে যে-কোন মানুষকে প্রভাবিত করার আশ্চর্য একটা গুণ আছে মাইকেলের, এক্ষেত্রেও সেটা কাজে লেগে গেল।
