স্তম্ভিত হয়ে গেল হেগেন। সমাজে সুপ্রতিষ্ঠিত একজন লোক মেয়েমানুষের মত তুচ্ছ একটা ব্যাপারে কিভাবে নিজের স্বার্থবুদ্ধিকে জলাঞ্জলি দিতে পারে তা সে ভেবেই পেল না। হেগেন তথা কর্লিয়নিদের জগতে মেয়েমানুষ মানেই তা ব্যক্তিগত ব্যাপার, বৈষয়িক বিষয়ের সাথে তার সম্পর্ক নেই। তবে বিয়ে, অথবা পারিবারিক সম্মানের কথা আলাদা।
শেষ একটা চেষ্টা করে দেখছে হেগেন। বলল, আমি শুধু বলতে চাই, অতীতে কি ঘটেছে না ঘটেছে সে কথা মনে রেখে ঝুঁকি নেয়া কি ঠিক হচ্ছে আপনার? আমার মালিক ছোট্ট একটা অনুরোধ করেছেন আপনার কাছে, তার কাছে এটার অনেক মূল্য, এই আসল কথাটাই আপনি বুঝতে পারছেন না।
সোফা ছেড়ে ঝট করে উঠে দাঁড়াল ওলটস। কাকে ভয় দেখাচ্ছ তোমরা! এক্ষুণি যদি ফোন করি আজ রাতটা হাজতে কাটাতে হবে তোমাকে, তা জানো? খুনে গুণ্ডাদের আমি ভয় পাই না, তারাই আমাকে ভয় করে চলে। শোনো, দরকার হলে হোয়াইট হাউসে যাব আমি, এবং এমন ব্যবস্থা করব যে তোমার ওই রংবাজ গুণ্ডা সর্দার টেরও পাবে না কোত্থেকে কে তাকে ঘায়েল করে গৈল।
এমন নির্বোধ নোক তো দেখিনি, ভাবছে হেগেন। এত বড় একটা আহাম্মক। দুনিয়ার সবচেয়ে বড় স্টুডিওর মালিক, প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা হলো কিভাবে? কোন সন্দেহ নেই এই ব্যবসাতে নেমে পড়া উচিত ডনের।
সময়টা বড় আনন্দে কাটল, সেজন্যে আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ, বলল হেগেন। রাতটা আর এখানে কাটাব না। ঠাণ্ডা ভাবে একটু হাসল সে। মি. কর্লিয়নি আবার অবিলম্বে দুঃসংবাদ শুনতে ভালবাসেন।
বাইরে বেরিয়ে এসে হেগেন দেখল, সেই বারো বছরের অপূর্ব সুন্দরী মেয়েটি আর তার মা লম্বা একটা লিমুসিন গাড়িতে চড়ছে। এদেরকেই ওলটসের অফিসে আজ সকালে দেখেছিল সে। চেহারা এরই মধ্যে আশ্চর্য-বিকৃত হয়ে গেছে মেয়েটার, গোলাপী মাংসের একটা পিণ্ডের মত দেখাচ্ছে মুখটাকে। লম্বা পা দুটো ঠিকমত ফেলতে পারছে না সে, একটু খুঁড়িয়ে হাঁটছে। মা কানে কানে কি যেন বলল, সাথে সাথে ঘাড় ফিরিয়ে হেগেনের দিকে তাকাল মেয়েটা। তার চোখে উকট একটা উল্লাস লক্ষ করল হেগেন। মাকে অনুসরণ করে মেয়েটা এবার উঠে পড়ল গাড়িতে।
এতক্ষণে বুঝতে পারলহেগেন, প্লেনে করে কেন তাকে নিয়ে আসা হয়নি। এই মা আর মেয়েকে সাথে করে নিয়ে এসেছিল ওলটস। ডিনার খাবার আগে এই কচি মেয়েটার সাথে ফুর্তি করার দরকার ছিল তার। হায় কপাল, ভাবল হেগেন, অথচ এই নরকেই বাস করতে চাইছে জনি!
.
