ডাক্তারের দেয়া মৃদু সিডেটিভ খেয়ে শরীরটাকে ঠাণ্ডা করে নিল ওলটস। দেশের মানুষের কাছে হাস্যাস্পদ হওয়া চলবে না তার, ভাবছে সে। কেউ তার ক্ষমতা আর প্রতিপত্তিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়েছে এটা জানাজানি হয়ে গেলে মুখ দেখাবে কিভাবে সে? যা হবার হয়েছে, এবার সাবধানে পা ফেলতে হবে। সামান্য একটা কারণে জেদ ধরে বসে এই লোভনীয় জীবনটার সমাপ্তি ঘটাবার কোন মানে হয় না। ভাগ্য প্রসন্ন হলে কর্লিয়নিকে নাগালের মধ্যে পাওয়া যেতে পারে একদিন।
ডাক্তার সহ উপস্থিত সবাইকে দিয়ে প্রতিজ্ঞা করিয়ে দেয়া হলো যে এ ব্যাপারে আসল সত্যটা কেউ প্রকাশ করবে না। খবরের কাগজে খবর পাঠানো হলো কঠিন রোগে আক্রান্ত হয়ে হঠাৎ মারা গেছে খার্তুম। ওলটসের নিজের জমিতে অতি গোপনীয়তার সাথে সমাধিস্থ করা হলো ঘোড়াটার দুই অংশ।
এর ছয় ঘণ্টা পর একটা টেলিফোন কল পেল জনি ফন্টেন। ছায়াছবির নির্বাহী প্রযোজক জানাল, জনি যেন শু্যটিংয়ের জন্যে তৈরি হয়ে আগামী সোমবার স্টুডিওতে হাজির হয়।
.
প্রস্তুতি সভায় হাজির থাকার জন্যে সন্ধ্যায় ডনের বাড়িতে এল হেগেন। ডনের নির্দেশে তার বড় ছেলে সনি কর্লিয়নিও বৈঠকে বসেছে। তার কিউপিড আকৃতির মস্ত ভারি মুখে ক্লান্তি আর অবসাদের ছাপ, বারবার একটা গ্লাসে চুমুক দিয়ে স্কচ হুইস্কি খাচ্ছে সে। তাই দেখে হেগেন ভাবল, এখনও নিশ্চয়ই সেই মেয়েটার সাথে ধুমসে প্রেম চালাচ্ছে সনি। আরেকটা দুশ্চিন্তার কারণ বটে।
ডি নোবিলি চুরুট টানতে টানতে আরাম কেদারায় বসলেন ডন। জানতে চাইলেন, দকারী সব জানা হয়ে গেছে আমাদের?
একটা ফাইল খুলল হেগেন। প্রয়োজনীয় সমস্ত তথ্য দুর্বোধ্য ভাষায় লেখা আছে এতে। কারও হাতে এটা পড়লে তথ্যগুলোর মর্ম উদ্ধার করা তার পক্ষে সম্ভব হবে না।
একটু কেশে গলাটা পরিষ্কার করে নিল হৈগেন। বলল, আমাদের সহযোগিতা চাওয়ার প্রস্তাব নিয়ে আসছেনসলোযো। দশ লক্ষ ডলার পজি চাইবেন উনি এবং আইন যাতে আমাদেরকে কোনভাবে বিরক্ত না করে তার নিখুঁত ব্যবস্থা করবেন। এর বিনিময়ে ব্যবসা থেকে যা লাভ হবে তার একটা অংশ পাব আমরা, কিন্তু সেটার পরিমাণ সম্পর্কে কেউ কিছু জানে না।
হেগেন লক্ষ করল সনি কর্লিয়নি তার কথা মন দিয়ে শুনছে না, নিজের চিন্তায় বিভোর হয়ে আছে সে। আবার শুরু করল হেগেন, সলোযোর জামিন হচ্ছে টাটাগ্লিয়া পরিবার। লাভের একটা অংশ তারাও হয়তো নেবে। এটা ডাগের ব্যবসা, পপি ফুলের ব্যবসা-তুরস্কে এই ফুলের চাষ হয়। ব্যবসার অন্ধিসন্ধি সব জানা আছে সলোযোর, তুরস্কের সংশ্লিষ্ট মহলের সাথে ভাল যোগাযোগও আছে। পপি ফুল তুরস্ক থেকে পাঠানো হয় সিসিলিতে, সেখানে তার কারখানা আছে, কারখানায় আফিম থেকে তৈরি করা হয় হেরোইন, কারখানায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা অত্যন্ত নিখুঁত, কোন ঝুঁকি নেই। হেরোইন বা মরফিন যাই তৈরি করা হোক, সেগুলো এদেশে নিয়ে এসে বিলি করাটাই হলো সমস্যা। তাছাড়া, পুঁজির ব্যাপারটাও রয়েছে। দশ লাখ ডলার তো আর মুখের কথা নয়।
