এই ঘটনার পর দুমাস কেটে গেছে। একদিন বাড়ি ফিরে অ্যালবার্ট নেরি দেখল তার স্ত্রী তাকে ছেড়ে চলে গেছে। ফোন করল সে। রিসিভার তুলল ওর শ্বশুর, বলল, নেরিকে সাঙ্ঘাতিক ভয় করে তার মেয়ে, তাই চলে এসেছে। রিটা জানিয়ে দিয়েছে, এমন চণ্ডালের মত রাগী লোকের সাথে ঘর-সংসার করা তার পক্ষে সম্ভব নয়।
নেরি তো একেবারে হতভম্ব হয়ে গেল, রিটা তাকে ভয় করে, একথা সে বিশ্বাসই করতে পারছে না। স্ত্রীর গায়ে কখনও হাত তোলেনি সে, এমনকি বকাঝকাও করেনি কখনও। স্ত্রীকে ভালবাসে সে, তাকে ভয় দেখাবার কথা ভাবতেই পারে না। স্তম্ভিত ভাবটা কেটে যেতে কয়েকটা দিন সময় লাগল। তারপর নেরি ঠিক করল, শ্বশুর বাড়ি গিয়ে রিটার সাথে কথা বলতে হবে তাকে। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে পরদিন রাতেই ডিউটিতে গিয়ে বিপদে পড়ে গেল সে। রিটার কাছে আর যাওয়া হলো না তার।
সাহায্যের ডাকটা এল হার্লেম থেকে। নিজের স্ট্রেল-কারের অয়্যারলেসের মাধ্যমে সাড়া দিল নেরি। তাকে জানানো হলো, ভয়ঙ্কর ধরনের খুনোখুনি ব্যাপার, অকুস্থলে দ্রুত পৌঁছুতে পারলে কিছুটা সামাল দেয়া যেতে পারে। তীর বেগে গাড়ি হাঁকিয়ে সেখানে পৌঁছে গেল নেরি, টর্চটা হাতে নিয়ে নেমে পড়ল লাফ দিয়ে। মধ্যরাত পেরিয়ে গেছে, তবু জায়গাটা খুঁজে বের করতে বেগ পেতে হলো না। বস্তী এলাকা, একটা বাড়ির সামনে ভিড় দেখে সেদিকে এগোল নেরি। একজন লোক বাচ্চা একটা মেয়েকে মেরে ফেলছে, নিগ্রো একটা মেয়েলোক বলল নেরিকে।
দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকল নেরি। হলঘরের উল্টোদিকের দরজাটা খোলা, সেখান থেকে আলো আসছে। একটা গোঙানির আওয়াজও পাচ্ছে নেরি। খোলা দরজাটার দিকে এগোল সে। চৌকাঠ পেরিয়ে ভেতরে ঢুকেই আরেকটু হলে হোঁচট খেয়ে পড়ে যাচ্ছিল। দুটোই নিগ্রো মেয়ে, একজনের বয়স পঁচিশের মত, আরেকজনের টেনেটুনে বারো হবে। মেয়ে দুটোর শরীরের নানা জায়গায়, বিশেষ করে মুখে ধারাল ক্ষুর দিয়ে পোচ মারা হয়েছে। সিটিংরুমে অপরাধীকেও দেখতে পাচ্ছে নেরি। খুব ভাল করে চেনে লোকটাকে সে। নাম ওয়াক্স বেনস, বেশ্যাদের একজন নীচ দালাল, তাছাড়া গুণ্ডামি আর বেআইনী ড্রাগসের ব্যবসাও করে থাকে। এই তো মাত্র এক হপ্তা আগের ঘটনা, রাস্তায় একটা বেশ্যা মেয়েকে মারধর করার অপরাধে নেরি তাকে অ্যারেস্ট করেছিল। অবশ্য তার পরদিনই জামিন পেয়ে গিয়েছিল বেনস।
