ডনের শিক্ষার কথা মনে রেখে হেগেন তাই আবার নতুন করে শুরু করল, আমার কার্ড তো আপনি দেখেছেন, আমি একজন উকিল, তাই না? নিজেকে বিপন্ন করার মত কাজ আমি কিভাবে করি, বলুন? আচ্ছা, আপনাকে ভয় দেখাবার মত একটা কথাও কি বলেছি আমি? আমরা আপনার সব শর্ত মেনে নেব, আপনার সব, কথায় আমরা রাজি, এতসবের বিনিময়ে ছোট একটা অনুরোধ যদি রাখেন, আমরা ধন্য হয়ে যাব। বিশ্বাস করুন, তাতে আপনারও মস্ত লাভ। সামান্য একটা দানের বিনিময়ে আপনার যাতে প্রচুর লাভ হয় সেজন্যে ইতিমধ্যেই অনেকগুলো লোভনীয় প্রস্তাব দেয়া হয়েছে আপনাকে। একটু বিরতি নিয়ে সবিনয়ে হাসল হেগেন, তারপর আবার বলল, জনিকে আপনি নিজেই বলেছেন ওই ভূমিকায় তাকেই সবচেয়ে ভাল মানায়। আপনি যদি মনে করতেন, জনিকে মানাবে না, তাহলে অনুরোধটা করাই ইত না আপনাকে পুঁজির অভাব থাকলে, তাও আমার মক্কেল যোগান দিতে রাজি আছেন। ওলটস কিছু বলতে যাচ্ছে দেখে হাত তুলে তাকে থামাল, বলল, সব কথা আমাকে খুলে বলতে দিন, প্লীজ। ধরে নিচ্ছি, একবার যখন না বলেছেন, এরপর প্রতিবারই না বলবেন আপনি, এটাই আপনার চরিত্রের বৈশিষ্ট্য। এ কথা তো ঠিক, আপনার ওপর জোর খাটাবার অধিকার কারও নেই, সে চেষ্টা কেউ করছেও না মি. হতার যে আপনার ঘনিষ্ঠ একজন বন্ধু, তাও আমরা জানি। এবং বিশ্বাস করুন, এই সম্পর্কটার জন্যে আমার মনিব শ্রদ্ধাও করেন আপনাকে। বরাবর তিনি এ ধরনের সম্পর্কের মূল্য দিয়ে থাকেন।
লাল পালকের ঝুঁটিওয়ালা কলম দিয়ে কাগজে হিজিবিজি কাটছে ওলটস। টাকার কথা শুনে চোখের কোণে ঝিলিক দিয়ে উঠল কৌতূহল। থেমে গেছে হাতটা। বলল, ছবিটা করতে কত টাকা লাগবে জানো? পঞ্চাশ লক্ষ ডলার।
আঁতকে ওঠার কৃত্রিম ভান করল হেগেন। তারপর খুব নরম সুরে বলল, আমার মনিবের অনেক জাদরেল বন্ধু আছে, তারা ওঁর কথায় মরে ওর কথায় বাঁচে।
এই প্রথম গোটা ব্যাপারটা গুরুত্বের সাথে নিল ওলটস। হেগেনের কার্ডটা আরেকবার ভাল করে দেখল সে। না, এর আগে তোমার নামই শুনিনি আমি। নিউ ইয়র্কে যারা নাম করা উকিল তাদের সবাইকে চিনি আমি। তুমি কোন চুলো থেকে এসেছ শুনি?
