এক রাতের ঘটনা। রাস্তার প্রায় মাঝখানে গাড়ি রাখার ফলে ছোট একটা গোটা এলাকায় যানবাহন চলাচল একেবারে বন্ধ হয়ে গেল। রাত তখন বারোটা। টর্চ হাতে নিয়ে কর্তব্য পালনে নেমে পড়ল নেরি। রাস্তায় যে কটা গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে সবগুলোর উইণ্ডস্ক্রীনের কাঁচ ভেঙে দিল সে। গাড়ির মালিকরা সবাই গণ্যমান্য ব্যক্তি হলেও কাঁচ পাল্টাতে সময় এবং কিছু টাকা ব্যয় করতে বাধ্য হলো তারা, তবে এ ধরনের বর্বরতার বিরুদ্ধে চুপ করে থাকল না কেউ, ফলে স্রোতের মত অভিযোগ আসতে শুরু করল থানায়।
কিন্তু এরপরও পুরো হপ্তা জুড়ে প্রতিদিন গাড়ির কাঁচ ভাঙার ঘটনা ঘটতে লাগল। অবশেষে আসল কারণ বুঝতে পেরে টনক নড়ল কর্তৃপক্ষের। সাথে সাথে হার্লেমে বদলি করে দেয়া হলো অ্যালবার্ট নেরিকে।
এর কিছুদিন পর এক রোববারে সস্ত্রীক বেড়াতে এল নেরি তার বোনের বাড়ি। আর সব সিসিলীয়দের মত বোনকে সাঙ্ঘাতিক ভালবাসে সে, সম্ভাব্য সব রকম বিপদ-আপদ আর আঘাত থেকে তাকে রক্ষা করতে চায়। দুমাস অন্তর একবার করে এসে দেখে যায় বোন কেমন আছে। বোনের চেয়ে বয়সে অনেক ছোট সে, বছর কুড়ি বয়সের একটা বোন-পো আছে তার। নাম টমাস, মাথার ওপর বাপের শাসন না থাকায় ভালমানুষ মায়ের ওপর খুব অত্যাচার করে সে। এরই মধ্যে ছোটখাট দুএকটা অঘটন ঘটিয়েছে। আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে দিনে দিনে। একবার ছোট একটা চুরির কেসে ফেসেই গিয়েছিল টমাস, সহকারীদের ধরে তার রেহাই পাবার ব্যবস্থা করে দিল মেরি। সেবার প্রচণ্ড রাগ হয়েছিল তার। কিন্তু স্বভাব অনুযায়ী প্রথমবার বলে গায়ে হাত তোলেনি, তবে শেষবারের মত সাবধান করে দিয়েছিল। সেই প্রসঙ্গে আরও বলেছিল, দেখো, টমি, এখন তুমি বড় হয়েছ। মায়ের সাথে কি রকম আচরণ করা উচিত তা তোমার জানা আছে বলেই বিশ্বাস করি। ফের যদি শুনি তুমি আমার বোনের সাথে খারাপ ব্যবহার করেছ, নিজে এসে তোমাকে সিধে করব আমি। কথাটা ভয় দেখাবার জন্যে বলেনি নেরি, বলেছিল ভাগের প্রতি মামার শুভাকাক্ষী বন্ধুসুলভ পরামর্শের সুরে। ব্রুকলিনের এই গুণ্ডাপাড়ায় যত ছোকরা আছে তাদের মধ্যে টমাসই সবচেয়ে বেপরোয়া আর অকুতোভয়, কিন্তু মামাকে সে ভয় করে জুজুর মত!