কাজে তাড়াহুড়ো পছন্দ করে না পলি গাটো। আজকের এই কাজটা একটা সহজ কাজ হলেও, কেউ যদি কোথাও একটু ভুল করে ফেলে, তার পরিণতি মারাত্মক হতে পারে। তাই আজ সে আরও সতর্ক হয়ে আছে। বারে বসে বিয়ারের গ্লাসে চুমুক দিচ্ছে, আর ফাঁক বুঝে আড়চোখে দেখে নিচ্ছে পাজি দুই ছোকরাকে। মেয়েমানুষ দুটোকে নিয়ে তারা একেবারে মেতে উঠেছে।
ছেলে দুটো সম্পর্কে সব জানা আছে পলির। দুজনেরই বছর কুড়ি বয়স, নাম জেরি ওয়াগনার আর কেভিন মুনান। দুজনই স্বাস্থ্যবান, লম্বা, মাথায় বাদামী রঙের চুল। ছুটির মধ্যে কলেজ থেকে বাড়ি ফিরে এসেছে, কদিন পর চলে যাবে আবার। হারামীর হাড় শালারা, ভাবছে পলি, গভীর রাত পর্যন্ত বারে বসে মদ গেলা আর বেশ্যাগুলোর পিছু লাগা, এই ওদের কাজ।
খিলখিল করে হেসে উঠল একটা মেয়ে। পলি শুনতে পাচ্ছে তার কথা। রক্ষে করো, জেরি! তোমার সাথে এক গাড়িতে যাব আমি? তারপর তুমি আমাকে ওই বেচারীর মত হাসপাতালে পাঠিয়ে দাও!
আমেরিগো বনাসেরার কথা ভেবে দুঃখ হলো পলির। মেয়ের সর্বনাশ দেখতে হয় যাকে, তার মত অভাগা আর কে! গ্লাসে শেষ চুমুক দিয়ে উঠে পড়ল সে, বার থেকে বেরিয়ে এল অন্ধকার রাস্তায়।
দোকান পাট সব বন্ধ হয়ে গেছে, এলাকার আর একটা মাত্র বারে আলো জ্বলতে দেখছে পলি। প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা আগেই করে রেখেছে ক্লেমেঞ্জা। রেডিওর ডাক না পেলে এদিকে ভুলেও আসবে না পুলিশ। শ্ৰেভলে সিডান গাড়িটার দরজায় হেলান দিল পলি। পিছনের সীটে প্রকাণ্ডদেহী দুজন লোক বসে আছে, কিন্তু অন্ধকারে দেখা যাচ্ছে না তাদেরকে। নিচু গলায় তাদেরকে বলল পলি, বেরুলেই শুরু করে দেবে।
খানিক পর বার থেকে বেরিয়ে এল ওরা। মেয়ে দুটো যাচ্ছে তাই বলে বিদ্রূপ করেছে ওদেরকে, তাই মেজাজ খুব খারাপ।
গাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছে ইতিমধ্যে বিশালদেহীরা।
গাড়ির ফোরে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে পলি, ছোকরাদেরকে উদ্দেশ্য করে বাঁকা হাসল সে, বলল, কি হে, মেয়েরা বুঝি পাত্তা দিল না?
ঘাড় ফিরিয়ে তাকাল ওরা। বেঁটে, বেজিমুখো পলির চালিয়াতি ভঙ্গি দেখে মাথায় রক্ত চড়ে গেল ওদের। নিমেষে পলির উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল ওরা। কিন্তু সেই মুহূর্তে ওদের গায়ের উপর এসে পড়ল বিশালদেহীরা। দুজনের হাত ধরে ফেলল তারা, টেনে সরিয়ে আনল ছোকরাদেরকে পলির কাছ থেকে।
এই সুযোগের অপেক্ষাতেই ছিল পলি। দ্রুত লোহার কাটা বসানো নাকুল ডাস্টার হাতে পরে নিল সে, চরকির মত আধপাক ঘুরেই ওয়াগনার ছোকরার নাকে প্রচণ্ড একটা আঘাত করল সে। প্রকাণ্ডদেহীদের একজন ওয়াগনারকে এবার দুহাত দিয়ে ধরে তুলে ফেলল শূন্যে! নাগালের মধ্যে তার কুঁচকিটা পেয়ে হাত ঘুরিয়ে একটা আপার কাট চালান এবার পলি। নিঃশব্দে দড়ির মত ঝুলে পড়ল ওয়াগনার। ব্যাপারটা শুরু হয়েছে মাত্র ছয় সেকেণ্ড আগে।
