অকারণ বিষাদে ভরে আছে মনটা, কিছুই ভাল লাগছে না ওর। সমস্ত কিছু ছেড়ে দূরে কোথাও পালাতে ইচ্ছা করছে তার, অন্য কোথাও নিজের পছন্দ মত জীবন কাটাতে চাইছে। কিন্তু পরিবারের এই সংকট কেটে না যাওয়া পর্যন্ত কোথাও চলে যাওয়া সম্ভব নয়। যুদ্ধে একজন সাধারণ নাগরিকেরও কিছু দায়িত্ব থাকে, যতটা সম্ভব সাহায্য করে সে-দায়িত্ব পালন করতে হবে তাকে। হঠাৎ চোখ খুলে গেল মাইকেলের, বুঝতে পারল, সাধারণ নাগরিক মানে বিশেষ সুবিধাভোগী অসামরিক ব্যক্তির ভূমিকা, একজন যোদ্ধার জন্যে অত্যন্ত অসম্মানজনক ভূমিকা-অথচ এই ভূমিকাটাই চাপানো হয়েছে তার ঘাড়ে, সেজন্যেই সাধারণ নাগরিক কথাটা মনে এলেই এত খারাপ লাগছে তার।–
ক্লেমেঞ্জার দুজন লোক গাড়ি করে শহরে পৌঁছে দিচ্ছে মাইকেলকে। খুব ভাল করে তারা আগে দেখে নিল কেউ পিছু নিয়েছে কিনা, তারপর হোটেলের কাছাকাছি একটা মোড়ে নামিয়ে দিল মাইকেলকে। হোটেলে পৌঁছে মাইকেল দেখল, লবিতে তার জন্যে অপেক্ষা করছে কে।
হুইস্কি দিয়ে গলা ভিজিয়ে নিয়ে ডিনারে বসল ওরা। তোমার বাবাকে দেখতে যাচ্ছ কখন? জানতে চাইল কে।
রিস্টওয়াচ দেখল মাইকেল, বলল, সাড়ে আটটার পর হাসপাতালে থাকার নিয়ম নেই কারও, ভাবছি কেউ যখন থাকবে না তখন আমি যাব। দেরি করে গেলেও ওরা আমাকে ঢুকতে দেবে। বাবার কাছে একটু বসতে চাই আমি। এখনও হুঁশ ফিরেছে বলে মনে হয় না, আমি যে গেছি তা টেরই পাবেন না, কিন্তু বাবাকে অনেক ভালবাসি তো, তাঁকে শ্রদ্ধা জানাবার জন্যে একাই যেতে হবে আমাকে।
তোমার বাবার জন্যে মনটা ভাল নেই আমার, শান্ত ভাবে বলল কে, তোমার বোনের বিয়ের সময় দেখেছিলাম, আশ্চর্য ভাল মানুষ বলে মনে হয়েছিল। খবুরের কাগজে ওঁর সম্পর্কে অনেক যা তা কথা লিখেছে, সে-সব আমি একটুও বিশ্বাস করি না।
আমিও সৌজন্য রক্ষা করে মৃদু গলায় বলল মাইকেল। কে-র সাথে কথা বলার সময় অনায়াসে অনেক কিছু চেপে রাখতে পারছে দেখে নিজেই আশ্চর্য হয়ে যাচ্ছে সে। ওকে ভালবাসে নে, বিশ্বাস করে, কিন্তু তবু ওকে বাবার আসল পরিচয় বা পারিবারিক ব্যবসার গোপ তথ্য কোনদিনও বলবে না। যত যাই হোক, কে তো আর পরিবারের ভিতরের কেউ নয়, সে হলো বাইরের মানুষ।
কি করবে বলে ঠিক করেছ তুমি? জানতে চাইল কে। খবরের কাগজে কিসব লিখেছে, এবার নাকি প্রচণ্ড দল-যুদ্ধ শুরু হয়ে যাবে–এসবের সাথে তুমিও জুড়িয়ে পড়বে নাকি, মাইক?
