কনসিলিয়রি হলো ভনের দ্বিতীয় মগজ। সে ডনের ডান হাত হিসেবে কাজ করে, ডনকে বুদ্ধি পরামর্শ যোগান দেয়। ডনের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সঙ্গী, অন্তরঙ্গ সুহৃদ বলতে কনসিলিয়রিকেই বোঝায়। গুরুত্বপূর্ণ যাত্রায় সে ডনের গাড়ি চালায়। জরুরী বৈঠক চলাকালে সেই খাবার, পানীয়, নতুন চুরুট হাতের কাছে এগিয়ে দেয়।
কোন বিষয়ে ডন যতটা জানেন, কনসিলিয়রি ততটা না জানলেও, তাঁর কাছাকাছি জানে। কোন শক্তির উৎস কোথায়, রহস্য কি সব সে বোঝে। ডনের ক্ষতি করার সাধ্য দুনিয়ায় যদি কারও থাকে, তো সে এই কনসিলিয়রির। অবশ্য আজ পর্যন্ত কোন কনসিলিয়রি তার ডনের সাথে বেঈমানী করেছে বলে শোনা যায়নি। বিশ্বাসঘাতকতা করার কথা কনসিলিয়রিদের মনে কখনও স্থান না পাবার যথেষ্ট কারণও রয়েছে। বিশ্বাস রক্ষা করলে কনসিলিয়রি পার্থিব জগতের সমস্ত লোভনীয় উপকরণই হাতের মুঠোয় পেয়ে থাকে। অঢেল টাকা, অগাধ ক্ষমতা, দুষ্প্রাপ্য মর্যাদা-সবই সে পাবে।
ঝুঁকি যেমন আছে, তেমনি আছে নিরাপত্তার নিশ্চিত আয়োজন। তেমন দুর্ঘটনা যদি কখনও ঘটে, সে বেঁচে থাকতে তার স্ত্রী তথা পরিবার যে আরাম আয়েশ এবং সচ্ছলতার মধ্যে দিন কাটায়, সে মরে গেলেও তেমনি ভাবে বাকি জীবন কাটাতে পারবে। তার অনুপস্থিতিতে তাদের আশ্রয় এবং যত্নের মধ্যে কোন হেরফের হবে না। শর্ত একটাই: তাকে মৃত্যুর পূর্বক্ষণ পর্যন্ত বিশ্বাস রক্ষা করে চলতে হবে।
ক্ষেত্র বিশেষে প্রকাশ্যে এবং সরাসরি ডনের প্রভাব প্রয়োগ করার জন্যে, প্রতিনিধিত্ব করতে হয় কনসিলিয়রিকে, কিন্তু তাকে কোন অবস্থাতেই ব্যাপারটার সাথে জড়ানো চলে না। সেই রকম একটা উদ্দেশ্য নিয়েই প্লেনে চড়ে আজ ক্যালিফোর্নিয়া যাচ্ছে হেগেন। কনসিলিয়রি হিসেবে তার ভবিষ্যৎ কেমন হবে তা নির্ভর করছে হাতের এই কাজটার সাফল্যের উপর এটুকু পরিষ্কার বুঝেছে সে। ডনের পারিবারিক ব্যবসার লাভ-লোকসানের দিক থেকে বিচার করলে ছায়াছবিটিতে জনি ফন্টেন তার শখের অভিনয় করার সুযোগ পেল কি পেল মা তাতে কিছু এসে যায় না। ব্যবসায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে এ ব্যাপারটা নিতান্তই তুচ্ছ, কোন গুরুত্ব বহন করে না। গুরুত্বপূর্ণ হলো আগামী শুক্রবারে ভার্সিল সলোযোর সাথে আলোচনাটা। কিন্তু দুটো ব্যাপারের মধ্যে আকাশপাতাল ব্যবধান থাকলেও, ডনের কাছে একটার চেয়ে আরেকটার গুরুত্ব কোন অংশে কম নয়। এটুকু পরিষ্কার বোঝে বলেই শ্রেষ্ঠ কনসিলিয়রিদের মধ্যে একজন হবার উপযুক্ততা রয়েছে হেগেনের।