হেগেন দেখল, ডনের চেহারায় একটু বিরূপ ভাব ফুটল। ব্যবসা সংক্রান্ত ব্যাপারে কৌশলে উট দেখানো পছন্দ করেন না তিনি।
তাড়াতাড়ি আবার প্রসঙ্গে ফিরে এল হেগেন, বলল, সলোযোকে ওরা তুর্ক। বলে ডাকে। কারণ তুরস্কে অনেক দিন ছিলেন উনি, তাছাড়া, গুজব আছে, তুর্কী স্ত্রী আর ছেলেমেয়েও নাকি আছে তাঁর। আরেকটা কারণ, ওস্তাদ একজন মারা খেলোয়াড় উনি। পুলিশের খাতায় নাম টোকা আছে তাঁর, একবার ইতালীতে, একবার এ-দেশে জেল খাটতে হয়েছে–ড্রাগ ব্যবসায়ী হিসেবে চেনে ওঁকে কর্তৃপক্ষ। এতে করে আমাদের সুবিধে হতে পারে এইটুকু যে সাক্ষী দেবার জন্যে ওঁকে কখনও ডাকা হবে না। এছাড়া, আমেরিকান স্ত্রী এবং তিনটে ছেলেমেয়ের বাপ তিনি-এদের বেঁচে থাকার জন্যে প্রয়োজনীয় টাকার অভাব হবে না এ নিশ্চয়তা পেলে যে-কোন ঝুঁকি নিতে রাজি তিনি।
চুরুটে টান দিয়ে ছেলের দিকে তাকালেন ডন। তুমি কি বলো, সনি?
বাপের অধীনে থেকে হাঁফ ধরে গেছে সনির•• স্বাধীনভাবে কিছু একটা করতে চায় সে, জানে হেগেন। উত্তরে কিছু বলবে, জানা আছে তার।
গ্লাসে লম্বা একটা চুমুক দিয়ে হুইস্কির স্বাদ নিল সনি, মুখ বিকৃত করে বলল, ওই সাদা পাউডারে বড় বেশি লাভ। তাই বিপদও বেশি। পিছনে থেকে উৎসাহ আর পুঁজি যোগান দেয়া যেতে পারে, মন্দ হয় না সেটা কিন্তু নিজেরা আমরা এ কাজে হাত দেব না। মামলা হলে বিশ বছরও ঝুলতে হতে পারে।
চুরুটে আরেকটা টান দিলেন ডন। তোমার মত কি, টম?
যা সত্য বলে মনে করছে তাই বলার জন্যে মনে মনে তৈরি হলো হেগেন। ডন যে সলোযোর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করবেন, ইতিমধ্যে তা বুঝতে পেরেছে সে। তার ধারণা, যা দৈবাৎ হয় এবার তাই হয়েছে গোটা ব্যাপারটা ভাল করে তলিয়ে দেখেননি ডন। যথেষ্ট দূরদৃষ্টির সাহায্য নিচ্ছেন না তিনি।
হেগেনকে ইতস্তুত করতে দেখে তাকে উৎসাহ দেবার জন্যে ডন বললেন, যা ভাবছ, বলেই ফেলো, টম। মনিবদের সাথে সিসিলীয় কনসিলিয়রিরাও সব সময় একমত হয় না। হেসে উঠলেন ডন, তার সাথে ওরা যোগ দিল,
আমি মনে করি প্রস্তাবটা আপনার গ্রহণ করা উচিত। এই ব্যবসাতে লাভের পরিমাণ খুব বেশি, আমরা এতে না ঢুকলে আর কেউ ঢুকে জায়গাটা দখল করে নেবে। টাটাগ্রিয়ারা এ সুযোগ ছাড়বে বলে আমি মনে করি না। প্রচুর আয় হলে আরও বেশি পুলিশের বন্ধুত্ব আর রাজনৈতিক প্রভাব কিনতে কোন অসুবিধেই হবে না ওদের। ক্ষমতার দিক থেকে আমাদেরকে টপকে যাবে ওরা। তখন হয়তো আমরা যা নিয়ে আছি তার উপর ভাগ বসাবার ফন্দি করবে। ভবিষ্যতের সেরা ব্যবসা হতে যাচ্ছে ড্রাগ ব্যবসা, এখনই এতে যদি আমরা না ঢুকি, এক সময় পিছিয়ে পড়ব! আমাদের যা আছে তাও হাতছাড়া হয়ে যাবার ভয় আছে। আজই হয়তো এসব ঘটবে না, কিন্তু দশ বছর পরের কথা ভাবছি আমি।
