অফিসে বসে ওলটসের একটা ফোন পাবে বলে আশা করছে হেগেন। যুদ্ধের ছবিটায় জনি ফন্টেনকে প্রধান ভূমিকায় নেয়া হবে, এই খবরটা দেবার জন্যে ফোন তাকে করতেই হবে।
ফোনটা হঠাৎ ঝন ঝন করে বেজে উঠল, কিন্তু হেগেন রিসিভার তুলে কানে ঠেকাতে ওলটসের নয়, আমেরিগো বনাসেরার গলা পেল।
কৃতজ্ঞতায় অভিভূত বনাসেরার কণ্ঠস্বর কাঁপছে। সে যে ডনের কাছে চিরঋণী, হেগেনের মাধ্যমে উনকে এই কথাটা জানাবার জন্যে ফোন করেছে সে। জানাল, গড ফাদার যখনই বলবেন তখনই তার জন্যে নিজের প্রাণ বিলিয়ে দিতে পারবে সে।
ডেলি নিউজ কাগজটার ভাঁজ খুলে চোখের সামনে মেলে ধরল হেগেন। ভিতরের পৃষ্ঠায় বড় একটা ফটো ছাপা হয়েছে। রাস্তার উপর মুখ থুবড়ে পড়ে আছে কেভিন মুনান আর জেরি ওয়াগনার। মানুষের শরীর বলে চেনা কঠিন, থেঁতলানো মাংসের দুটো পিণ্ড যেন। এরা মরেনি বলে রিপোর্টারও বিস্ময় প্রকাশ করেছে। তার মন্তব্য হলো, মুখ মেরামত করতে হলে প্লাস্টিক সার্জারির সাহায্য নিতে হবে, এবং দুজনকেই মাসের পর মাস থাকতে হবে হাসপাতালে।
পলি গাটো লোকটাকে খুব দক্ষ মনে হচ্ছে, ভাবল হেগেন। ওরধন্যে ভাল কিছু একটা করার কথা বলতে হবে ক্লেমেঞ্জাকে। চিন্তাটা নোট করে রা ফেস।
এরপর গভীর মনোযোগ আর দক্ষতার সাথে হিসাব কষতে শুরু ক হেগেন। ঝাড়া তিন ঘণ্টা কাজ করে ডন কর্লিয়নির জমিজমা থেকে যা আয় হয় র একটা পাকা হিসাব, জলপাই তেল আমদানি আর স্থাপত্য কোম্পানির লাভ লোকসানের হার ইত্যাদি বের করে ফেলল সে, কোন ব্যবসাই বর্তমানে বিশেষ লাভের মুখ দেখছে না, কিন্তু যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে, এবার মোটা মুনাফা আশা করা যেতে পারে।
এই সময় ফোন এল ওলটসের।
কুত্তার বাচ্চা, তোমাকে আমি জেলের ঘানি টানাব! ঘৃণায়, ক্ষোভে বিকৃত শোনাচ্ছে ওলটসের কষ্ঠর। শেষ হয়ে যেতে পারি আমি, কিন্তু তবু আমার হাত থেকে তুমি শালার রক্ষা নেই। আর ওই শালা বেজন্মা জনি, ওর আমি পুরুষাঙ্গ যদি কেটে না নিই তো কি বলেছি। সাবধানে থেকো, শালা ইতালীয় গর্ভাব!
শান্ত এবং নরম গলায় বলল হেগেন, একটু ভুল করছেন। আমি ইতালীয় নই–আধা জার্মান, আধা আইরিশ।
কয়েক মুহূর্ত অপর প্রান্ত থেকে কোন সাড়া পেল না হেগেন, তারপর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবার শব্দ পেল। মুচকি একটু হাসল সে। এত গালমন্দ করল বটে ওলটস, কিন্তু ডন সম্পর্কে একটা কটু কথা তো দূরের কথা, তার নামটা পর্যন্ত উচ্চারণ করেনি।
প্রতিভার কদর আছে, ভাবল হেগেন।
.
