হেগেনের মনে হলো উনকে প্রভাবিত করতে পেরেছে সে। সন্দেহ নেই, চুরুটের দিকে তাকিয়ে থেকে তিনি বললেন, সেটাই সবচেয়ে বড় কথা। উঠে দাঁড়িয়ে জানতে চাইলেন, বেঈমানটার সাথে দেখা করার সময় ঠিক হয়েছে?
হেগেন ভাবছে, ডন হয়তো শেষ পর্যন্ত রাজি হয়ে যাবেন। বলল, সকাল দশটায় এখানে আসবেন তিনি।
আমি চাই তার সাথে কথা বলার সময় তোমরা দুজনেই আমার সাথে থাকবে, বললেন ডন। আড়মোড়া ভেঙে ছেলের দিকে ফিরলেন হঠাৎ করে। সনির একটা হাত ধরে বললেন, আজ রাতে একটু ঘুমাবার চেষ্টা করলে কেমন হয়, সান্তিনো? আয়নায় নিজের চেহারা দেখেছ? ভূতের মত লাগে না? একটু নজর দাও শরীরটার দিকে-যৌবন কারও চিরকাল থাকে নাকি?
হেগেন যে প্রশ্ন করতে সাহস পায়নি বাপের কাছ থেকে স্নেহটুকু পেয়ে সেই প্রশ্নটা করে বসল সনি, সলোযোকে কাল তুমি কি বলবে, বাবা?
মৃদু হাসলেন ডন কর্লিয়নি। বললেন, খুঁটিনাটি সব তথ্য না জেনে এখুনি বলি কিভাবে? তাছাড়া,আজ রাতে যা শিখলাম তা নিয়ে একটু ভাবতেও তো সময় দরকার। যাই বলো, আমি তো আর ঝোঁকের বশে, চলি, না। দরজার দিকে এগোলেন তিনি, তারপর হঠাৎ থেমে ঘুরে দাঁড়ালেন, কথার পিঠে কথা বলার ভঙ্গিতে হেগনকে বললেন, আচ্ছা, যুদ্ধের আগে নারী-ব্যবসা করে খরচ চালাত সলোযো, তোমার ফাইলে সে কথাটা লেখা আছে কি? টাটাগ্লিয়ারাও তো আজকাল ওই ব্যবসা ধরেছে। মনে থাকতে থাকতে এ কথাটাও লিখে রাখো।
ডনের কণ্ঠস্বরে প্রচ্ছন্ন ব্যঙ্গ লক্ষ্য করে লাল হয়ে উঠল হেগেনের মুখ। তথ্যটা প্রাসঙ্গিক নয় মনে করে উল্লেখ করেনি সে। তবে ডন শুনলে তার সিদ্ধান্ত প্রভাবিত হতে পারে, এই রকম একটা চিন্তা উদয় হয়েছিল তার মনে। মেয়ে, সেক্স ইত্যাদি বিষয়ে ডন কর্লিয়নি সাংঘাতিক গোড়া এবং রক্ষণশীল, একথা সবাই জানে।
মাঝারি আকারের লোক ভার্সিল সোযো। স্বাস্থ্যটা খুব ভাল। একবার তাকালেই মেনে নিতে হয় গায়ে জোর আছে বটে লোকটার। গায়ের রং তেমন ফর্সা নয় বলে তুরস্কের লোক বলে ভুল করে অনেকে। নাকটা খাড়া। চোখ দুটো কালো এবং দৃষ্টিতে তীক্ষ্ণতার সাথে অদ্ভুত একটা নিষ্ঠুরতার ভাব আছে।
অভ্যর্থনা জানিয়ে তাকে অফিসে নিয়ে এল সনি কর্লিয়নি। হেগেনকে নিয়ে এখানে অপেক্ষা করছেন ডন। সলোযোর দিকে তাকিয়ে হেগেন ভাবছে, লুকা ব্রাসি ছাড়া এমন সাংঘাতিক চেহারার লোক আর কখনও দেখেনি, সে। ডন যদি এখন তাকে জিজ্ঞেস করেন এই তুর্ক লোকটার সত্যিকার পৌরুষ আছে কিনা, এক কথায় জবাব দেবে সে, আছে। শক্তি এবং আত্মবিশ্বাসের এমন স্পষ্ট ছাপ আর কোন মানুষের চেহারায় দেখেনি হেগেন। সলোহোর পাশে বসা ডনকে আজ যেমন বৈশিষ্ট্যহীন, সাদামাঠা বলে মনে হচ্ছে, এর আগে কখনও তা মনে হয়নি। ডনের অভিবাদনের ভঙ্গিটাও সরল গেঁয়ো মনে হলো।
