তালিকাটা নিল হেগেন। পড়তে গিয়ে ভুরু কুঁচকে উঠল তার। তারপর মুখ তুলে বলল, ফর গডস সেক, সনি! ব্যাপারটাকে তুমি ব্যক্তিগতভাবে নিচ্ছ নাকি? ডন কিভাবে নিতেন, ভেবে দেখেছ? যাই ঘটে গিয়ে থাকুক, আক্রোশে অন্ধ হয়ে যাওয়া আমাদের উচিত নয়। মষ্টের গোড়া একজন, সলোযো। ওকে সরিয়ে ফেললেই যে যার খোপে খাপে খাপে বসে যাবে। টাটাগ্লিয়াদের ঘাটাবার দরকারটা কি?
সনি শুনল। তার মুখ দেখে কিছুই বোঝা গেল না। একে একে দুই ক্যাপোরেজিমির দিকে তাকালসে।
কাঁধ ঝাঁকাল টেসিও। জটিল পরিস্থিতি, গম্ভীর হয়ে বলল সে।
সনি এবার ক্লেমেঞ্জার দিকে তাকাল। কিন্তু ক্লেমেঞ্জা কোন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকল। তাকে উদ্দেশ্য করে সনি বলল, আর সব ব্যাপার পরে আলোচনা করা যাবে। একটা কাজ এক্ষুণি সারা যায়। পলিকে আমাদের দরকার হবে না আর। ওর নামটাই তালিকার মাথায় রাখো।
মাথা ঝাঁকিয়ে বিশালদেহী ক্লেমেঞ্জা সমর্থন করল সনিকে।
লুকার এই অন্তর্ধান আমার ভাল ঠেকছে না, বলল হেগেন। ওর ব্যাপারে সলোযোকে ঘাবড়াতে না দেখে ভাবছি, লুকা টাকা গিলেছে নাকি?
হয়তো কোথাও মেয়েমানুষ নিয়ে ফুর্তি করছে, বলল সনি।
অসম্ভব। মেয়েমানুষ নিয়ে কখনও বাইরে রাত কাটায় না সে। মাইক, উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত একটু পর পর ফোন করো ওক।
তখুনি রিসিভার তুলে ডায়াল করতে শুরু করল মাইকেল। কিন্তু অপরপ্রান্তে বেল বাজলেও কেউ রিসিভার তুলছে না। হেগেনের দিকে তাকাল মাইক। এদিক ওদিক মাথা নেড়ে রিসিভার নামিয়ে রাখল।
হঠাৎ অসহিষ্ণু কণ্ঠে সনি বলল, দুত্তোরি ছাই, এভাবে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকব নাকি! টম, তুমি কনসিলিয়রি, পরামর্শ দাও। বলো কি করা উচিত আমাদের?
হুইস্কির বোতলটা ধীরেসুস্থে তুলে নিল হেগেন। গ্লাসে খানিকটা টেলে নিয়ে এক চুমুকে সবটুকু গিলে নিয়ে বলল, সলোযোর সাথে আলোচনা চালিয়ে যাব। দরকার মনে করলে আপসও করে ফেলব। ডন সুস্থ হয়ে বাড়িতে না ফেরা পর্যন্ত এই ব্যবস্থা। তারপর তিনি যা ভাল বুঝবেন আমরা তাই করব। তিনি যা করবেন তাতে বাকি সবগুলো পরিবারের সমর্থন থাকবে। এটুকু আমি জানি।
রাগে মুখটা লাল হয়ে উঠল সনির। সলোযোকে সামলাতে পারব না, আমার সৃম্পর্কে এই তোমার ধারণা?
না, সনির চোখে চোখ রেখে বলল হেগেন। কর্লিয়নিদের সমস্ত ক্ষমতা এখন তোমার হাতে, এবং সে ক্ষমতা কী ভয়ঙ্কর, কতদূর তার বিস্তার, আমার চেয়ে ভালভাবে তা আর কে জানে? ওরকম একশো সলোযোকে গর্ত থেকে বের করে নিয়ে এসে গায়েব করে দেবার ক্ষমতা তোমার আছে। ক্লেমেঞ্জা, টেসিও-এক একজন এক কথায় হাজার লোক জড়ো করে ফেলতে পারবে। কিন্তু আমার বিশ্বাস, সামগ্রিক সংগ্রাম ডন চাইবেন না। আমিও চাই না। যুদ্ধের পর দেখা যাবে গোটা পূর্ব উপকূল ধ্বংসের স্তূপ হয়ে গেছে। সবগুলো পরিবার আমাদেরকে দায়ী করবে। অসংখ্য শত্রু তৈরি করব আমরা। তোমার বাবা কখনোই যা চান না।
বাবা যদি নাই বাঁচেন, তখন কি, পরামর্শ দেবে, কনসিলিয়রি?
