অবশ্যই। আজ থেকে এক হপ্তা পর। কোথায় জানো? ব্রুকলিনে। টেসিওর জায়গায়, যেখানে আমি সম্পূর্ণ নিরাপদ। আবার মান একটু হাসি খেলে গেল। মাইকেলের ঠোঁটে।
এই কদিন সাবধানে থেকো, বলল হেগেন!
এই প্রথম মাইকেলের আচরণে ঠাণ্ডা একটা ভাব লক্ষ করা গেল। স্থির দৃষ্টিতে হেগেনের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, এ ধরনের পরামর্শের জন্যে কনসিলিয়রির দরকার হয় না আমার।
.
সাবধানতা অবলম্বন কাকে বলে হেগেনকে তা দেখিয়ে দিল মাইকেল। পুরোটা হপ্তা উঠানের বাইরে একবারও পা ফেলল না ও। পাশে নেরি না থাকলে কারও সাথেই দেখা করল না। এর মধ্যে একটা মাত্র জটিলতার উদ্ভব হলো, অনিচ্ছাসত্বেও ব্যাপারটা মেনে নিতে হলো মাইকেলকে। কনির বড় ছেলে ব্যাপটাইজড হবে, সেজন্যে একটা অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। অনুরোধ করা হলো, ছেলেটার গড় ফাদার হতে হবে মাইকেলকে। অনুরোধটা এল কে-র তরফ থেকে। তবু প্রথমে সেটা প্রত্যাখ্যানই করল মাইকেল।
তোমার কাছ থেকে কখনও কিছু চাইনি আমি, বলল কে, শুধু আমার মুখ চেয়ে এই অনুরোধটা রাখো তুমি, লক্ষ্মীটি। বড় আশা করে আছে কনি। কার্লোও ধরেছে আমাকে। ব্যাপারটাকে সাতিক গুরুত্ব দিচ্ছে ওরা। প্লীজ, মাইক!
অনুরোধ তো করুল কে, কিন্তু মাইকেলের চেহারায় বিরক্তি ফুটে উঠতে দেখে ভয় হলো, কথাটা বোধহয় রাখবে না সে। কিন্তু মাইকেল যখন মাথা নেড়ে রাজী হয়ে গেল, একটু অবাকই হলো সে।
ঠিক আছে, বলল মাইকেল, কিন্তু উঠানের বাইরে যেতে পারব না আমি। ওদেরকে বলে দাও, পাদ্রীকে বাড়িতে ডেকে এখানেই যেন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করে। খরচ যা লাগে, আমি দেব। গির্জার লোকেরা ব্যাপারটা নিয়ে ঝামেলা করতে পার, কিন্তু ওদেরকে বলে দাও, হেগেন ওসব ঠিক সামলে নেবে।
বার্জিনির সাথে আগামীকাল বৈঠকে বসবে। মাইকেল, কনি আর কার্লোর। ছেলের গির্জায় আস্থাবান হবার অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা হয়েছে আজ। ভাগ্নেকে অসম্ভব দামী সোনার একটা হাতঘড়ি উপহার দিল মাইকেল। ছোটখাট একটা প্রীতিভোজের আয়োজন করা হয়েছে কার্লোর বাড়িতে। দাওয়াত পেল ক্যাপোরেজিমিরী, হেগেন, ল্যাম্পনি, ডনের বিধবা স্ত্রী এবং উঠানের অন্যান্য বাসিন্দারা। আনুষ্ঠানিকভাবে ওদের ছেলের গড ফাদার হলো মাইকেল।
সবাই খুব খুশি। আবেগে একেবারে অভিভূত হয়ে পড়েছে কনি কর্লিয়নি। সারাটা সন্ধ্যা ভাই আর ভাবীকে জড়িয়ে ধরে চুমো খেয়ে দুজনকেই অস্থির করে তুলল সে। এমন কি লোকেও ভাবাবেগে আপ্লুত হতে দেখা গেল, সুযোগ পেলেই ওদের সেকেলে নিয়মে মাইকেলের হাত ধরে ঝাঁকিয়ে দিয়ে ওকে গড ফাদার বলে সোধন করছে সে।
মাইকেলের মধ্যেও আশ্চর্য একটা পরিবর্তন লক্ষ করছে সবাই। আজকের মত মিত্তক আর অমায়িক বলে এর আগে কখনও মনে হয়নি তাকে।
ফিসফিস করে ভাবীকে বলল কনি, আজ বোঝা গেল, কার্লোর সাথে খুব সদ্ভাব হবে মাইকের। দেখো, এই আমি বলছি, দুজন দুজনের প্রাণের বন্ধু হয়ে উঠবে। এ-ধরনের এক একটা উপলক্ষ থেকেই তো মানুষের সাথে মানুষের ভাব
ননদের হাতে একটু চাপ দিয়ে বলল কে, কি খুশিই যে হয়েছি আমি।
৪.১১ আলবার্ট নেরির পরিচয়
১১.
