ওভারকোট পরতে ডনকে সাহায্য করল ম্যানেজার। মৃদু গলায় ধন্যবাদ জানিয়ে দরজার দিকে এগোলেন তিনি। দুই প্রস্থ সিঁড়ি ভেঙে নিচে নামলেন, তারপর বেরিয়ে এলেন রাস্তায়।
শীতের ছোট দিন, এখুনি কমে এসেছে দিনের আলো বাবাকে দেখে সিধে হয়ে দাঁড়াল ফ্রেডি, তারপর বুইকটাকে ঘুরে ওপাশের দরজা দিয়ে ড্রাইভিং সীটে উঠে বসল।
ফুটপাথ থেকে গাড়িতে উঠতে গিয়ে একটু ইতস্তত করছেন ডন কর্লিয়নি। শেষ পর্যন্ত উঠলেন না গাড়িতে। মোড়ের কাছাকাছি ফলের একটা দোকান, সেদিকে এগোচ্ছেন।
অসময়ের ফল, দেখতে বড় ভাল লাগছে ডন কর্লিয়নির। সবুজ রঙের বাক্সে সাজানো হলুদ পীচ, কমলালেবু জুলজুল করছে। এই দোকানটার দিকে পা বাড়ানো আজকাল একটা অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেছে তার। তাঁকে দেখে একেবারে লাফ দিয়ে উঠল দোকানের মালিক। হাত দিয়ে না ছুঁয়ে আঙুল তুলে ফলগুলো দেখাচ্ছেন তিনি। তার বাছাইয়ের সমালোচনা করে একবার শুধু দোকানদার দেখিয়ে দিল একটা ফলের নিচের দিকে পচন ধরেছে। কাগজের ঠোঙাটা বাঁ হাতে নিয়ে দোকানদারকে পাঁচ ডলারের একটা নোট দিলেন তিনি। কি পয়সা ফেরত নিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে যাবেন, ঠিক এই সময় রাস্তার বাঁকে হাজির হলো দুজন লোক। ওদেরকে দেখামাত্র বুঝলেন তিনি, এবার কি ঘটবে।
কালো ওভারকোট পরে আছে ওরা। কপালের উপর টেনে নামানো কালো টুপি, চেহারা যাতে চিনতে পারা না যায়। ডনকর্লিয়নি সতর্ক হয়ে উঠবেন, তা ওরা ভাবতেই পারেনি। নিমেষে বিদ্যুৎ খেলে গেল ডন কর্লিয়নির শরীরে। এমন ভারি একজন মানুষ, কিন্তু তার কি আশ্চর্য ক্ষিপ্রতা! ফলের ঠোঙা ফেলে দিয়ে ঝড়ের বেগে দৌড়াচ্ছেন গাড়ির দিকে। সেই সাথে চিৎকার করে সতর্ক করছেন ছেলেকে, ফ্রিডো! ফ্রিডো!
এতক্ষণে হুঁশ ফিরুল আততায়ীদের, সাথে সাথে পিস্তল তুলে গুলি করতে শুরু করল ওরা।
প্রথম গুলির আঘাতটা হাতুড়ির বাড়ির মত পিঠে অনুভব করলেন ডন কর্লিয়নি। কিন্তু কিছুই হলো না তার, এখনও তিনি দৌড়াচ্ছেন গাড়ির দিকে। এরপর একই সাথে দুটো গুলি বিদ্ধ করল তাকে। দুটোই লাগল নিতম্বে। ছিটকে রাস্তার একধারে পড়ে গেলেন তিনি।
রাস্তায় গড়িয়ে পড়েছে ঠোঙার ফলগুলো, সেগুলোয় পা লেগে পিছলে যাবার ভয়ে খুব সাবধানে এগিয়ে আসছে আততায়ীরা। কাছে এসে পড়েছে। ডন কৃর্লিয়নিকে এবার ওরা শেষ করার জন্যে গুলি করতে যাচ্ছে।
ডন কর্লিয়নি ছেলের নাম ধরে ডাকার পর ইতিমধ্যে মাত্র পাঁচ সেকেণ্ড পেরিয়েছে। গাড়ি থেকে নেমে ছাদের উপর দিয়ে উঁকি মেরে ব্যাপারটা কি বোঝার বা দেখার চেষ্টা করেছে সে।