সনির কণ্ঠস্বরের কাঠিন্য অনুভব করে কয়েক সেকেণ্ড চুপ করে থাকল হেগেন। তারপর কণ্ঠে আগের চেয়ে দৃঢ়তা এনে বলল, সলোযোর সাথে আপোস করো, এই পরামর্শ তখনও দেব আমি। তুমি আমার পরামর্শ শুনবে না, একথা জেনেও। একটু থেমে হেগেন আবার বলল, হিসাব করলে দেখা যাবে কর্লিয়নিদের মোট ক্ষমতার অর্ধেক ধরা হয় ডনের রাজনৈতিক যোগাযোগ আর তার ব্যক্তিগত প্রতিপত্তিকে। ডন মারা গেলে ক্ষমতার এই অংশ থেকে তুমি বঞ্চিত হবে। তখন কর্লিয়নিদেরকে সমর্থন করার কোন কারণ থাকবে না, কারও, সুতরাং সবগুলো পরিবারের সমর্থন পাবে সলোযো আর টাটাগ্লিয়ারা, কারণ দীর্ঘ, রক্তক্ষয়ী, সর্বনাশা যুদ্ধের সূচনা হোক তা কেউই চায় না। ডন যদি না বাঁচেন, আপোস করা ছাড়া টিকে থাকার উপায় নেই। আগে টিকে থাকার প্রশ্ন। দুর্বল ভিৎ মজবুত হোক, তখন প্রতিশোধের কথা ভাবা যাবে।
তুমি তো ব্যাপারটাকে হালকা করে দেখবেই, উত্তেজনায় কাঁপছে সনি। গুলি তো আর ওরা তোমার বাবাকে করেনি!
শিরদাঁড়া খাড়া হয়ে গেল হেগেনের। উত্তর দিতে এক সেকেণ্ডও দেরি করল না সে। কথার ভঙ্গিতে, চোখে মুখে আশ্চর্য একটা গর্ব ফুটে উঠল তার। ভুল করছ, সনি। তোমরা যেমন তাঁর সুপুত্র, তেমনি আমিও তার সুপুত্র। তার কাছে তোমরা যতটুকু ঋণী, তারচেয়ে অনেক বেশি ঋণী আমি। তোমরা যতটুকু কৃতজ্ঞ তার চেয়ে অনেক বেশি কৃতজ্ঞ আমি। তোমরা তাকে যতটুকু শ্রদ্ধা করো তার চেয়ে ঢের বেশি শ্রদ্ধা করি আমি। একথা ঠিক, এই ভয়ঙ্কর বিপদে তোমার মত দিশেহারা হইনি আমি, তার কারণ ডনের কাছ থেকেই শিখেছি বিপদের সময় মাথা ঠাণ্ডা রাখা সবচেয়ে বেশি জরুরী। তোমাকে যা বলছি সব ব্যবসা-বুদ্ধির কথা। ব্যক্তিগতভাবে আমার ইচ্ছা করছে সব শালাকে নিজের হাতে খুন করি।
শেষের দিকে হেগেনের কর আবেগরুদ্ধ হয়ে পড়তে লজ্জা পেল সনি। হেগেন থামতেই তাড়াতাড়ি বলে উঠল সে। কী যন্ত্রণা, আমি কি সত্যি সত্যি তাই বলতে চাইছি! বলতে আসলে তাই চেয়েছে সনি। তার ধারণা, রক্তের সম্পর্কের সাথে আর কোন সম্পর্কের তুলনা চলে না।
একটা অস্বস্তিকর নীরবতা জমাট বাধছে। অস্বস্তি বোধ করছে সবাই।
বড় একটা নিঃশ্বাস ছেড়ে নড়েচড়ে বসল সনি। শান্তভাবে বলল, ঠিক আছে, তাই হোক। প্রতিশোধ নেবার কোন চেষ্টা আমরা করব না। বাবার নির্দেশ না পাওয়া পর্যন্ত। মুখ তুলে হেগেনের দিকে তাকাল সে। টম, আমি চাই উঠান ছেড়ে বাইরে বেরুবে না তুমি। একবার ছেড়ে দিয়েছে, দ্বিতীয়বার ছাড়ার জন্যে ধরবে না। কোনরকম ঝুঁকি নেবে না তুমি।