দশজন লোকের জায়গা হবে এতবড় একটা খাটে এক ঘুমায় ওলটস। বয়স বেশি হওয়া সত্ত্বেও তার শারীরিক উদ্যমে তেমন ভাটা পড়েনি, তবে কিশোরী মেয়ে ছাড়া আজকাল কেউ তাকে উত্তেজিত করতে পারে না। এবং সন্ধ্যার পর খানিকক্ষণের মধ্যেই সাধ এবং সাধ্য নিঃশেষ হয়ে যায় তার।
আজ বৃহস্পতিবারে কেন যেন খুব ভোরে ঘুম ভাঙল তার। চোখ মেলে পায়ের কাছে পরিচিত একটা আকৃতি দেখে ধড়মড় করে বিছানায় উঠে বসল সে। হাত বাড়িয়ে জ্বেলে দিল বেড ল্যাম্পটা। যা দেখল তাতে মুহূর্তে অসুস্থ হয়ে পড়ল সে। গলগল করে বেরিয়ে এসে পুরু দামী গালিচার উপর ছিটকে পড়ল দুর্গন্ধময় বমি।
তার প্রিয় ঘোড়া খার্তুমের কাটা মুণ্ড এক দলা জমাট বাঁধা রক্তের উপর বসানো রয়েছে। সাদা দড়ির মত দেখা যাচ্ছে স্নায়ুগুলোকে, চোখ থেকে সোনালী চকচকে ভাব অদৃশ্য হয়েছে, পচন ধরা ক্ষতবিক্ষত আপেলের মত চেহারা হয়েছে সে দুটোর। আতঙ্কে, দুঃখে, ঘৃণায় চেঁচিয়ে উঠল ওল্টস।
বাটলার এবং চাকর বাকররা যে যেখানে ছিল ছুটে এল সবাই। কর্তাকে উন্মাদের মত চেঁচামেচি করতে দেখে ঘাবড়ে গেল বাটলার, দেরি না করে ওলটসের ব্যক্তিগত চিকিৎসক এবং স্টুডিওর প্রধান সহকারীকে ফোন করুল সে। তবে এরা এসে পৌঁছবার আগেই হেগেনকে একচোট গাল দিয়ে নিজেকে দ্রুত সামলে নিয়েছে ওলটু।
ব্যাপারটা ঠাণ্ডা মাথায় ভাবতে গিয়ে বিস্ময়ে স্তম্ভিত হয়ে যাচ্ছে সে। একোন জাতের নোক যে ছোট্ট একটা অনুরোধ রক্ষা করা হয়নি বলে ছয় লাখ ডলারের বিশ্ববিখ্যাত একটা ঘোড়াকে অবলীলায় মেরে ফেলতে পারে? একটু সতর্ক করার প্রয়োজনটুকুও বোধ করল না! হত্যার ধরনের মধ্যেও তাৎপর্য রয়েছে। এই বিভৎস নিষ্ঠুরতা এমন একজন মানুষের পরিচয় প্রকাশ করছে যে নিজেই আইন, নিজেকে ছাড়া আর কাউকে, আর কিছুকে, এমন কি সৃষ্টিকর্তাকেও গ্রাহ্য করে না। ইতিমধ্যে খবর পেয়েছে ওল্টস, ওষুধ খাইয়ে অজ্ঞান করা হয়েছিল খার্তুমকে, তারপর কুড়াল দিয়ে আলাদা করা হয়েছে ওই তিনকোণা মুটাকে। তার মানে, আস্তাবলের নিরাপত্তা ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বানচাল হয়ে গেছে। ইনভেস্টিগেশন ফার্মের যারা পাহারায় ছিল তারা বলছে রাতে তারা কোন শব্দই পায়নি। এ অসম্ভব। তার মানে টাকা খেয়েছে ওরা।
প্রেসিডেন্টের সাথে খাতির রয়েছে তার। এফ. বি: আই.-এর পরিচালক তার বন্ধু–এসব জেনেও অখ্যাত একজন ইতালীয় তেল আমদানিকারক তাকে খুন করতে যাচ্ছে–নিশ্চয়ই তাই, ব্যাপারটা উপলব্ধি করে শিউরে উঠল ওলটস। অবিশ্বাস্য ব্যাপার, কিন্তু দিবালোকের মত বাস্তব। কী আশ্চর্য, পরিস্থিতি এরকম হয়ে উঠলে পৃথিবীটা দাঁড়াবে কোথায়, খারাপের আর বাকি থাকল কি!
