কিন্তু তবু টম হেগেন অসন্তুষ্ট নয়। ডন কর্লিয়নিকে ভালবাসে সে, ভালবাসে ডনের স্ত্রীকে, ভালবাসে ডনের ছেলে-মেয়েদের-গোটা পরিবারের সাথেই ওর ভালবাসার সম্পর্ক। এই পরিবারের ঋণ রক্ত দিয়ে, প্রাণ দিয়ে কোন ভাবেই শোধ করার নয়। সেজন্যে নিজেকে কখনও লাগাম ছাড়া উচ্চাশার শিকার হতে দেয় না সে, দেবে না কখমও। সে ধরনের উচ্চাশা পোষণ করার একটাই অর্থ হয়: পরম উপকারীর অসম্মান করা। জীবন থাকতে তা করতে পারবে না টম হেগেন।
.
লস অ্যাঞ্জেলসে যখন পৌঁছল হেগেন, ভোর হয়নি তখনও। হোটেলে শাওয়ার সারুল সে, শেভ করল। জানালার সামনে একটা চেয়ারে বসে গুটি গুটি পায়ে কিভাবে তোর আসে তাই দেখছে। খানিক পর ব্রেকফাস্ট আর সংবাদপত্রের অর্ডার দিয়ে বিছানায় শুলো একটু আরাম করার জন্যে।
আগের দিনই ডনের নির্দেশে ফোন করেছিল সে বিলি গফ নামে এক লোককে। চলচ্চিত্র শ্রমিক সংঘে খুবই প্রভাব আছে বিলি গফের। জ্যাক ওলটসের সাথে হেগেনের দেখা করার ব্যবস্থা এই লোকই করেছে। ওলটসকে বিলি গফ আভাস ইঙ্গিতে জানিয়ে দিতে ভুল করেনি যে হেগেনকে অসন্তুষ্ট করলে স্টুডিওর শ্রমিকরা বিনা নোটিশে ধর্মঘটের ডাক দিয়ে বসতে পারে।
এক ঘণ্টা পর ফোন পেয়েছিল হেগেন। বিলি গফ তাকে জানিয়েছে আজ বেলা দশটার সময় তার সাথে দেখা করতে রাজি হয়েছে ওলটস। কিন্তু বিলি গফ হেগেনকে একথাও বলেছে, ধর্মঘটের হুমকিটাকে বিশেষ পাত্তা দেয়নি ওলটস। স্টুডিওতে শেষ পর্যন্ত যদি গোলমাল পাকাতেই হয়, তার আগে দুটো কথা বলে নেব আমি ডনের সাথে।
কোনরকম প্রতিশ্রুতি দেয়া এড়িয়ে যাওয়ার জন্যে হেগেন তাকে বলেছে, সেক্ষেত্রে ডনও কথা বলতে চাইবেন।
কর্লিয়নিদের ক্ষমতা নিউ ইয়র্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও শ্রমিক নেতাদের সাথে নিজস্ব পদ্ধতিতে যোগাযোগ করে নিউ ইয়র্কের বাইরেও ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে উঠছেন ডন কর্লিয়নি। এটুকু জানা আছে বলেই ডনের ইচ্ছাটাকে গফু এত বেশি মর্যাদা দিচ্ছে দেখে আশ্চর্য হয়নি হেগেন। অন্যান্য শ্রমিক নেতাদের মত বিলি গফও ডনের কাছে কোন না কোনভাবে ঋণী, এতে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই।
কিন্তু বেলা দশটায় সাক্ষাৎ! লক্ষণটা ভাল লাগছে না হেগেনের। পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে, সবার আগে তার সাথে দেখা করবে ওলটস অর্থাৎ তাকে লাঞ্চ খাওয়াবার কোন ইচ্ছা ওর নেই। তার মানে গফ যথেষ্ট ভয় দেখায়নি, তাই তাকে যথেষ্ট মূল্য দিচ্ছে না ওলটস। বলা যায় না; গফ হয়তো ওর কাছ থেকে ঘুষ খায়।
