টাটাগ্লিয়ারা কত পাবে?
কেমন যেন অপ্রতিভ দেখাল সলোযোকে। ওদেরকে আমি নিজের ভাগ থেকে কিছু দেব। এ-কাজে ওদের কাছ থেকে একটু সহযোগিতা পেতে হবে আমাকে।
শুধু টাকা জোগাব আর আইনকে ঠেকিয়ে রাখব, কার্যকরী দিকটা নিয়ে আমাকে মাথা ঘামাতে হবে না, বিনিময়ে পাব লাভের আধাআধি বখরা-ঠিক এই কথা বলতে চাইছেন আপনি, তাই না?
দ্রুত মাথা ঝাঁকিয়ে সায় দিল সলোযো, বলল, বিশ লক্ষ ডলার দেয়াকে শুধু টাকা জোগানোর মত ছোট করে দেখতে পারছি না আমি। আপনার কাছে ব্যাপারটা যদি তাই হয়, আপনাকে আমি আন্তরিক অভিনন্দন জানাই, ডন কর্লিয়নি।
অটল এবং শান্ত দেখাচ্ছে ডনকে। মৃদু কণ্ঠে কথা বলছেন তিনি। টাটাগ্লিয়াদের ওপর আমার শ্রদ্ধা আছে, তাই আপনার সাথে দেখা করতে রাজি হয়েছিলাম–অবশ্য আমি,শুনেছি যে আপনি নিজেও একজন সম্মানীয় ভদ্রলোক। আপনার প্রস্তাব গ্রহণ করতে পারছি না আমি-কেন, তাও বলছি। আপনার এই ব্যবসায় খুব বেশি লাভ, খুব বেশি ঝুঁকি। এর সাথে নিজেকে জড়ালে আমার অন্য সব ব্যবসা বিপন্ন হয়ে উঠতে পারে। রাজনীতিক বন্ধুদের সংখ্যা আর্মার কম নয় সত্যি, কিন্তু জুয়ার বদলে যদি ড্রাগের ব্যবসা ধরি, এদের কজন আমার সত্যিকার বন্ধু থাকবে, বলা কঠিন। ড্রাগের কারবার-বড় নোংরা ব্যাপার, সলোযো কিছু বলতে যাচ্ছে দেখে হাত তুলে তাকে বাধা দিলেন তিনি, বললেন, না, না, বাধা দেবেন না। আমি নিজের মতামত দিচ্ছি না, ওদের দৃষ্টি ভঙ্গির কথা বলতে চাইছি। কে কিভাবে রোজগার করে বেঁচে থাকে তা ভেবে সময় নষ্ট করি না আমি। আমার বক্তব্য হলো আপনার ব্যবসায় বড় বেশি ঝুঁকি, লোভে পড়ে আমার পরিবারকে বা পরিবারের জীবিকাকে বিপদের দিকে ঠেলে দিতে পারি না আমি।
চকিতে সনি কর্লিয়নি এবং টম হেগেনের দিকে একবার করে তাকাল সলোযো, এটা ছাড়া তার নৈরাশ্যের কোন লক্ষণ প্রকাশ পেল না। তাকে সমর্থন করে ওরা কেউ কিছু বলুক, এই রকম একটা সূক্ষ্ম আবেদন ফুটে উঠল তার তাকাবার ভঙ্গিতে। তারপর ডনকে জিজ্ঞেস করল, আপনি কি বিশ লাখের নিরাপত্তা সম্পর্কে সন্দেহ করছেন?
নিরুত্তাপ একটু হাসি দেখা দিল ডনের ঠোঁটে। না।
তবু আরেকবার বলল সলোযো, টাটাগ্লিয়ারা আপনার বিশ লাখেরও গ্যারান্টি দেবে।
ঠিক এই সময় অমার্জনীয় ভুল করে বসল সনি। সাগ্রহে জানতে চাইল সে, কোন সুদ না নিয়েই আমাদের পুঁজি ফেরত দেবার জামিন হবে ওরা?
