সনি কর্লিয়নি আর টম হেগেন সমবয়েসী, এগারো বছর বয়সে পরস্পরের খেলার সাথী ছিল ওরা। অন্ধ হয়ে গিয়ে হেগেনের মা ছেলের দৃশ বছর পূর্ণ হতেই মারা গেল, বাপও তারপর থেকে একেবারে বেহেড মাতাল হয়ে গেল। কাঠ মিস্ত্রী নোকটা খুব খাটতে পারত। কিন্তু মদ খেয়ে লিভার পচিয়ে শেষ পর্যন্ত সে-ও মরে গেল।
এতিম টম রাস্তায় রাস্তায় নেড়ি কুকুরের মত ঘুরে বেড়ায়, রাতে লোকের বাড়ির সামনে ঘুমায়। মায়ের মত তারও চোখের ব্যারাম, সবাই রোগটাকে ছোঁয়াচে মনে করে ভয় পায়, নিজেদের ছেলেগুলোকে ওর ধারেকাছে ঘেঁষতে নিষেধ করে দেয়, কাছে পিঠে ওকে দেখলে দূর হ দূর হ করে ঝাড়ু, হাতে ছুটে আসে।
সনি কর্লিয়নি সেই এগারো বছর বয়সেই দারুণ একগুঁয়ে, বন্ধুর দুর্দশা দেখে মনে তার অদ্ভুত করুণার উদ্রেক হলো। একদিন তাকে সাথে করে বাড়িতে নিয়ে এসে আবদার জুড়ে দিল সে, এ-বাড়িতেই ওর থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। এক পেয়ালা টমেটো সসের গরম স্প্যাগেটি আনা হলো টমের সামনে। সেই স্প্যাগেটির স্বাদ চিরকাল জিভে লেগে থাকবে তার।
ছেলের আবদার সম্পর্কে হা-না কিছুই বলেননি ডন কর্লিয়নি। টমকেও কিছু বলেননি। তাঁর মৌনতা লক্ষ করে সবাই বুঝে নিল, টম হেগেনকে আশ্রয় দিতে তার কোন আপত্তি নেই। তারপর তিনি নিজেই তাকে একজন চক্ষু বিশেষজ্ঞের কাছে নিয়ে গিয়ে চোখের অসুখটা সারালেন, ভর্তি করে দিলেন স্কুলে। টম তার ছেলেদের সাথেই বড় হতে লাগল। একদিন সে কলেজে ভর্তি হয়ে আইন,পড়তে শুরু করল।
ডন কর্লিয়নির আচরণে কোনদিনই টমের প্রতি স্নেহের কোন প্রকাশ ছিল না। টমের বাবার স্থান দখল না করে তিনি অভিভাবকের ভূমিকা নিয়েছিলেন। স্নেহ ভালবাসার প্রকাশ ছিল না, কিন্তু তিনি তাঁর ছেলেদের চেয়ে তাকেই বেশি সৌজন্য দেখাতেন, এবং কোন সময়ই শাসন করতেন না। টমের কোন সিদ্ধান্ত কখনও তিনি বাতিল করেননি। আইন পড়ার সিদ্ধান্তটা টমের নিজেরই। তবে, ডন একবার কাকে যেন বলেছিলেন অস্ত্রধারী একদল ডাকাতের চেয়ে ব্রীফকেসধারী একজন মাত্র উকিল অনেক বেশি টাকা লুট করতে পারে। কথাটা ভোলেনি টম হেগেন।
ওদিকে সনি আর ফ্রেডির পড়াশোনা বেশিদূর এগোল না। হাই স্কুল থেকে বেরিয়েই পারিবারিক ব্যবসায় ঢুকে পড়ল দুজন। কিন্তু মাইক কলেজে পড়তে গেল। এরপরই ঘটল পার্ল হারবারের দুর্ঘটনা, অমনি কলেজ ছেড়ে মেরিনসে নাম লেখাল সে।
আইন পড়া শেষ করে বিয়ে করল হেগেন। ইতালিরই মেয়ে, নিউ জার্সিতে থাকে, সে-ও গ্র্যাজুয়েট,-বেশ হাসিখুশি টাইপের মেয়ে। বিয়েটা ডন কর্লিয়নির বাড়িতেই হলো। ডন বললেন, এখন টম যেখানে ইচ্ছা নিজের ব্যবসা দাঁড় করাবার চেষ্টা করতে পারে, উনি তাকে সাহায্য করবেন, মক্কেল যোগাড় করে দেবেন, অফিস গোছগাছ করে দেবেন।
আমি আপনার কোন কাজে লাগতে চাই, অবনত মস্তকে মৃদু কণ্ঠে নিজের আন্তরিক ইচ্ছা জানিয়েছিল হেগেন।
অবাক হলেন ডন। খুশিও কম হৃলেন না। কিন্তু প্রশ্ন করলেন, তুমি জানো, আমি কি?
