এক রাতের ঘটনা। সেন্ট্রাল পার্ক ওয়েস্ট। পেট্রল-কার থেকে লাফ দিয়ে নামল নেরি। কার্লো রেশমি কোট পরা ছয়জন গুণ্ডাকে এক লাইনে দাঁড় করাল সে। ওর সাথে একজন সহকারী রয়েছে, নেরিকে সে ভালকরেই চেনে, জানে তার রাগের সামনে দাঁড়াবার সাধ্য নেই কারও, তাই যা ঘটতে যাচ্ছে তার সাথে নিজেকে জড়ারার কোন ইচ্ছে হলো না। গাড়ি থেকে নামলই না সে, বসে থাকল ড্রাইভিং সীটে।
ছোকরানোর কারও বয়সই কুড়ির বেশি হবে না। রাস্তার লোকজনদের পথরোধ করে তাদের কাছ থেকে সিগারেট চাইছিল ওরা। চাওয়ার মধ্যে হুমকি, শাসানি ইত্যাদি থাকলেও কারও গায়ে হাত তোলেনি ওরা। তবে, এরই সাথে আরেকটা অপরাধ করছিল। কোন মেয়েকে আসতে দেখলেই অশ্লীল যৌন ইঙ্গিত ইশারা করে বিরক্ত করছিল তাদেরকে। ফ্রান্সে এরকম দৃশ্য হরহামেশা দেখা গেলেও আমেরিকায় এ-ধরনের ঘটনা বিরল।
সেন্ট্রাল পার্ক আর এইটস্ এভেনিউয়ের মাঝখানে একটা পাথরের পাচিল আছে, সেটার সামনে দাঁড় করিয়েছে ওদেরকে নেরি। সূর্য ডুবে গেছে, কিন্তু লালচে আলো রয়েছে এখনও আকাশের গায়ে। কিন্তু এরই মধ্যে মস্ত একটা টর্চলাইট হাতে নিয়ে গাড়ি থেকে নেমেছে নেরি। কারণটা আর কিছুই নয়, এটা তার একটা অত্যন্ত প্রিয় অস্ত্রও বটে। রাগে অন্ধ হয়ে পকেট থেকে রিভলভার বের করেছে নেরি, এ কথা কেউ বলতে পারবে না তার সম্পর্কে। তার কোন প্রয়োজনই হয় না। রেগে গেলে হিংস্র পাষণ্ডে পরিণত হয় সে, চেহারায় ভীতিকর একটা পাশবিক ভাব ফুটে ওঠে, তার ওপর গায়ে চড়ানো থাকে পুলিশের ইউনিফর্ম, গুণ্ডাপাণ্ডারা ওর মুখের দিকে তাকিয়ে সাঙ্ঘাতিক ঘাবড়ে যায়। এই মুহূর্তে লাইন-বন্দী হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে যারা তারাও নেরির বীভৎস চেহারা দেখে হতভম্ব হয়ে গেছে।
কালো রেশমি কাপড়ের কোট পরা প্রথম ছেলেটাকে প্রশ্ন করল নেরি, নাম কি?
নাম শুনে নেরির মনে হলো, ছেলেটা আইরিশ। আর কোন রাতে তোমাকে যদি রাস্তায় দেখি, সাবধান করে দেব না, ধরে সোজা ঝুলিয়ে দেব শে টর্চ নেড়ে নেরি ইঙ্গিত করতেই হনহন করে হেঁটে পালিয়ে বাঁচল ছেলেটা।
পরবর্তী দুটো ছেলের সাথে একই ধরনের আচরণ করল নেরি তারাও যথাসম্ভব দ্রুত কেটে পড়ল।
চতুর্থ ছেলেটা নেরির প্রশ্ন শুনে একটা ইতালীয় নাম বলল, আর মুচকি মুচকি হাসতে লাগল ওর দিকে তাকিয়ে, ভাবটা যেন আপনিও ইতালীয়, আমিও ইতালীয়, অর্থাৎ আত্মীয়তার সম্পর্ক আমাদের।
নেরি যে ইতালীয় তা তার চেহারার দিকে তাকালেই পরিষ্কার বোঝা যায়। ছেলেটার কথা শুনে একটু হাসল নেরি, জানতে চাইল, তাই নাকি? তুমি ইতালীয়?