আলবার্ট নেরির পরিচয়।
স্কুলে পড়ে মেয়েটা, নাম রিটা। অসম্ভব লাজুক চেহারা, কুচকুচে কার্লো চুল, অত্যন্ত গোঁড়া ইতালীয় পরিবারের মেয়ে। রাত দশটার পর মেয়েকে আর বাইরে থাকতে দেয় না বাপ-মা। মেয়েটার সরুলতা, সততা, মিষ্টি চেহারার কোমলতা আর কার্লো চুল–এক সাথে সবগুলোর প্রেমে পড়ে গেল অ্যালবার্ট নেরি। সবেমাত্র পুলিশে ঢুকেছে সে। কিন্তু বিয়ে করতে দেরি করল না।
প্রথম দিকে স্বামীর প্রেমে রিটাও পড়ল। নেরির গায়ের জোর দেখে আশ্চর্য হয়ে যায় সে। লক্ষ করে, স্বামীর এই গায়ের জোর আর ন্যায়-অন্যায় বোধের জন্যে লোকে তাকে যমের মত ভয় করে। বিয়ের কিছুদিনের মধ্যে আরও আবিষ্কার করল রিটা, কারও মন জুগিয়ে চলার ধার দিয়েও যায় না নেরি। কারও সাথে যদি মতের মিল না হয়, হয় বোবার মত চুপ করে থাকে সে, নাহয় ভীষণ কর্কশ ভঙ্গিতে প্রতিবাদ জানায়। নরমভাবে সম্মতি জানাবার পাত্র সে নয়। আর সব লোকের মেজাজের সাথে ওর মেজাজের তুলনা হয় না। চণ্ডালের মত রাগ তার, খাঁটি সিসিলির জিনিস। তবে রিটার সাথে কখনও রাগারাগি করে না সে। স্ত্রীকে প্রাণ দিয়ে ভালবাসে, যথেষ্ট সমীহ করে চলে তাকে।
পাঁচ বছরের মধ্যে নিউ ইয়র্ক শহরের সবচেয়ে রগচটা পুলিশ হিসেবে খ্যাতি অর্জন করল নেরি। লোকে তাকে উকট বিপদ ধরে নিয়ে সাঙ্ঘাতিক ভয় করে। শুধু তাই নয়, নেরির মত সৎ, আদর্শ পুলিশ কর্মচারী নিউ ইয়র্কে আর একটাও খুঁজে পাওয়া যাবে না। কিন্তু ওকে নিয়ে অসুবিধেটা হলো, আইন প্রয়োগ করার নিজস্ব একটা নিয়ম মেনে চলে ও। গুণ্ডা ছোকরাগুলোকে দুচোখে দেখতে পারে না। রাতের বেলা রাস্তার মোড়ে পথচারীদের ওপর ছোকরাগুলো অত্যাচার করে, কিন্তু নেরির চোখে তা একবার পড়লে হয়, সাথে সাথে হিংস্র বাঘের মত তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে সে। একবার যদি তার হাতে ধরা পড়ে যায় কেউ, বেচারার রেহাই নেই। তবে, প্রথমবার সবাইকেই সাবধান করে দেয় নেরি। সেই প্রথম এবং শেষ সতর্কবাণী কেউ যদি কানে না তোলে, তাহলেই বিপদ। গায়ে অসাধারণ শক্তি রাখে নেরি, তার এই আসুরিক শক্তি সম্পর্কে নিজেরও পরিষ্কার ধারণা নেই তার।