আন্তরিক ভঙ্গিতে করমর্দনের পালা চুকল। তারপর সেই কাজের কথা তুলল সলোযো। প্রথমে নিজের ড্রাগ ব্যবসা সম্পর্কে একটা ধারণা দিতে চেষ্টা করল সে। কোথাও কোন বিপদের ঝুঁকি নেই। তুরস্কের পপি ফুলের খেত থেকে বছরে এই পরিমাপ আফিম পায় সে। ফ্রান্সের কারখানায় মরফিন তৈরি হয়, সিসিলির কারখানায় হেরোইন। ওই দেশের দুই কারখানায় চোরাকারবারের মাল পৌঁছানো যতটা নিরাপদ হওয়া সম্ভব ততটা নিরাপত্তার ব্যবস্থা আছে। যুক্তরাষ্ট্রে ড্রাগ আমদানি করার জন্যে তুলনামূলক ভাবে সামান্য লোকসান দিতে হবে, তার কারণ সবাই জানে সরাসরি ঘুষ দিয়ে এফ. বি. আই-এর সহযোগিতা আদায় করা এক কথায় অসম্ভব। কিন্তু লাভের পরিমাণ এত বেশি, সে তুলনায় বিপদ নেই বললেই চলে।
সলোযো থামতে ভদ্র বিনয়ের সাথে জানতে চাইলেন ডন, তাহলে আপনি আমার কাছে এসেছেন কেন? কোন দিক থেকে আমি আপনার উদারতার যোগ্য হলাম?
প্রশ্নটাকে কিভাবে সে নিল, সলোহোর মুখ দেখে কিছুই তা বোঝা গেল না। বলল, ক্যাশ বিশ লক্ষ ডলার চাই আমার। এর সমান জরুরী কথা, সাহায্যকারী এমন একজন বন্ধু চাই আমি, সমস্ত বড় বড় জায়গায় যার ক্ষমতাবান মিত্র আছে। এই ক্যবসায় আমার প্রতিনিধিরা মাঝে মধ্যেই ধরা পড়বে, ঠেকানো যাবে না। নিশ্চয়তা দিয়ে বলছি, ধরা পড়লেও তাদের বিরুদ্ধে কোন প্রমাণ থাকবে না। সুতরাং, এমনিতেও বিচার করে তাদেরকে কঠোর শাস্তি দেয়া যাবে না। আমি এমন একজন বন্ধু চাই যিনি গ্যারান্টি দেবেন যে ধরা পড়লেও আমার প্রতিনিধিদেরকে দুএক বছরের বেশি জেল খাটতে হবে না। শুধু এই ব্যবস্থা করা গেলেই প্রতিনিধিরা। ব্যবসার গোপনীয়তা ফাঁস করে দেবে না। শাস্তির মেয়াদ বেশি হলে, বলা যায় না, তারা হয়তো মুখ খুলবে। তা যদি খোল তাদের ওপরের স্তরের লোকজনের বিপদ হতে পারে। মোটকথা, আইনের হাত থেকে কিছুটা আড়াল চাই আমি, ডন কর্লিয়নি, একটু থেমে গাম্ভীর্যের সাথে বলল সলোযো, শুনেছি, বুট-পালিশ ওয়ালাদের পকেটে যত চাঁদির টাকা আছে আপনার পকেটে তার চেয়ে কম জজসাহেব নেই।
এই প্রশংসার কোন উত্তর দেবার প্রয়োজন বোধ করলেন না ডন। জানতে চাইলেন, শতকরা কত পাব আমরা?
চোখ দুটো জ্বলজ্বল করে উঠল সলোযোর। আধাআধি- ভাগ হবে, একটু বিরতি নিল সে, তারপর মোলায়েম সুরে ফিসফিস করে বলল, ত্রিশ থেকে চল্লিশ লাখ ডলার পাবেন প্রথম বছর। এরপর বাড়তেই থাকবে।