চালে ভুল করে হেগেনকে একেবারে স্তম্ভিত করে দিল সনি। ক্ষোভে, ভয়ে, বিস্ময়ে নিষ্প্রাণ শুকনো কাঠ হয়ে গেল সে। দেখতে পেল, বরফের মত ঠাণ্ডা চোখে ছেলের দিকে তাকিয়ে আছেন ডন কর্লিয়নি, দৃষ্টিতে বাঘের চাপা আক্রোশ।
চোখ দুটো আরেকবার অস্বাভাবিক জ্বলজ্বল করে উঠল ভার্সিল সলোযোর, এখন সেখানে সন্তুষ্টির ভাব ঝিলিক দিচ্ছে। ডন কর্লিয়নির দুর্গম দুর্গ প্রান্তদের দেয়ালে ফাটল দেখতে পেয়েছে সে, সেটাই তাকে পুলকিত, উল্লসিত করে তুলেছে।
এরপর যখন মুখ খুললেন ডন, তার গলার সুর থেকে বিদায়ের বার্তা পেল সনোযো। তিনি বললেন, অল্পবয়েসীদের লোভ বেশি, এবং ভদ্রতাবোধ নেই বলে বড়দের কথায় নাক গলায়। ছেলেমেয়েদেরকে আবেগ দিয়ে ভালবাসা উচিত নয়, আমি যেমন ঠিক তাই করে মাথায় তুলে ফেলেছি–নিজের চোখেই তো দেখলেন সব। আমার উত্তরটাই একমাত্র উত্ত, সিনর সলোযো।
সৌজন্য প্রকাশে ত্রুটি করল না সলোযো। রীতি মোতাবেক বো করল সে, করমর্দন সারল, তারপর হেগেনের সাথে নিঃশব্দে বেরিয়ে গেল গাড়িতে ওঠার জন্যে। বিদায় দেবার সময়ও তার চেহারায় ভাবের কোন প্রকাশ দেখল নহেগেন।
হেগেন কামরায় ফিরে আসতেই ডন জানতে চাইলেন, কেমন মনে হলো লোকটাকে তোমার?
একজন সিসিলীয়, তিক্ত সুরে বলল হেগেন।
চিন্তিতভাবে মাথা ঝাঁকালেন ডন। তারপর ছেলের দিকে ফিরে তীক্ষ্ণ চাপা গলায় বললেন, কত বড় ভুল করেছ তা তুমি নিজেও জানে না। মনের কথা পরিবারের বাইরে কাউকে কখনও জানতে দিতে নেই। অল্পবয়েসী মেয়েটার সঙ্গ শ্রাগ করো, ওসব করে বিচার বুদ্ধি হারিয়ে ফেলছ তুমি। এবার একটু কাজ শেখো-এবং এই মুহূর্তে দূর হয়ে যাও আমার সামনে থেকে।
নিঃশব্দে বেরিয়ে গেল সনি।
হেগেন এক গ্লাস অ্যানিসেট দিল ডনকে। চোখ তুলে তিনি বললেন, লুকা ব্রাসিকে খবর দাও তার সাথে আমি দেখা করতে চেয়েছি।
.
তিনমাস পরের ঘটনা।
অফিসে বসে তাড়াহুড়োর মধ্যে কাজ সারছে হেগেন, ইচ্ছা স্ত্রী আর ছেলে মেয়েদের জন্যে বড়দিনের কেনাকাটা করতে বেরুবে। প্রথম বিঘ্ন সৃষ্টি করল জনি ফন্টেন, টেলিফোনের এ প্রান্ত থেকেও বোঝা গেল আনন্দে একেবারে আটখানা হয়ে আছে সে। জামাল, ছবির শুটিং শেষ। এমন একটা উপহার পাঠাচ্ছে, যা দেখে চক্ষু চড়কগাছ হয়ে যাবে ডনের। জিনিসটা কি? দেরি হয়ে যাচ্ছে বলে অধৈর্য হয়ে উঠলেও কৌতূহলটা দমন করতে পারল না হেগেন। তা বলা যাবে না! গলা ছেড়ে একচোট হো হো করে হেসে নিল জনি। বড় দিনের মজাটাই তো ওখানে?
একটু পর হেগেনের সেক্রেটারি এসে জানাল কনি কর্লিয়নি টেলিফোন করেছে। একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে হেগেন ভাবল, বিয়ের পর থেকে বড় জ্বালাতন করছে কনি। স্বামীর নামে নালিশ ছাড়া কথা নেই ওর মুখে। ঝগড়া-ঝাটি করে বাপের বাড়ি চলে আসে, কদিন কাটিয়ে তারপর আবার যায়। আর স্বামী কার্লো রিটসিও অকর্মার ধাড়ী। ভাল একটা ব্যবসায় বসিয়ে দেয়া হয়েছে তাকে, কিন্তু সেটারও সে বারোটা বাজাচ্ছে। বৌকে তো মারধোর করেই, তাছাড়া জুয়া খেলে, বেশ্যাবাড়ি যায়, বেসামাল মদ খায়। এসব কথা বাপের বাড়ির আর কাউকে নয়, শুধু হেগেনকে বলেছে কনি। আজ আবার বোধহয় নতুন কোন দুঃখের কাহিনী শোনাতে চাইছে মেয়েটা, ভাবল হেগেন।