একটু ক্ষোভ দেখা দিল হেগেনের মনে। ডনের এই একটা অভ্যাস, সব সময় নিজেকে লোকচক্ষুর আড়ালে সরিয়ে রাখা। এতে পারিবারিক ব্যবসার ক্ষতি হয়। বাইরের লোক তাকে চেনে না, তার ক্ষমতা সম্পর্কে জানার সুযোগ পায় না। ফলে ডনের কোন গুরুত্বই দেয় না অজ্ঞরা। ( ঠিক সময়ে পৌঁছল হেগেন। সীটিং রূমটা বিলাসবহুল আসবাব পত্রে সাজানো। মখমলের গদি দিয়ে মোড়া চেয়ার। আরাম করে বসে আছে হেগেন। ওর বিশ্লেষণটাই সঠিক প্রমাণিত হয়েছে। প্রায় আধঘণ্টা হয়ে গেছে, অথচ এখনও ওলটসের খাস কামরা থেকে ডাক আসেনি।
সামনের একটা সোফায় স্বল্পবয়েসী একটা মেয়ে বসে আছে। বড়জোর বারো, তার বেশি বয়স হবে না। মেয়েটা পরমাসুন্দরী। অতটুকুন মেয়ে, কিন্তু মূল্যবান সাজসজ্জায় বয়স্কা মহিলার মত দেখাচ্ছে তাকে। সোনালী আঁশের মত চকচক করছে মাথার চুল, টানা দুটো চোখে আশ্চর্য এক মায়াবী গভীরতা, তাজা রাস্পবেরীর মত ঠোঁট। সাথের হাফ-বুড়িটা মেয়েটাকে আগলে রেখেছে। নিশ্চয়ই মা হবে, ভাবল হেগেন। মহিলা বারবার কটমট করে তাকাচ্ছে হেগেনের দিকে। হেগেনের অপরাধ, মাঝে মাঝেই মেয়েটার দিকে প্রশংসার দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে।
দামী পোশাক পরা এক মোটা মহিলা এসে উদ্ধার করল হেগেনকে। অনেকগুলো অফিস কামরার ভিতর দিয়ে পথ দেখিয়ে তাকে নিয়ে যাচ্ছে সে। কামরাগুলোয় আশ্চর্য সুন্দরী সব মেয়েরা কাজ করছে দেখে আপন মনে একটু হাসল হেগেন। এরা সবাই বুদ্ধিমতী মেয়ে, চলচ্চিত্র অফিসে কেরানীর চাকরি করাটা এদের কারুরই উদ্দেশ্য নয়, উদ্দেশ্য অভিনয় করার সুযোগ বের করে নেয়া। চাকচিক্যের এই জগতটায় ঢোকার কৌশল হিসাবে চাকরি নিয়েছে এরা। দুঃখ বোধ করল হেগেন। কেননা, ওরা জানে না ওদের বেশির ভাগেরই বাকি জীবনটা এই কেরানীর চাকরি করেই কেটে যাবে, অভিনয় করার সুযোগ আসবে না।
জ্যাক ওলটস দীর্ঘদেহী, শক্তসমর্থ, ভুড়িটা বিরাট হলেও সুটটা এমন নিখুঁতভাবে তৈরি করা যে সেটাকে প্রায় ঢেকেই রেখেছে। ওলটসের অতীত ইতিহাস কিছুই অজানা নেই হেগেনের। খুব ছোটবেলা থেকে রোজগার করছে সে। দশ বছর বয়সে ঠেলাগাড়ি আর খালি মদের পিপে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় গড়িয়ে নিয়ে যেত বাপের একটা পোশাক তৈরির দোকান ছিল, বিশ বছর বয়সে সেই দোকানের কর্মচারীদের উপর অত্যাচার আর শোষণ চালাত। ফাইভ সেন্ট থিয়েটারে টাকা খাটাতে শুরু করে ত্রিশ বছর বয়সে। তার বয়স যখন আটচল্লিশ, হলিউডের রথী মহারথীদের মধ্যে অন্যতম একজন হয়ে উঠেছে সে। বড় হয়েছে, কিন্তু স্বভাব আগের মতই আছে। এখনও সে কামাতুর, কর্কশভাষী, হিংস্র নেকড়ের মত হবু তারকাদের ওপর অত্যাচার চালায়
