নিজেকে গড়ে পিটে নিতে অবশ্য ভুল করেনি লোকটা। মার্জিত ভাষায় কথা বলতেও শিখেছে, সাজ-পোশাক কিভাবে করতে হয় তাও একজন ইংরেজ ভ্যালের কাছ থেকে শিখে নিয়েছে, আরেকজন ইংরেজ বাটলারের কাছ থেকে জেনে নিয়েছে সামাজিক আচরণের নিয়ম-কানুন। প্রথমা স্ত্রী গত হবার পর পৃথিবী বিখ্যাত সুন্দরী আরেক মেয়েকে বিয়ে করেছে সে। ওলটস এখন ষাট বছরের বুড়ো। এখন তার শখ একালের বিখ্যাত শিল্পীদের আঁকা ছবি সংগ্রহ করা। বর্তমানে সে প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা পরিষদের একজন সদস্য। চলচ্চিত্র শিল্পের উন্নতির জন্যে একটা স্থায়ী তহবিল গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে নিজেই সে কয়েক কোটি ডলার চাঁদ দিয়ে বিস্তর সুনাম এবং প্রচুর হাততালি কুড়িয়েছে। ওর মেয়েকে বিয়ে করেছে এক ইংরেজ লর্ড। আর ছেলেটা বিয়ে করেছে এক ইটালিয়ান রাজকুমারীকে।
মার্কিন মুলুকের সমস্ত সিনে-ম্যাগাজিনগুলোর রিপোর্টারদের মতে ওলটসের সবচেয়ে শখের বস্তু হলো তার ঘোড়ার আস্তাবল। তার ঘোড়াগুলো দৌড় প্রতিযোগিতায় প্রথম, দ্বিতীয় বা তৃতীয় হয়। গত বছর এই ঘোড়ার পিছনেই সে নাকি খরচ করেছে দশ লক্ষ ডলার। এই তো কিছুদিন আগে ছয় লক্ষ ডলার দিয়ে নামকরা ইংলিশ রেসিং ঘোড়া খার্তুম-কে কিনল। কিনেই সে ঘোষণা করল, খার্তুম আর দৌড়াবে না, আস্তাবলের শোভা বর্ধন করবে। তাজ্জব বনে গিয়েছিল সবাই, দৈনিক সব সংবাদপত্রে বড় বড় হেডিংয়ে বেরিয়েছিল খবরটা।
হেগেনকে অভ্যর্থনা জানাবার সময় ভদ্রতার কার্পণ্য দেখাল না সে। চাঁছাছোলা, ক্লীন-শেভ মুখ, হঠাৎ সেটা বিকৃত হয়ে উঠল-হেগেনকে বুঝে নিতে হলো, এই ভেংচিটাই ওলটসের হাসি। সাংঘাতিক আরামে আছে, ওর শরীর এবং চেহারার যত্ন নেয়বিশেষজ্ঞেরা, তাতেও বয়স লুকিয়ে রাখতে পারেনি। সেলাই করে একসঙ্গে জুড়ে দেয়া হয়েছে মুখের পেশীগুলো, মনে হলো হেগেনের। তবে, নড়াচড়ার মধ্যে অদ্ভুত এক প্রাণশক্তির প্রাচুর্য টের পাওয়া যাচ্ছে। প্রভুত্ব করার সহজাত গুণ রয়েছে লোকটার মধ্যে, পরিবেশটাকে নিয়ন্ত্রণ করছে সেই।
ভূমিকা না করে কাজের কথা পাড়ল হেগেন। জানাল, জনি ফন্টেনের তরফ থেকে নয়, তার এক বিশিষ্ট বন্ধুর প্রতিনিধিত্ব করছে সে। প্রসঙ্গক্রমে জানাল, জনি ফন্টেনের এই বন্ধুটি প্রচণ্ড প্রভাব এবং ক্ষমতাশালী মানুষ, এবং মি, ওলটস যদি তার ছোট্ট একটা উপকার করেন, তিনি কৃতজ্ঞ বোধ করবেন এবং কৃতজ্ঞতার নিদর্শন, স্বরূপ চিরস্থায়ী বন্ধ হবার প্রতিশ্রুতি দেকেন। উপকারটি কি? নিজের প্রশ্নের উত্তর নিজেই দিল হেগেন, মি. ওলটসের স্টুডিওতে একটা যুদ্ধের ছবি শুরু হবে আগামী হপ্তায়, তাতে একটা বিশেষ ভূমিকা দিতে হবে জনি ফন্টেনকে।
কোন ভাবান্তর নেই ওলটসের চেহারায়। হাসি হাসি, ভদ্র ভাব মুখে। তার কথার মধ্যে কৌতুকের সুর, সেই সাথে একটু প্রশ্রয় দেয়ার ভাব ফুটে উঠল। তার প্রচণ্ড ক্ষমতা এবং প্রভাব আমার কি উপকারে আসবে?.