ঘন ঘন মাথা ঝাঁকিয়ে হাসল ছেলেটা, চেহারায় একটা নিশ্চিন্ত ভাব ফুটে উঠেছে তার। তারপর কিভাবে কেন ঠিক কি ঘটল, বলতে পারবে না সে। বিদ্যং খেলে গেল নেরির হাতে। ছেলেটার মাথায় প্রচণ্ড একটা ঘা বসিয়ে দিল সে হাতের টর্চটা দিয়ে। সাথে সাথে কপালের চামড়া কেটে গেল। ক্ষতটা গম্ভীর হয়েছে, হড়হড় করে বেরিয়ে আসছে রক্ত। ভাগ্য ভাল বলতে হবে ছেলেটার, আঘাতটা হাড় পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছায়নি।-শালা বেজন্মা। ইতালীয়দের কলঙ্ক তুই। তোদের। জন্যেই তো এত বদনাম আমাদের। ওঠ, শালা, সিধে হ। ছেলেটার গায়ে একটা লাথি মারল নেরি। লাথিটা খুব জোরে মারল না, আবার খুব আস্তেও নয়! যা-শালা, এখান থেকে সোজা বাড়ি ফিরে যা। আবার যদি রাস্তায় ঘুর ঘুর করতে দেখি তোকে, মেরেই ফেলব। আর শোন, ফের যদি এই কার্লো কোটটা গায়ে দিল, আর আমার চোখে পড়ে যাস, যীশুর কিরে, তোর কপালে খারাবি আছে। তোর ভাগ্য ভাল যে আমি তোর বাবা নই।
বাকি ছেলে,দুটোর সাথে কোন কথাই বলল না নেরি। তাদের কোমরে লাথি মারতে মারতে অনেকটা পথ পার করে দিয়ে এল শুধু।
এ-ধরনের ঘটনা যখন ঘটে, ঝামেলা মিটিয়েই সেখান থেকে সরে যায় নেরি। দেরি করলেই লোকজন জমবে, তার আচরণের প্রতিবাদ জানাবে। সহকারী তৈরি হয়েই থাকে, নেরি লাফ দিয়ে উঠে বসলেই গাড়ি ছেড়ে দেয় সে। তবে কখনও সখনও তাঁদোড় কিসিমের দুএকটা ছোকরার দেখা পাওয়া যায়, নিজেকে খুব দুঃসাহসী মনে করে লড়তে আসে, এমন কি ছোরা-ছুরি পর্যন্ত বের করে। এদের অবস্থা চোখের জলে নাকের জলে করে ছাড়ে নেরি! কয়েক মুহূর্তের জন্যে অন্ধ পিশাচে পরিণত হয়ে যায় সে, অ্যায়সা মার মারে যে, ছেড়ে দে বাপ, ছেড়ে দে বাপ করে চেঁচাতে থাকে ছোকরালো। কিন্তু নেরির তখন একটাই উদ্দেশ্য, চেঁচানিটা থামানো। তাই যত বেশি চেঁচায় ওরা, ওর হাতও তত বেশি চলে। যতক্ষণ না রক্তাক্ত শরীর নিয়ে তারা জ্ঞান হারায় ততক্ষণ নির্দয়ভাবে হাত চালিয়ে যায় সে। তারপর অজ্ঞান শরীরটা গাড়িতে তুলে নেয়। পুলিশের লোককে আক্রমণ করার অভিযোগে গ্রেফতার করা হয় তাকে। তবে হাসপাতাল থেকে ছাড়া না পাওয়া পর্যন্ত বিচার স্থগিত রাখতে হয়।
থানার সার্জেন্টকে যথেষ্ট শ্রদ্ধা করে না নেরি, তাই তাকে বদলি করে দেয়া হলো। ইউনাইটেড নেশন-এর বাড়িটা তার আওতাধীন নতুন এলাকার মধ্যে পড়ে। ইউনাইটেড নেশনস্-এর কর্মচারীদের রয়েছে রাষ্ট্রদূতদের সমান স্বাধীনতা। আইনের ধার ধারে না তারা, যেখানে ইচ্ছা গাড়ি পার্ক করে যানবাহন চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি করে। কয়েকদিন ব্যাপারটা লক্ষ করল নেরি, তারপর থানায় রিপোর্ট করল। পরিষ্কার জানিয়ে দেয়া হলো তাকে, এ নিয়ে সে যেন পানি ঘোলা না করে, স্রেফ চোখ বুজে থাকতে হবে তাকে।
