হোটেলের লবিতে পৌঁছে নিউজপেপার স্ট্যান্ডের দিকে কে-কে ঠেলে দিয়ে বলল মাইকেল, তুমি কাগজ কেননা, আমি চাবি আনতে যাচ্ছি।
চাবি নিয়ে ফিরতে একটু দেরি হলো মাইকেলের। অনেক লোকের ভিড় লবিতে, অধৈর্যের সাথে কে-কে খুঁজছে সে।
হাতে খবরের কাগজ নিয়ে এক ধারে দাঁড়িয়ে আছে কে, একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মাইকেলের দিকে। ওকে দেখতে পেয়েই পা চালিয়ে এগিয়ে এল মাইকেল।
কে-এর দুচোখ থেকে টপ টুপ করে দুফোঁটা পানি ঝরে পড়ল লবির মেঝেতে। মাইক! ও মাইক! ফুঁপিয়ে উঠল সে।
ছোঁ মেরে কাগজটা নিল মাইকেল, চোখের সামনে তুলেই দেখল বাবার ছবি, রাস্তার উপর খানিকটা রক্তের মাঝখানে মুখ থুবড়ে পড়ে আছেন তিনি। ছবিতে আরও দেখা যাচ্ছে, ফুটপাথ ঘেষে বসে কাঁদছে একজন লোক-মাইকেলের মেজো ভাই সে, ফ্রেডি। সাংঘাতিক একটা শীত অনুভব করছে মাইকেল-ভয় বা শোকে নয়, প্রচণ্ড আক্রোশ আর ক্রোধে। চাপা কণ্ঠে বলল ও, ঘরে চলো। কিন্তু হাত ধরে লিফটের কাছে নিয়ে যেতে হলো কে-কে। লিফটে উঠে কথা বলল না ওরা।
কামরায় ঢুকে খাটে বসল মাইকেল, কাগজটী খুলে পড়তে শুরু করল। হেডিংটা বড় বড় অক্ষরে ছাপা হয়েছে-তথাকথিত চোরাকারবারী ভিটো কলিয়নি গুলিতে আহত। কড়া পুলিশ প্রহরায় অস্ত্রোপচার। ব্যাপক রক্তক্ষয়ী গুণ্ডা-যুদ্ধের আশঙ্কা।
পায়ে জোর পাচ্ছে না মাইকেল। বাবা মারা যাননি। বাবাকে ওরা মেরে ফেলতে পারেনি, বিড়বিড় করে বলল ও। খবরটা পড়ল আরেকবার। বিকেল পাঁচটায় গুলি খেয়েছেন ডন। তারমানে, ভাবছে মাইকেল, কে-এর সাথে সে যখন, প্রেম করছিল, ডিনার খাচ্ছিল, নাটক উপভোগ করছিল বাবা তখন গুলি খেয়ে মৃত্যুর সাথে লড়াই করছিলেন। সাংঘাতিক অপরাধী মনে হলো নিজেকে তার।
আমরা হাসপাতালে যাব? জানতে চাইল কে।
আগে বাড়িতে ফোন করা দরকার, বলল মাইকেল। বাবা বেঁচে গেছেন, শত্রুরা এখন বেপরোয়া হয়ে উঠবে। বুঝতে পারছি না কি চাল দেরে এখন ওরা।
বাড়ির দুটো টেলিফোনই এনগেজড, লাইন পাবার জন্যে বিশ মিনিট অপেক্ষা করতে হলো মাইকেলকে। হ্যাঁ, বলুন,শেষ পর্যন্ত সনির গলা পেল সে।
সনি, আমি মাইকেল।
বিরাট একটা হাঁফ ছাড়ল অপর প্রান্তে সনি, বলল, ও ভাই, বাঁচালি! তোর জন্যে কি দুশ্চিন্তাটাই না করছিলাম সবাই। কোথায় যে থাকিস! সেই গ্রামে লোক পাঠিয়েছি তোর খবর নিতে।
এসব কথার উপর কোন মন্তব্য করল না মাইকেল। কেমন আছেন বাবা? জানতে চাইল সে। বেশি লেগেছে?
বেশি মানে? সাংঘাতিক ভয়ঙ্কর লেগেছে! বলল সনি। পাঁচ পাঁচটা গুলি খেয়েছেন বাবা। তবে দুর্বল তো আর নন! গর্বের সুর ফুটে উঠল তার বলার ভঙ্গিতে। ডাক্তাররা সবাই বলছে সেরে উঠবেন। তুই কোথায় বল তো? সাংঘাতিক ব্যস্ত আমি, কথা বলতে পারছি না…।
নিউ ইয়র্কে, বলল মাইকেল, কেন, আমি আসছি একথা বলেনি টম?
