এক নিমেষে টুল থেকে পিছলে নেমে পড়েই পাক দিয়ে সরে যাবার চেষ্টা করল লুকা। এরই মধ্যে তার অপর হাতটা ধরে ফেলেছে সলোযো। কিন্তু তাতেও কিছু এসে যায় না, ওদের দুজনের চেয়ে তার একার গায়ে অনেক বেশি জোর।
ব্রুনো লাইটার ফেলে দেয়ার পর থেকে দুই সেকেণ্ডের মধ্যে ঘটে গেল ঘটনাটা। মাত্র এক সেকেণ্ড ধরে থাকতে হলো ওদেরকে লুকার হাত দুটো। এর মধ্যেই লুকার পিছনে একজন লোককে দেখা গেল। বিদ্যৎ গতিতে নড়ে উঠল লোকটার হাত দুটো! রেশমী:দড়ির একটা ফাস লুকার গলায় পরিয়ে দিয়েই হেঁচকা টান মারল সে। দম বন্ধ হয়ে গেল লুকার। প্রচণ্ড শক্তিতে গা ঝাড়া দিতে চাইল সে, কিন্তু নিমেষে বেগুনী হয়ে গেছে মুখের রঙ, গায়ের জোর সব উবে গেছে।
গোটা ব্যাপারটা হাস্যকর, অবিশ্বাস্য-যার গায়ের শক্তি কিংবদন্তীকেও হার। মানায়, মাত্র তিন সেকেণ্ডে ফুরিয়ে গেল তার সবটুকু-তেজ। লুকার সামনে আর পাশে আরও হাস্যকরভাবে দাঁড়িয়ে আছে ব্রুনো আর সলোযো। করার কিছুই নেই দেখতে পেয়ে কেমন যেন অপ্রতিভ, বোকা হয়ে হয়ে গেছে দুজনেই।
লুকার পিছনে দাঁড়িয়ে লোকটা গায়ের জোরে আরও এটে দিচ্ছে ফাঁসটাকে। ভাঁজ হয়ে যাচ্ছে লুকার পা দুটো। চেহারা বীভৎস দেখাচ্ছে। ঠোঁট ফাঁক হয়ে গেছে, দুপাটি দাঁতই মাড়িসহ দেখা যাচ্ছে, কোর্টর ছেড়ে এতটা বেরিয়ে এসেছে চোখের মণি দুটো যে টুপ-টুপ করে খসে পড়ে যেতে পারে বলে মনে হচ্ছে। গলার রগগুলো ফুলে উঠেছে, ত্বকের নিচে যেন লম্বা লম্বা কৃমি শুয়ে আছে।
শরীরটা মেঝেতে পড়ে গেল লুকার। মেঝেতে হাঁটু গেড়ে লোকটাও সাথে সাথে বসে পড়ল। অত্যন্ত মগ্ন ভঙ্গিতে যত্নের সাথে ফাসটাকে আরও এঁটে দিচ্ছে। সে লুকার গলায়, যেন এখনও এ-কাজের গুরুত্ব আছে। সশংস দৃষ্টিতে তার কাজ দেখছে সলোযো আর ব্রুনো। লুকার গলার মাংসে সেঁধিয়ে গিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল রেশমী দড়িটা। লুকা অবশ্য আগেই মারা গেছে।
এই লাশ কোনভাবেই কারও খুঁজে পাওয়া চলবে না, গুরু গম্ভীর ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে বলল সনোযযা। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এটা। ও মারা গেছে জানাজানি হয়ে গেলে সব মাটি হয়ে যাবে, আমাদের কোন আশাই থাকবে না আর।
কাকের চেয়েও ধূর্ত ও সতর্ক এই তুর্কী লোকটা। লুকার অভিনয় মন্দ হয়নি, কিন্তু আসল সত্য ঠিকই বুঝে নিতে পেরেছে সলোযো।
ডন কর্লিয়নিই তার একটা স্তম্ভকে বিশেষ নির্দেশ দিয়ে শত্রু পক্ষের সাথে যোগাযোগ করতে বলেছিলেন। তার হুকুম পেয়েই মূকা বাসি, এ-পথে পা বাড়িয়েছিল।
স্তম্ভটা ধূলিসাৎ করে নিষ্ঠুর এক টুকরো হাসি ফুটে উঠল তুর্কীর ঠোঁটে।
এইবার! এইবার জমবে খেলা!
২.১ মন ভাল নেই মাইকেল কর্লিয়নির
দ্বিতীয় পর্ব
০১.
