ডেস্কের পিছনে রিভলভিং চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে আছে সনি। তার এক হাতে হলুদ রঙের প্যাড, আরেক হাতে পেন্সিল। টেসিওকে চেনে মাইকেল, সে ছাড়া আর কেউ নেই কামরায়। তাকে দেখেই বুঝে নিল ও বাড়ির সব লোক টেসিওর। কাগজ আর পেন্সিল তার হাতেও দেখতে পাচ্ছে মাইকেল।
চেয়ার ছেড়ে দ্রুত উঠে দাঁড়াল সনি, ডেস্ক, ঘুরে এগিয়ে এসে জড়িয়ে ধরল টেরিকে। একটুও চিন্তা কোরো না, বলল সে। একটা প্রস্তাব দিয়ে টমকে ফেরত পাঠাচ্ছে ওরা। আমাদের তৎপরতার সাথে ওর কি সম্পর্কও তো শুধু আমাদের উকিল। ওর ক্ষতি কেন করবে ওরা? •
টেরিসাকে ছেড়ে দিয়ে এবার মাইকেলকে জড়িয়ে ধরে চুমু খেলো সনি।
হতভম্ব দেখাচ্ছে মাইকেলকে। অরে, করো কি! সনিকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে হাসতে শুরু করল সে। মেরে ধরে হাড়ে দাগ বসিয়ে দিয়েছ, সেটাই তো অভ্যাস হয়ে গেছে-এখন আবার এসব কি? অল্প বয়সে মারপিট লেগেই ছিল, ওদের মধ্যে।
কাঁধ আঁকাল সনি। শোন তবে তোর খোঁজ না পেয়ে ভয়ে কলজে শুকিয়ে গিয়েছিল আমার। তোকে ওরা মেরে ফেললে বা কি, বাঁচিয়ে রাখলেই বা কি কিছু এসে যেত না আমার কিন্তু বুড়ি মাকে খবরটা সেই আমাকেই গিয়ে দিতে হত, ওখানেই আমার আপত্তি।
বাবার খবরটা কিভাবে নিল মা? জানতে চাইল মাইকেল।
এ তো আর নতুন কিছু নয়, বলল সনি। এরকম আগেও হয়েছে। তখন তুই ছোট ছিলি, তাই মনে নেই। আমি বা মা-দুজনেই স্বাভাবিকভাবে নিয়েছি ব্যাপারটাকে। একটু বিরতি নিল সে। বাবার কাছেই আছে মা। বাৰা সুস্থ হয়ে উঠবেন।
আমরাও সেখানে যেতে পারি না?
একটু গম্ভীর হলো সনি। সব না মিটলে বাড়ি থেকে বেরোনোমার পক্ষে সম্ভব নয়। শব্দ শুনে টেলিফোনের দিকে হাত বাড়াল সে।
ডেস্কের উপর থেকে হলুদ প্যাডটা তুলে কি লেখা রয়েছে দেখছে মাইকেল। একটা তালিকা, তাতে সাতজনের নাম লেখা। তালিকায় প্রথম তিনজনে সাধ্যে রয়েছে সোযো, ফিলিপ টাটাগ্লিয়া, জন টাটাগ্লিয়া। কাকে কাকে মারতে হবে তার একটা অলিকা এটা, হঠাৎ চমকে উঠে বুঝতে পারল মাইকেল।
রিসিভার নামিয়ে রাখল সনি। টেরিসা আর মাইকেলকে বলল, একটু বাইরে গিয়ে বসবে তোমরা?
মাইকেল বুঝল, টেসিওর সাথে বসে তালিকাটা এখন চূড়ান্ত করবে সনি। কাঁদছে টেরিসা, তাকে ধরে দরজা পর্যন্ত পৌঁছে দিল সনি। কামরা থেকে বেরিয়ে না গিয়ে ইতিমধ্যে একটা সোফায় গ্যাট হয়ে বসে পড়েছে মাইকেল।
দরজা বন্ধ করে দিয়ে ঘুরে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ছোট ভাইয়ের দিকে তাকাল সনি। বলল, এখানে থাকলে এমন সব কথা শুনতে হবে, যা ভাল লাগবে না তোর।
একটা সিগারেট ধরাল মাইকেল। আমিও কাজে লাগতে পারি।
অসম্ভব। এর মধ্যে তোকে জড়ালে বাবা আমাকে আস্ত রাখবেন না।
হঠাৎ সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল মাইকেল, চিৎকার করে বলল, উনি কি তোমার একার বাবা? এই বিপদে তাঁকে আমি সাহায্য করতে পারব না, এ তুমি কেমন কথা বলছ! বাইরে বেরিয়ে মানুষ খুন না করলেও কাজে লাগা যায়। আমার সাথে এমন আচরণ করছ, এখনও যেন কচি খোকা আমি। তুমি ভুলে যাচ্ছ আমি একজন যুদ্ধফেরত সৈনিক। গুলিও খেয়েছি, দুচারটে জাপানীও মেরেছি। আমার সামনে কাউকে মেরে ফেললে, কি মনে করো তুমি, ভয়ে অজ্ঞান হয়ে যাব?