টম হেগেনের উদ্বেগ প্লেনের ঝাঁকুনিতে আরও যেন বেড়ে গেল। এয়ার, হোস্টেসকে ডেকে একটা মার্টিনি চাইল সে। প্রযোজক জ্যাক ওলটসের কথা ভাবতে চেষ্টা করছে। লোকটা কি রকম শয়তান তা বোঝাতে চেষ্টার কোন ত্রুটি করেনি জনি ফন্টেন। উনও তাকে কিছু জ্ঞান দান করেছেন। জনির মুখ থেকে সব শোনার পর তার বদ্ধমূল ধারণা জন্মেছে, ওলটসকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে রাজি করানো তার কর্ম নয়। কিন্তু সেই সাথে এ-ও জানে যে জনিকে কথা দিয়েছেন যখন, সে কথা ডন যে কোনভাবেই হোক রক্ষা করবেন। সুতরাং, তার ঘাড়ে মধ্যস্থতা এবং ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব চেপেছে।
ওলটসের ডোশিয়ার তৈরি হতে খুব বেশি দেরি হয়নি। ফাইলটা সাথে করে নিয়েও এসেছে হেগেন। সীটে হেলান দিয়ে সেটার উপর চোখ বুলিয়ে নিচ্ছে সে এখন। প্রথম শ্রেণীর মাত্র তিনজন, প্রযোজকের মধ্যে একজন ওলটস। নিজেরই একটা স্টুডিও আছে তার। কন্ট্রাক্ট সই করিয়ে শয়ে শয়ে তারকাকে সে নিজের পকেটে ভরে রাখে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের সামরিক তথ্য বিষয়ক উপদেষ্টাদের মধ্যে সে একজন। লোকটা প্রায়ই ডিনার খেতে যায় হোয়াইট হাউজে। হলিউডে ওর বাড়িতে অতিথি হিসেবে যারা যান তাদের মধ্যে জে এডগার হুভারের মত স্বনামধন্য ব্যক্তি রয়েছেন। শুনতে এব যতটা ডারিকী আর গুরুতপূর্ণ লাগে, আসলে ব্যাপারটা সেরকম কিছু নয়। বড় বড় লোকদের সাথে তার উঠাবসা আছে ঠিকই, কিন্তু সবই সরকারী সম্পর্ক। সাংঘাতিক প্রতিক্রিয়াশীল লোক, সেজন্যেই রাজনৈতিক ক্ষেত্রে তার প্রভাব বলতে গেলে কিছুই নেই। খুব অহঙ্কারী। উন্মাদের মত নিজের ক্ষমতার অপব্যবহার করতে অভ্যস্ত। ব্যাঙের ছাতার মত। অগুনতি শত্রু গজিয়ে আছে তার চারদিকে, কিন্তু সে-ব্যাপারে লোকটার কোন খেয়ালই নেই।
মনটা দমে গেল হেগেনের। পরিষ্কার বুঝতে পারছে, যুক্তিতে কান দেবার লোক ওলটস নয়। ফাইলটা রেখে দিয়ে ব্রীফকেস থেকে ব্যবসা সংক্রান্ত কাগজপত্র বের করে লেখাপড়ার কাজে মন দিল সে। কিন্তু শরীরটা বেঁকে বসতে চাইছে। খুব ধকল গেছে আজ। আরেকটা মার্টিনি চেয়ে নিল সে। সীটে হেলান দিয়ে চোখ বুজল। নিজের কথা ভাবছে।
কোন খেদ, কোন অপূর্ণতা নেই ওর জীবনে। ভাগ্যটা আশাতীত ভাল। দশ বছর আগে বেছে নেয়া এই কর্ম জীবনটা ওর উপযুক্তই হয়েছে, ওকে বিমুখ করেনি। হিসাব ধরলে সাফল্যের অনেক সিঁড়ির ধাপই সেটপকে আসতে পেরেছে। পরিণত একজন পুরুষের পক্ষে যতটা সুখী হওয়া সম্ভব, তার চেয়ে কম সুখী নয় সে। তার উপর, বর্তমান জীবনটা ওর কাছে সাংঘাতিক রোমাঞ্চকর, বড় চিত্তাকর্ষক।
দীর্ঘদেহী, আমেরিকান স্টাইলে ছোট করে ছাঁটা চুল মাথায়, ছিপের মত একহারা, টম গেহেনের বয়স মাত্র পঁয়ত্রিশ। চেহারায় তেমন কোন বৈশিষ্ট্য নেই। উকিল হিসেবে তিন বছর প্র্যাকটিস করলেও, এখন আর ডনের পারিবারিক ব্যবসার আইনগত দিকটা হাতে-কলমে করতে হয় না তাকে।