মন ভাল নেই মাইকেল কর্লিয়নির। বুঝতে পারছে, ইচ্ছার বিরুদ্ধে পারিবারিক ব্যবসায় জড়িয়ে ফেলা হচ্ছে ওকে। এই যে ওকে দিয়ে টেলিফোন ধরাচ্ছে সনি, এও একটা ষড়যন্ত্র বলে মনে হচ্ছে ওর। পারিবারিক শলা-পরামর্শের মাঝখানে যেভাবে টেনে নেয়া হয়েছে ওকে, সাংঘাতিক অস্বস্তিবোধ করছে ও, যেন খুন-খারাবির মত অন্যায় আর গোপন কাজ দিয়েও সম্পূর্ণ বিশ্বাস করা যায় ওকে।
এখন, কে-র সাথে দেখা করতে শহরে যাবার সময়, তাকে সব কথা খোলসা করে বলা হয়নি ভেবে নিজেকে অপরাধী লাগছে মাইকেলের। পরিবারের কথা কিছু কিছু তাকে বলেছে বটে, কিন্তু সেসব ঠাট্টার সুরে, রঙ চড়িয়ে এমনভাবে বলেছে যে বাস্তবের চেয়ে ছায়াছবির অতি-নাটুকে কাহিনীর মত গুনতে লাগে। অথচ এখন? এখন ওর বাবা বুলেট খেয়ে রাস্তায় হুমড়ি খেয়ে পড়েছেন, আর ওর বড় ভাই প্রতিশোধ নেবার জন্যে কাকে কাকে খুন করবে তার লম্বা তালিকা তৈরি করছে। সহজ সরল সার সত্য তো এই, অথচ এভাবে কথাণুলো বলা যাবে না কে-কে, অনেক কারণেই তা সম্ভব নয়। তাই আগেই তাকে আশ্বাস দিয়ে বলে রেখেছে যে ওর বাবার গুলি খাওয়াটা বেফ আকস্মিক একটা দুর্ঘটনা, সর্ব গোলমাল এর মধ্যে মিটেও গেছে। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, এই তো সবে শুরু।
সনি আর টম চিনতে পারছে না সলোয়যাকে, তাকে ওরা এখনও ছোট করে দেখছে। বিপদ দেখতে পাবার মত বুদ্ধি সনির নেই তা নয়, কিন্তু সলোযো এরপর কি চাল দেবে তা সে দূরদৃষ্টি দিয়ে আঁচ করতে পারছে না।
আচ্ছা, তুর্কি ব্যাটার মতলবটা কি? ভাবতে চেষ্টা করছে মাইকেল। সাহস, বুদ্ধি, শক্তি–এসব যথেষ্ট পরিমাণে আছে সলোযোর, সন্দেহ নেই। তার তরফ থেকে আচমকা হামলা আসার সম্ভাবনা পুরোমাত্রায় রয়েছে। কিন্তু সনি, টম, আর টেসিওর ধারণা অন্য রকম, ওরা মনে করে অবস্থাটাকে সামাল দেয়া গেছে। মনে মনে একটা কথা স্বীকার করল মাইক, তার চেয়ে ওদের অভিজ্ঞতার ঝুলি অনেক বেশি ভারি। আপন মনে হাসছে সে, ভাবছে, এই যুদ্ধে সাধারণ নাগরিক বলতে একমাত্র তাকেই বোঝায়। এ-যুদ্ধে যোগ দিতে তাকে রাজি করতে হলে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে, যে-সব পদক সে পেয়েছে তার চেয়েও অনেক বেশি ভাল কিছু দেবার লোভ দেখাতে হবে তাকে।
চিন্তাটা মনে আসতেই, বাবার জন্যে আরও কেন দুঃখ বোধ করছে না ভেবে আবার নিজেকে অপরাধী বলে মনে হতে লাগল মাইকেলের। গোলাগুলিতে ওর বাবার শরীর ঝাঁঝরা হয়ে গেছে, অথচ কি এক আশ্চর্য উপায়ে সবার আগে সেই বুঝতে পেরে গেছে টমের সেই কথার মানে যে গোটা ব্যাপারটার মধ্যে ব্যক্তিগত কিছু নেই, এ হলো ব্যবসার কথা। এতদিন যে ক্ষমতা ব্যবহার করেছেন বাবা, সবার কাছ থেকে যে সম্মান আদায় করেছেন, এখন তার মাসুল দিতে হচ্ছে।