মাখাটা একদিকে কাত করে হেগেন বোঝাতে চেষ্টা করল, সে জানে।
আসলে ডন কর্লিয়নির ক্ষমতার পরিধি সম্পর্কে তখনও কিছু জানা ছিল না হেগেনের। তারপর আরও দশ বছর কাটল, এই দীর্ঘ সময়েও সবটুকু জানা সম্ভব হয়নি। গেনকো আবানদণ্ডা অসুস্থ হয়ে পড়ায় তাকে অস্থায়ীভাবে কনসিলিয়রির পদে নির্বাচিত করা হলো, এরপরই সে গোটা পরিধিটা আঁচ করতে পারল।
অতি ক্ষুদ্র, অতি নগণ্য অবস্থা থেকে মহাপুরুষের মহিমা অর্জন করার মূলে যে ক্ষমতার দরকার, মানুষের মন বোঝার সেই অদ্ভুত ক্ষমতা আছে ডন কর্লিয়নির। সেই ক্ষমতার সাহায্যে টম হেগেনের মন জেনে নিতে পেরেছিলেন তিনি। এবং সেই প্রথম হেগেনকে তিনি বাপের মত অকুণ্ঠচিত্তে স্নেহ করলেন, তাকে দুহাত দিয়ে টেনে নিজের বুকের মধ্যে আনলেন। এরপর থেকেই তিনি ওর সাথে এমন ব্যবহার করতে শুরু করলেন, বাইরে থেকে দেখে বোঝাই যেত না যে হেগেন তাঁর সন্তান নন।
কিন্তু প্রায়ই তিনি টমকে মনে করিয়ে দিয়ে বলতেন, দেখো টম, বাপ-মায়ের চেয়ে কেউ বড় নয়। ওদের কথা কখনও ভুলে যেয়ো না। আসলে শুধু টমকে নয়, কথাটা তিনি নিজেকেও মনে করিয়ে দিতেন।
ডনের নির্দেশে পারিবারিক ব্যবসা সংক্রান্ত কাজ কর্ম দেখাশোনা করার মধ্যেই তিনটে বছর আইন-ব্যবসা চালাল হেগেন। আইন-ব্যবসার এই অভিজ্ঞতা পরে খুব কাজে দেয়। এলাকার সবচেয়ে বিখ্যাত ফৌজদারী উকিলদের প্রতিষ্ঠানে ডনের কিছু প্রভাব থাকায় এরপর সেখানে দুবছর প্রশিক্ষণ নিতেও কোন অসুবিধে হয়নি টমের।
কিছুদিনের মধ্যেই জানা গেল, আইনের বিশেষ এই দিকে হেগেন একটা প্রতিভা। কর্লিয়নিদের পারিবারিক ব্যবসার একজন ফুল-টাইম কর্মচারী হবার পর থেকে ছয় বছরের মধ্যে আইনগত ব্যাপারে তার উপর অসন্তুষ্ট বা বিরক্ত হবার কোন কারণ দেখতে পাননি ডন কর্লিয়নি।
হেগেনকে অস্থায়ীভাবে কনসিলিয়রির পদে নিযুক্ত করায় প্রভাবশালী সিসিলীয় পরিবারগুলো কর্লিয়নিদের প্রতি তাচ্ছিল্য প্রকাশ করতে কসুর করেনি। আইরিশ দঙ্গল এই নাম রেখেছে সবাই কর্লিয়নিদেয়। কথাটা মনে পড়লেই হাসি পায় হেগেনের। কিন্তু সেই সাথে এটাও হৃদয়ঙ্গম করে যে ডন কর্লিয়নির অবর্তমানে এই পরিবারের ব্যবসার উপর কর্তৃত্ব করার আশা তার না রাখাই ভাল।