কাছ থেকে আততায়ীদের হাতের পিস্তল গর্জে উঠল আবার। একটা গুলি ডনের মাংসল বাহুতে, অপরটা ডান পায়ের গোড়ালিতে লাগল। তার শরীরের পাশে রক্তের ছোট ছোট পুকুর তৈরি হচ্ছে। ইতিমধ্যে তিনি জ্ঞান হারিয়েছেন।
নার্ভাস হয়ে গাড়ি থেকে নামার সময় শোল্ডার হোলস্টার থেকে পিস্তলটা বের করেনি ফ্রেডি। খুনীরা ইচ্ছে করলে মেরে ফেলতে পারে তাকে। কিন্তু ফ্রেডির কাছে পিস্তল আছে ভেবে, এবং এমনিতেই কাজটায় দেরি হয়ে গেছে বলে ওরা আর সময় নষ্ট না করে ছুটে পালাতে শুরু করল, চোখের পলকে বাঁক নিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল। রক্তাপ্লুত বাপকে নিয়ে রাস্তায় ফ্রেডি একা।
পথিকরা সবাই এখানে সেখানে গা ঢাকা দিয়েছে, কেউ কেউ সটান শুয়ে পড়েছে রাস্তার উপর। অনেকক্ষণ ঠায় দাঁড়িয়ে রইল ফ্রেডি। লাল, রক্তের পুকুরে নিঃসাড় পড়ে থাকা বাপের দিকে বুদ্ধর মত ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে আছে সে। ইতিমধ্যে রাস্তায় লোকজনের আনাগোনা শুরু হয়ে গেছে। টলে পড়ে যাচ্ছে দেখে কেউ একজন তাকে ধরে বসিয়ে দিল ফুটপাথের কিনারায়।
ভিড় জমে গেছে রাস্তায়। তীক্ষ্ণ সাইরেনের আওয়াজ তুলে ঝড়ের বেগে ছুটে এল পুলিশের প্রথম গাড়িটা। সেটার পিছনেই ডেইলি নিউজের রেডিও কার। কারটা তখনও থামেনি, লাফ দিয়ে নেমে রক্তাক্তনকর্লিয়নির ছবি তুলছে ফটোগ্রাফার।
অ্যাম্বুলেন্স এল আরও একটু পর। ফ্রেডি কাঁদছে, এবার তার উপর নজর পড়ল ফটোগ্রাফারের। বড় সড় মুখ, পুরু ঠোঁট, বিরাট নাক, অথচ চেঁচিয়ে কাঁদছে লোকটা-দৃশ্যটা মজার বলে মনে হলো ফটোগ্রাফারের।
একের পর এক আরও কয়েকটা পুলিশের গাড়ি এসে পৌঁছুল। ফ্রেডির সামনে হাঁটু গেড়ে বসল একজন ডিটেকটিভ, জেরা করছে তাকে। হতভম্ব ফ্রেডি অবশ্য তার একটা প্রশ্নেরও উত্তর দিতে পারল না। অবস্থাটা বুঝতে পেরে নিজেই তার পকেটে হাত ঢুকিয়ে আইডেনটিটি কার্ডটা বের করে নিল ডিটেকটিভ। তারপর শিস দিয়ে কাছে ডাকল সহকারীকে।
এক মুহূর্ত পর সাদা পোশাক পরা একদল ডিটেকটিভ চারদিক থেকে ঘিরে ফেলল ফ্রেডিকে। তার শোল্ডার হোলস্টার থেকে বের করে নেয়া হলো পিস্তলটা। তারপর দাঁড় করানো হলো তাকে, নাম্বার প্লেটহীন একটা গাড়িতে ভোলা হলো, ভিড়ের মাঝখান দিয়ে ঝড়ের বেগে ছুটে চলে গেল গাড়িটা। সেটাকে অনুসরণ করল রেডিও কার।
.
ডন কর্লিয়নি গুলি খাবার আধঘণ্টার মধ্যে পর পর পাঁচটা টেলিফোন পেল সনি কর্লিয়নি। ডিটেকটিভ জন ফিলিপস ওদের টাকা খায়, সেই করল প্রথম টেলিফোন। পুলিশের প্রথম গাড়িতে চড়ে অকুস্থলে গিয়েছিল সে।
আমার গলা চিনতে পারছ? জানতে চাইল ফিলিপস।