রোববার সকালে বোনের বাড়ি এসে নেরি নল গতরাতে প্রায় ভোরের দিকে বাড়ি ফিরেছে টম, তাই এত বেলাতেও ঘুম ভাঙেনি তার। মা ছেলের কামরায় ঢুকে খানিকটা চেঁচামেচি করে এল। বলল, তোর মামীকে নিয়ে মামা বেড়াতে এসেছে, ওদের সাথে খাবি আয়।
কামরার মাঝখানের দরজা খোলা, তাই টমের উত্তরটা পরিষ্কার শুনতে পেল নেরি। টম কর্কশ সুরে বলল, এসেছে তো আমার কি! এখান থেকে যাও, আমি এখন ঘুমাব।
ছেলের ধমক খেয়ে মুখ কালো করে বেরিয়ে এল মা।
টমকে বাদ রেখেই খেতে বসল ওরা। বোনকে একটা প্রশ্ন করল নেরি, ইদানীং টম তার ওপর আগৈর মত অত্যাচার করছে কিনা। এদিক ওদিক মাথা নাড়ল টমের মা।
বিকেলের দিকে বিদায় নিচ্ছে নেরি, এই সময় বিছানা থেকে উঠল টম। দায়সারা গোছের একটা হ্যালো বলে কিচেনে গিয়ে ঢুকল সে। তারপর সেখান থেকে চিৎকার করে বলল, এই মা, আমার কথা কানে যাচ্ছে? খিদে পেয়েছে, তাড়াতাড়ি কিছু একটা বেঁধে দাও। কথার সুরটা অনুরোধের মত নয়, আদুরে ছেলের আবদারের মত শোনাল।
গলায় ঝাঁঝ এনে জবাব দিল মা, লাটসাহেব ছেলে আমার, সারা রাত হারামীপনা করে এসে উনি ঘুম থেকে উঠলেন এই বিকেল বেলা! এখন ওঁকে আমার বেঁধে দিতে বয়ে গেছে। আরও ঘুমাও, একেবারে সেই রাতে খেয়ো।
অপ্রীতিকর একটা দৃশ্য, অনেক সংসারেই এই রকম ঘটতে দেখা যায়। কিন্তু এই মাত্র ঘুম থেকে উঠে টমের মেজাজ ভাল নেই, মামার উপস্থিতি ভুলে গিয়ে একটা মারাত্মক অন্যায় করে বসল সে। তোমাকে আর তোমার খ্যাচখ্যাচানিকে ইয়ে করি আমি, চিৎকার করে অশ্রাব্য একটা গালি দিল সে। বাইরে গিয়েই খেতে পারি, বুঝেছ? কথাগুলো বলেই বুঝতে পারল টম, মারাত্মক একটা ভুল করে ফেলেছে সে।
শিকারী বিড়ালের মত ভাগ্নের ঘাড়ের ওপর লাফিয়ে পড়ল নেরি। মাকে টম এমন জঘন্যভাবে অপমান করল বলে যতটা না, তার চেয়ে হলো নেরির বাড়িতে কেউ না থাকলে টম তার মায়ের সাথে আরও খারাপ আচরণ করে বুঝতে পেরে। এর আগে কখনও মামার সামনে এভাবে মায়ের সাথে কথা বলেনি ও। বাজে। কথাগুলো মুখ ফস্কে বেরিয়ে গেছে আজ। কপালে খারাবি থাকলে যা হয়।
ঘরে দুজন মেয়েলোক উপস্থিত রয়েছে, কিন্তু তারা বাধা দেয়া তো দূরের কথা, আতঙ্কে পিছু হটতে হটতে দেয়ালে পিঠ দিয়ে দাঁড়াল। একটা কথাও বেরুল না তাদের মুখ থেকে। বিস্ফারিত চোখে শুধু দেখছে মার কাকে বলে। ভাগ্নের পা থেকে মাথা পর্যন্ত অত্যন্ত যত্নের সাথে পেটাল নেরি। খুব বেশি ব্যস্ততা দেখাল না সে, যেন কাজটায় গভীর যত্ন না নিলে নিখুঁত হবে না। শুধু দুই হাতে পেটাচ্ছে, কিন্তু আঘাতগুলো যেখানে পড়েছে সেখানের মাংস সাথে সাথেই ফুলে উঠেছে। প্রথম দিকে আত্মরক্ষার একটু চেষ্টা করল টম, কিন্তু তা সম্ভব নয় বুঝতে পেরে করুণা ভিক্ষা করতে শুরু করল। নেরি সবচেয়ে বেশি মনোযোগ দিল টমের মুখের ওপর। একের পর এক চড় মেরে গেল যতক্ষণ না ঠোঁট ফেটে রক্ত গড়াতে শুরু করল। তারপর টমের মাথার দিকে মনোযোগ দিল। মাথাটা ধরে ঠুকে দিতে লাগল শক্ত দেয়ালে। তারপর ভায়ের পেটে গোটাকতক ঘুসি মারল। পড়ে গেল টম। নেরি যেন এরই জন্যে অপেক্ষা করছিল, টম পড়ে যেতেই তার মুখটা ঘষে দিল গালিচার সাথে তোমরা এখানে অপেক্ষা করো, মহিলাদেরকে বলল নেরি। তারপর রক্তাক্ত ভাগ্নেকে ধাক্কা মারতে মারতে বাড়ি থেকে বের করে নিয়ে এসে সোজা তুলল নিজের গাড়িতে। স্টার্ট দিল না, ভামের পাশে বসে তার উদ্দেশে গালমন্দ শুরু করে একেবারে ভূত ভাগিয়ে দিল। ফের কখনও যদি জানতে পারি তোর মায়ের সাথে, ওভাবে কথা বলছিস, তখন কি করব তা আমার মনই জানে। শুধু এইটুকু বলে রাখিআজকের এই মারধরটাকে তখন মেয়েদের চুমো বলে মনে হবে তোর কাছে। যা এবার, সোজা বাড়িতে ঢুকে তোর মামীকে বল, তার জন্যে এখানে আমি অপেক্ষা করছি।