কণ্ঠস্বর খাদে নামিয়ে বলল সনি,টমকে হাইজ্যাক করেছে ওরা। সেজন্যেই তোর কথা ভেবে দুশ্চিন্তা হচ্ছিল। টমের স্ত্রী এখানে রয়েছে, কিন্তু সে বা পুলিশ এ ব্যাপারে কিছুই জানে না। ওরা জানুক তা চাইছি না আমি। এ কাজ যারা করেছে তারা নিশ্চয়ই পাগল। এক্ষুণি আসছিস তো? সাবধান, মুখ খুলবি না। কিছু বলবি?
না, বলল মাইকেল। এক মুহূর্ত বিরতি নিয়ে সংক্ষেপে জানতে চাইল সে, কারা, সনি?
জানি কারা, বলল সনি। লুকা ব্রাসিকে শুধু বলার অপেক্ষা, তারপরই দোকানে ঝোলানো মাংস হয়ে যাবে। ঘুটি সব এখনও আমাদের হাতে।
ট্যাক্সি নিয়ে এক ঘণ্টার মধ্যে আসছি, বলে ফোনের রিসিভার নামিয়ে রাখল মাইকেল।
চিন্তিত দেখাচ্ছে ওকে। ভাবছে। সনির কথায় বোঝা গেল লুকা ব্রাসি খবর পায়নি এখনও। কেন?
খবরের কাগজগুলো প্রেস থেকে ছেপে বেরুবার পর তিন ঘণ্টার বেশি পেরিয়ে গেছে। খবরটা নিশ্চয়ই রেডিওর মাধ্যমে ছড়ানো হয়েছে।.তবু লুকার কানে খবর যায়নি, তা কেমন করে হয়।
ব্যাপারটা মেনে নিতে পারছে না মাইকেল। ভাবছে আর ভাবছে। কোথায় সে? কোথায় গেল লুকা ব্রাসি?
ঠিক তখন ঠিক এই প্রশ্নটা নিয়েই ভাবছে টম হেগেন।
লং বীচে সনিকর্লিয়নিও তাই ভেবে উদ্বিগ্ন হয়ে উঠছে–লুকার হলো কি?
.
সেদিন বিকেলের ঘটনা।
জলপাই তেল কোম্পানির ম্যানেজারের তৈরি করা হিসাবের কাগজ-পত্র দেখা শেষ করে ডন কর্লিয়নি যখন উঠলেন তখন পৌনে পাঁচটা বাজে। কোটটা গায়ে চড়িয়ে মেজো ছেলের মাথায় আস্তে একটা গাট্টা মারলেন তিনি, বললেন, গাড়ি নিয়ে আসতে বলো গাটোকে। বাড়ি যাবার জন্যে তৈরি হচ্ছি আমি।
বিরক্তির সাথে বলল ফ্রেডি, সেই আমাকেই গাড়ি আনতে যেতে হবে। সকালে ধ্ৰুলি জানিয়েছে শরীর খারাপ তার, ফের সর্দি লেগেছে।
একটু চিন্তিত হলেন ডন কর্লিয়নি, বললেন, এই মাসে পরপর তিনবার শরীর খারাপ করল ওর। টমকে বলবে এ-কাজের জন্যে ভাল স্বাস্থ্যের একজন লোক চাই।
সরল মনে ফ্রেডি বলল, পলি কিন্তু ভাল ছেলে। অসুখের নাম করে কঁকি, দিচ্ছে, তা নয়। নিশ্চয়ই শরীর খারাপ হচ্ছে ওর। গাড়ি নিয়ে আসা, এতে আর কষ্ট কি! অফিস কামরা থেকে বেরিয়ে গেল সে।
হেগেনের অফিসে ফোন করলেন ডন কর্লিয়নি, কিন্তু তাকে পেলেন না। ফোন করে বাড়ি থেকেও কারও সাড়া পেলেন না। বিরক্ত হয়ে জানালা দিয়ে বাইরে। তাকালেন তিনি। দালানের সামনে গাড়ি নিয়ে এসেছে ফ্রেডি দেখতে পেলেন। ফেণ্ডারে হেলান দিয়ে বুকের উপর হাত দুটো ভাজ করে অপেক্ষা করছে সে।