দাঁত বের করে নিঃশব্দে হাসছে সনি। আরে রসো! বেয়াদবি মাত্রা ছাড়িয়ে গেলে আমাকে না আবার তোমার গায়ে হাত তুলতে হয়। ঠিক হ্যায়, শখ যখন হয়েছে, থেকেই যাও-ফোন এলে ধরো। টেসিওর দিকে ফিরল সে। বলল, যে খবরের অপেক্ষায় ছিলাম, একটু আগের ফোনে সেটা পেয়েছি।
একটু থেমে মুচকি হাসল সনি, মাইকেলের দিকে তাকিয়ে বলল, কেউ একজন নিশ্চয়ই বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। ক্লামেঞ্জা হতে পারে। পলি গাটো হতে পারে। তার আবার আজ সর্দি লেগেছে বলে বাড়ি থেকে নাকি বেরোয়নি। মাইক, খুব তো কলেজে পড়িস, বল দেখি, কে সলোযোর টাকা খেয়েছে?
ধীরে ধীরে আবার সোফায় বসল মাইকেল। ভাবছে সে। কর্লিয়নি পরিবারের একজন ক্যাপোরেজিমি ক্লামেঞ্জা। ডনের বিশ বছরের পুরানো, ঘনিষ্ঠ বন্ধু সে, ডন তাকে লক্ষপতি করে দিয়েছেন। ডন মারা গেলে তার কি লাভ? আরও টাকার লোভ? কিন্তু টাকা কম নেই তার। তবে, একথাও ঠিক যে টাকার লোভ কখনও মেটে না মানুষের। নাকি আরও ক্ষমতার মোহ? নাকি কোন অপমান বা অবহেলার প্রতিশাধ? তাকে বাদ দিয়ে হেগেনকে কনসিলিয়রি করা হয়েছে বলে? অথবা ব্যবসায়ী বুদ্ধিতে বুঝেছে শেষ পর্যন্ত জিতবে সলোযো, তাই তার পক্ষ অবলম্বন করাই বুদ্ধিমানের কাজ, তাই কি?
উহু এসব সম্ভাবনা মনে মনে বাতিল করে দিল মাইকেল। ক্লেমেঞ্জা বেঈমানী করেছে একথা বিশ্বাস করতে রাজি নয় সে। কিন্তু পরমুহর্তে বিষণ্ণ মনে ভাবল, দুনিয়ায় অসম্ভব, অবিশ্বাস্য বলে কিছু আছে কি? নেই।
আসলে ভালবাসা ওর বিচার বুদ্ধিকে ঘোলা করে তুলছে। ক্লেমেঞ্জার মৃত্যু চায় না ও। ছোটবেলায়কত উপহার এনে দিত লোকটা তাকে। কাঁধে তুলে সেই তো ওকে বেড়াতে নিয়ে যেত। উঁহু, মনস্থির করে ফেলল মাইকেল, ক্লেমেঞ্জা নয়।
পলি গাটো?
ওর সম্পর্কে সবাই আশাবাদী, সংগঠনে ওর উন্নতি হবে বলে মনে করা যায়, তবে আর সবার মত খেটেই উঠতে হবে ওকে। এখনও ধনী নয় ও। কম বয়সের অসংযত উচ্চাশা এবং খাটনি কমাবার হটকারী প্রবণতা ওর মধ্যে থাকতে পারে। সম্ভবত পলিই অপরাধী। কিন্তু পরমুহূর্তে মাইকেলের মনে পড়ে গেল স্কুলে ওরা ষষ্ঠ গ্রেডে একই ক্লাসে বসে লেখাপড়া করেছে–পলি অপরাধী বলে প্রমাণ হোক তাও সে চায় না।