এই ধরুন, সবিনয়ে জানাল হেগেন, আপনার স্টুডিওতে শ্রমিকরা গোলমাল বাধালে আমার বন্ধু কথা দিচ্ছেন, সেটা তিনি মিটিয়ে দেবেন। তারপর, খুব নামকরা আপনাদের একজন নায়ক, ইদানীং মারিজুয়ানা ছেড়ে হেরোইন ধরেছে আমার বন্ধু কথা দিচ্ছেন, কোনভাবেই সে আর হেরোইন যোগাড় করতে পারবে না। শুধু তাই নয়, ভবিষ্যতেও যে কোন ছোটখাটো সমস্যা দেখা দিলে আপনি যদি শুধু একটা ফোন করে জানান, সাথে সাথে সব মিটে যাবে।
ছোট ছেলের বড়াই করা শুনছে, এই রকম একটা হাসি হাসি ভাব নিয়ে হেগেনের কথা শুনল ওলটস। কিন্তু কণ্ঠস্বর রূঢ় শোনাল, আমাকে ভয় দেখাচ্ছ নাকি?
সবিনয়ে বলল হেগেন, ছি-ছি, এ আপনি কি বলছেন। আমার বন্ধু আপনার কাছ থেকে অনুগ্রহ ভিক্ষা চান। আমার মাধ্যমে তিনি আপনাকে জানাচ্ছেন, ভিক্ষাটা দিলে আপনার কোন ক্ষতি হবে না, উপকার হবে।
রাগে মুখটা কালচে হয়ে উঠল ওলটসের। ভুরুজৈাড়া কুঁচকে নেমে এল নিচে, জ্বলজ্বলে চোখের উপর ঘন, কালো, পুরু একটা রেখার মত দেখাচ্ছে সেটাকে। ডেস্কের উপর, হেগেনের দিকে ঝুঁকে পড়ল সে, একটা গাল দিয়ে বলল, বেকুব। তোমার বন্ধু বা মনিব, যেই হোক সে, তাকে পরিষ্কার জানিয়ে দাওগে, আমি বেঁচে থাকতে অভিনয় করা তো দুরের কথা, ছবিটায় জনি ফন্টেন ছায়া পর্যন্ত ফেলার সুযোগ পাবে না। অসভ্য, জংলী মাফিয়া গুণ্ডাদেরকে আমি ডরাই না। চেয়ারের একদিকের হাতলে কনুই রেখে শরীরের ভর চাপাল সে, ঠোঁট বাঁকা করে হাসল, বলল, একেবারে খালি হাতে ফিরে যাও তা চাই না, সাথে করে একটু জ্ঞানও নিয়ে যাও–এডগার ভার, ব্যঙ্গের হাসিটা আরও বিত্তত হলো মুখে, আমার ঘনিষ্ঠতম বন্ধুদের একজন। তার কানে যদি যায় যে তোমরা আমাকে বিরক্ত করছ, ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি অবস্থা করে ছাড়বে সে তোমাদের।
বাইরে শান্ত দেখালেও মনে মনে রীতিমত বিস্ময়বোধ করছে হেগেন। এ কেমন বোকা লোক, যে নিজের বিপদ টের পায় না? এই হাঁদা কোটি কোটি টাকার একটা ব্যবসার মালিক হলো কিভাবে? ভাবনার খোরাক রয়েছে এর মধ্যে। নতুন ব্যবসা খুঁজছেন ডন, চলচ্চিত্রে টাকা খাটালেই তো হয়। এই সব গাধারা যদি ওখান থেকে আয় করতে পারে, ডনের যা বুদ্ধি, তিনি তো চোখ বুজে লুটপাট করবেন। ওলটসের গালি-গালাজ গায়ে মাখল না হেগেন। কাজ-কারবারে সব কিছু গায়ে না মেখে মাথা ঠাণ্ডা রাখাটাই সাফল্যের মূল কথা, এ মন্ত্র স্বয়ং ডন তাকে শিখিয়েছেন। ডন বলেন, না, রাগ দেখাবে না। ভয় তো দেখাবেই না। শুধু যুক্তি দিয়ে বোঝাবে। অপমান বা ভীতি-প্রদর্শন গ্রাহ্য করতে নিষেধ করেন ডন। মহান যীশুর পথ অবলম্বন করার পরামর্শ দেন তিনি। একবারের একটা ঘটনার কথা কখনও ভুলবে না হেগেন। কুখ্যাত, আত্মম্ভরি মরণ বাড় বেড়ে ওঠা এক গুণ্ডার সাথে আলোচনায় বসেছেন ডন। লোকটা নানাভাবে অপমান করছিল ডনকে। তিনি হাসি মুখে সব সহ্য করছিলেন। লোকটা যাতে তার স্বভাব বদলায় তার জন্যে শান্তভাবে যুক্তি দিয়ে বোঝাচ্ছিলেন তাকে। এক দুঘণ্টা নয়, ঝাড়া আট ঘণ্টা ধরে এই চলল। শেষ পর্যন্ত হতাশার ভাব ফুটে উঠল ডনের চেহারায়। আত্মসমর্পণের ভঙ্গিতে হাত দুটো শূন্যে তুলে আর সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন, বোঝা গেল, এ লোকের সাথে যুক্তি চলে না। কথা শেষ করে দ্রুত কামরা থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন তিনি। সাথে সাথে দূত পাঠিয়ে তখুনি ফিরিয়ে নিয়ে আসা হয়েছিল ডনকে। সমস্যার সমাধানও হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু দুমাস পর লোকটাকে তার পাওনা ঠিকই বুঝিয়ে দিয়েছিলেন ডন। নাপিতের দোকানে ঢুকে কে যেন গুলি করে মেরে ফেলেছিল লোকটাকে।