নিগ্রোদেরকে মোটেই পছন্দ করে না নেরি। হার্লেম নিগ্রোদেরই এলাকা, এখানে কাজ করতে এসে নিগ্রোদের ওপর তার বিরক্তি আর ঘৃণা আরও বরং বেড়ে গেছে। নিগ্রোদের স্বভাব আর আচার আচরণই এর জন্যে দায়ী। নিগ্রো মেয়েরা প্রায় সবাই চাকরি করে, দেহ বিক্রি করে টাকা কামায়, কিন্তু পুরুষগুলো খাটা খাটনির ধার দিয়ে যায় না-ধু মদ খেয়ে নেশা করে। একে নিগ্রোদেরকে দুচোখে দেখতে পারে না, তার ওপর বেন এমন সীমা ছাড়িয়ে আইন অমান্য করেছে দেখে মাথায় রক্ত চড়ে গেল নেরির। ক্ষুর দিয়ে ফালা ফালা করা ছোট মেয়েটাকে দেখে বমি পাচ্ছে তার। অত্যন্ত শান্তভাবে, ঠাণ্ডা মাথায় আশ্চর্য একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল অ্যালবার্ট নেরিওয়াক্স বেনসকে গ্রেফতার করবে না সে.।
বাড়ির ভেতর ইতিমধ্যে সাক্ষীদের ভিড় জমে গেছে, বেশিরভাগই বস্তীর বাসিন্দা, তাদের সাথে পেট্রল-কার থেকে নেরির সহকারীও এসেছে। এই ব্যাটা, বেন, ছুরি ফেলে দে, গ্রেফতার করা হলো তোকে, বলল নেরি।
বিশ্রী শব্দ করে হেসে উঠল বেনস, বলল, এতই সহজ? আমাকে গ্রেফতার করতে হলে রিভলভার লাগবে, হাত তুলে ছুরিটা দেখাল সে! কিংবা হয়তো এটা দরকার তোমার?
বিদ্যুৎ খেলে গেল নেরির শরীরে, চোখের নিমেষে নিগ্রো লোকটার কাছে চলে এল সে। পকেট থেকে রিভলভার বের করার সুযোগই পেল না লোকটা, কিন্তু আশ্চর্য ক্ষিপ্রতার সাথে নেরিকে লক্ষ্য করে ছুরি চালাল। তৈরি ছিল নেরি, বাঁ হাত দিয়ে লোকটার কব্জি ধরে ফেলল সে। একই সাথে ডান হাতে ধরা টর্চটা দিয়ে ছোট একটা অর্ধবৃত্ত রচনা করে বেনসের মাথায় মোক্ষম একটা ঘা বসিয়ে দিল। নেশাগ্রস্ত বদ্ধ মাতালের মত হাসাকর ভঙ্গিতে বসে পড়ল বেনস: ছুরিটা পড়ে গেছে হাত থেকে। মাথায় টর্চের বাড়ি খেয়ে একেবারে অসহায় হয়ে গেছে লোকটা, সুতরাং এরপর আর তাকে মারধর করা চলে না নেরির। আইন সেটাকে সমর্থন করবে না। প্রথম আঘাতেই বারোটা বেজে গেছে বেনসের। টর্চের কাঁচ টুকরো টুকরো হয়ে গেছে, এনামেল করা ঢাকনি আর বাল ছিটকে চলে গেছে কামরার আরেক প্রান্তে। টর্চের ভারি শরীরটা পর্যন্ত তুবড়ে গেছে। ভেতরে ব্যাটারির সেলগুলো রয়েছে, তা না হলে দুমড়ে দুভাজ হয়ে যেত ওটা। মাথার খুলি ফেটে গেছে বেনসের। এই বাড়িরই একজন বাসিন্দা, নিগ্রো দর্শক, সবিস্ময়ে বলল, কি শক্ত মাথারে বাবা! চুরমার হয়ে যাবার কথা, তা না, শুধু ফেটে গেছে। তবু লোকটাকে দ্বিতীয়বার আঘাত করল নেরি। দুঘন্টা পর হার্লেমের হাসপাতালে মারা গেল বেনস।
বিভাগীয় অভিযোগের সম্মুখীন হতে হলো নেরিকে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে শুনে নেরি ছাড়া আর কেউ এতটুকু আশ্চর্য হলো না। প্রয়োজনের বেশি শক্তি প্রয়োগ করার অপরাধে তাকে তো সাসপেন্ড করা হলোই, সেই সাথে কর্তৃপক্ষ তার বিরুদ্ধে একটা ফৌজদারি মামলাও ঠুকে দিল। গোটা ব্যাপারটা নেরির কাছে। অবিশ্বাস্য, দুঃস্বপ্ন বলে মনে হয়। বুঝতেই পারে না কি অপরাধ করেছে সে। বিচারে দোষী সাব্যস্ত করা হলো তাকে, জেল হয়ে গেল দশ বছরের।