নিঃশব্দে হাসল মাইকেল, কোর্টের বোতাম খুলে সামনেটা ফাঁক করে দেখল, বলল, এই দেখো, আমার কাছে কোন অস্ত্র-টস্ত্র নেই।
ফিক করে হেসে ফেলল কে।
বেশি রাত হয়ে যাচ্ছে, তাই নিজেদের কামরায় চলে এল ওরা। দুজনের জন্যে গ্লাসে হুইস্কি ঢেলে নিয়ে ফিরে এল কে, চড়ে বসল মাইকেলের কোলে। ওর পোশাকের নিচে রেশমী অন্তর্বাস, মাইকেলের আঙুলগুলো ওর উন্মুক্ত উরুর উপর দিয়ে এগোচ্ছে, ঢুকে যাচ্ছে অন্তর্বাসের ভিতর। গ্লাস দুটো নিঃশেষ করে বিছানায় শুয়ে পড়ল ওরা, কাপড়চোপড় না ছেড়েই পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে চুমো খাচ্ছে। তারপর অনেকক্ষণ ধরে চুপচাপ শুয়ে আছে, ওরা, শরীরে উষ্ণতা অনুভব করছে। চাপা কণ্ঠে একসময় জানতে চাইল কে, সৈনিকরা একেই কি কুইকি বলে?
হ্যাঁ।
মন্দ লাগে না কিন্তু!
আবেশে ঝিমিয়ে পড়েছে দুজনেই, হঠাৎ ড়মড় করে উঠে বসল মাইকেল। রিস্টওয়াচে চোখ রেখে আঁতকে উঠল ও, বলল, ইস্, দশটা বেজে এল। আর তো দেরি করা যায় না, এবার হাসপাতালে যেতে হয়।বাথরম থেকে হাত-মুখ ধুয়ে এল সে।
বিছানা থেকে উঠে এসে মাইকেলের পাশে দাঁড়াল কে, তার কোমর জড়িয়ে ধরে বলল, আমাদের বিয়ের আর কত দেরি?
এই ব্যাপারটা মিটে গেলে তুমি যেদিন বলবে সেদিনই। কিন্তু তার আগে সব কথা তোমার মা-বাবাকে ভাল করে বুঝিয়ে বলা দরকার।
কি বুঝিয়ে বলব?
চুলে চিরুনি চালাচ্ছে মাইকেল, বলল, তাঁদেরকে শুধু এইটুকু জানাও যে ইতালীয় পরিবারের এক সুদর্শন, সাহসী ছেলের সাথে পরিচয় হয়েছে তোমার? ছেলেটি ডার্টমাথের ছাত্র, যুদ্ধে ডিসটিংগুইশড সার্ভিস ক্রশ, পার্পল হার্ট পেয়েছে। সৎ। পরিশ্রমী। কিন্তু ছেলের বাপ একজন মাফিয়া নেতা। দরকার হলে দৃষ্ট লোকদের মেরে ফেলতে বাধ্য হন তিনি, ঘুষ দেন সরকারী কর্মচারীদেরকে। আর এসব কাজ করতে গিয়ে নিজেও গুলি খেয়ে ঝাঁঝরা হন। তবে এসবের সাথে তার ছেলের কোন সম্পর্ক নেই। এতসব কথা মনে থাকবে তো?
মাইকেলকে ছেড়ে দিয়ে বাথরুমের দরজায় হেলান দিল কে। সত্যি? তাই? ওসব করতে হয় তাকে? একটু চুপ করে থেকে আবার জানতে চাই, খুন করেন?
সেটা ঠিক বলা যাচ্ছে না। কেউ বলতে পারে না। কিন্তু যদি শুনি লোক মেরেছেন, একটুও অবাক হব না আমি।
দরজা দিয়ে বেরিয়ে যাবে মাইকেল, এই সময় জানতে চাইল কে, আবার কখন দেখা হবে?
ওকে চুমো খেল মাইকেল, তারপর বলল, আমি চাই তুমি তোমাদের গ্রামে ফিরে গিয়ে গোটা ব্যাপারটা ভাল করে ভেবে দেখো। ঝোঁকের বশে জড়িয়ে পড়, তা আমি চাই না। বড়দিনের ছুটি শেষ হলে কলেজে ফিরব, তখন আবার আমাদের দেখা হবে, ঠিক আছে?
বেশ, একটা দীর্ঘশ্বাস চেপে বলল কে। ঠায় দাঁড়িয়ে থেকে দেখল দরজা দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে মাইকেল, এলিভেটরে ওঠার আগে ওর দিকে ফিরে হাত নাড়ল একবার। আজকের মত এত আপনজন বলে মনে হয়নি ওর মাইকেলকে, আজ হঠাৎ যেন আবিষ্কার করতে পেরেছে কত, গভীরভাবে ভালবাসে তাকে ও। এখন যদি কেউ ওকে বলে আগামী তিন বছর মাইকের সাথে আর দেখা হবে না, ওর, সে ব্যথা সহ্য করতে পারবে না।