নিউ ইয়র্কের অভিজাত আইন-উপদেষ্টা সংস্থাগুলোর একটা আমার, মৃদু গলায় বলল হেগেন। উঠি তাহলে।
করমর্দন সেরে দরজার দিকে রওনা দিল হেগেন, দুপা এগিয়ে ঘুরে দাঁড়াল আবার, বলল, এমন সব লোকের সাথে চলাফেরা করেন আপনি যারা নিজেদেরকে অনেক বড় করে জাহির করে। আমার বেলা কিন্তু তার উল্টোটি ঘটছে। ইচ্ছা করলেই খোঁজ নিয়ে এ ব্যাপারে আপনি সব জানতে পারবেন। মত-যদি বদলায়, হোটেলে ফোন করতে ভুলবেন না। একটু থেমে আবার বলল, শুনে হয়তো আপনার মনে হবে পবিত্র একটা ব্যাপার নিয়ে ঠাট্টা করছি, কিন্তু কথাটার মধ্যে এতটুকু অতিরঞ্জন নেই–আমি যার প্রতিনিধিত্ব করছি তিনি এমন অনেক কাজও করে দিতে পারেন যা খোদ মি. হুভারেরও সাধ্যের অতীত।
ওলটসের চোখ দুটো ছোট হয়ে আসছে দেখে হেগেন ভাবল, এতক্ষণে বোধহয় টনক নড়ছে। যথাসম্ভব তোষামোদের সুরে বলল, আরে, বলতে ভুলেই গেছি…আমার মনিব বলে পাঠিয়েছেন, আপনার তৈরি ছবিগুলো সব সত্যি অপূর্ব, প্রশংসা না করে পারা যায় না। এসব ভাল কাজ, আশা করি চালিয়ে যেতে পারবেন। দেশে এসবের দরকার আছে।
সেদিনই সন্ধ্যায় ওলটসের সেক্রেটারি ফোন করল হেগেনকে জানাল, এক ঘণ্টা পর একটা গাড়ি তুলে নেবে হেগেনকে, শহরের বাইরে ওলটসের বাড়িতে তার জন্যে ডিনারের আয়োজন করা হয়েছে। মাত্র ঘণ্টা তিনেকের পথ, পানীয় বা নাস্তার জন্যে বার আছে গাড়িতেই, সুতরাং কোন অসুবিধে হবে না।
কিন্তু হেগেন ভাবছে অন্য কথা। নিজের প্লেনে আসা যাওয়া করে ওলটস, আজ প্লেন বাদ দিয়ে গাড়ি কেন?
হেগেনের চিন্তায় বাধা দিয়ে সেক্রেটারি আবার বলল, টুকটাক দরকারী জিনিস, সাথে নিতে পারেন, রাতটা ইচ্ছে করলে ওখানে কাটাতে পারবেন অনায়াসে, কাল সকালে মি. ওলটস আপনাকে এয়ারপোের্ট পৌঁছে দেবার ব্যবস্থা করবেন।
ঠিক আছে, বলল বটে হেগেন, কিন্তু সেক্রেটারির শেষ কথাটায় ভাবনার আরেকটা খোরাক পেয়ে গেল সে। কাল সকালের প্লেনে নিউ ইয়র্কে ফিরবে সে, এ কথা জানল কিভাবে ওলটস? এর একমাত্র সম্ভাব্য ব্যাখ্য হলো, ওর পিছনে টিকটিকি লাগিয়েছে ওলটসে। তাই যদি হয়ে থাকে, সে যে ডনের প্রতিনিধি এ কথাও নিশ্চয় জানা হয়ে গেছে ওলটসের। এবার যদি কাজ হয়, ভাবল হেগেন, তবে ডনকে যদি ওলটস প্রাপ্য গুরুত্ব দিতে ভুল না করে, তবেই।
প্রাসাদোপম বাড়ি ওলটসের। বাড়ির চারদিকে প্রশস্ত মাঠ, তাতে ঘোড়া দৌড়ায়, তাই কালো মাটি ফেলে রাখা হয়েছে। বিশাল একটা ঘাস-জমি লালন করা হচ্ছে ঘোড়া চরাবার জন্যে। চিত্রতারকারা যত্ন করে যেভাবে তাদের নখ পরিষ্কার রাখে ওলটসের কর্মচারীরা, সেভাবে পরিষ্কার করে রেখেছে বাড়ি, বাগান, লতা ঝোঁপ, মাঠ এবং রাস্তাটা।
শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত একটা কাঁচ মোড়া বারান্দায় হেগেনকে অভ্যর্থনা জানাল ওলটস। বুক ভোলা নীল রঙের রেশমী শার্ট, হলুদাভ সবুজ রঙের স্ন্যাকস এবং কোমল চামড়ার স্যান্ডেল পরে রয়েছে সে। দামী এবং রঙচঙে পোশাক তার কর্কশ চেহারার সাথে বেমানান লাগছে। হেগেনকে এক গ্লাস মার্টিনি দিয়ে নিজেও ট্রে থেকে একটা তুলে নিল সে। চেহারা এবং আচরণে আগের চেয়ে অনেক বেশি সহনশীলতার ছাপ লক্ষ করার মত। হেগেনের কাঁধে একটা হাত তুলে দিয়ে বলল সে, ডিনারে বসার আগে চলো আমার ঘোড়াগুলো দেখে আসি।
