বাগানে পিঁপড়ে খুঁজে বেড়াচ্ছেন ডন। পিঁপড়ে থাকলেই ধরে নিতে হবে, এটেল পোকা ধরেছে, সেগুলোর খোঁজেই এসেছে পিঁপড়েরা। সেক্ষেত্রে পোকা ধ্বংস করার জন্যে পিচকিরি দিয়ে ওষুধ ছড়াতে হবে।
সময় মতই গাছের গোড়ায় পানি দেয়া হলো। এরই মধ্যে তেতে উঠতে শুরু করেছে রোদটা। বিবেচনা, বিবেচনা, মনে মনে ভাবছেন ডন কর্লিয়নি। সব কাজ বিবেচনা করে করতে হয়। আবার নিচ হলেন তিনি। শেষ সারির কয়েকটা গাছকে কাঠিতে তুলে দেয়া হয়নি এখনও, ঠিক করলেন, এটা শেষ করেই ফিরে যাবেন। ঘরে।
অকস্মাৎ হতভম্ব হয়ে গেলেন ডন। তার মনে হলো, হঠাৎ মাথার একেবারে কাছে নেমে এসেছে সূর্যটা, পরমুহূর্তে লক্ষকোটি সোনালী কণা দেখতে পেলেন তিনি, চোখের সামনে নাচছে সেগুলো। বাগানে ঢুকে পড়েছে মাইকেলের বড় ছেলেটা, খিল খিল হাসির শব্দ শুনতে পাচ্ছেন তিনি, ছুটে আসছে দাদুর দিকে। পরমুহূর্তে চোখ ঝলসানো হলুদ আলোয় ঢাকা পড়ে গেল সে। পাকা অভিজ্ঞ মানুষ ডন, তাকে এত সহজে ফাঁকি দেয়া সম্ভব নয়। সবই বুঝতে পারলেন তিনি। ওই ঢোখ-ঝলসানো হলুদ আলোর পিছনে লুকিয়ে আছে পরম শত্ৰু, টের পেয়ে গেলেন তিনি। তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার অপেক্ষায় রয়েছে মৃত্যু।
হাত নেড়ে নাতিকে কাছে আসতে নিষেধ করলেন ডন। আরেকটু দেরি করলে সময় পেতেন না। হঠাৎ হাতুড়ির ঘা পড়ল বুকের ভেতর। মুখ থুবড়ে পড়ে গেলেন তিনি। দম বন্ধ হয়ে আসছে তার।
থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল ছেলেটা, তারপরই ঘুরে দাঁড়িয়ে ছুটল বাপকে ডাকতে। ফটকের কাছে যারা ছিল তাদের সাথে ছুটে এসে মাইকেল দেখল, উপুড় হয়ে শুয়ে মুঠো মুঠো মাটি খাবলাচ্ছেন ডন। ধরাধরি করে বাগান থেকে তুলে নিয়ে এসে শোয়ানো হলো বারান্দায়। বাপের পাশে হাটু গেড়ে বসল মাইকেল, একটা হাত ধরল তার। ইতিমধ্যে ডাক্তার আর অ্যাম্বুলেন্স ডাকার জন্যে লোক পাঠানো হয়ে গেছে।
অনেক কষ্টে, প্রাণপণ চেষ্টায় আরেকবার চোখ মেলে সরাসরি ছোট ছেলের দিকে তাকালেন ডন কর্লিয়নি। লালচে মুখটা নীল হয়ে গেছে তার। মাইকেল বুঝতে পারছে, খুব কষ্ট পাচ্ছেন বাবা। খুব বড় ধরনের হার্ট অ্যাটাক, কি হয় না হয় ভাবতেও ভয় করছে।
কিন্তু ডনের মনে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই। তিনি জানেন, এই তার অন্তিম মুহূর্ত। বাগানের সুগন্ধ ভেসে এল তাঁর নাকে। ফুরফুরে বাতাসে এলোমেলো হয়ে গেল তার পাতলা চুলগুলো। চারদিকে একবার দৃষ্টি বুলিয়ে নিয়ে আবার ছেলের চোখে স্থির হলো তার দৃষ্টি। ফিস ফিস করে তিনি বললেন, আহ, জীবন কি সুন্দর!
মেয়েদের চোখের পানি দেখতে হলো না, তারা গির্জা থেকে ফেরার আগেই মারা গেলেন তিনি। ডাক্তার, অ্যাম্বুলেন্সের জন্যেও অপেক্ষা করলেন না। শেষ সময়ে পাশে শুধু পুরুষরাই ছিল। প্রিয়তম ছোট ছেলের হাত ধরে চোখ বুজলেন ডন কর্লিয়নি।
গাম্ভীর্য আর রাজকীয় আড়ম্বরের সাথে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন হলো। পাঁচ পরিবারের ডন আর তাদের ক্যাপোরেজিমিদের কেউ বাকি থাকল না আসতে। এল টেসিও আর ক্লেমেঞ্জার পরিবার। মাইকেলের নিষেধ সত্ত্বেও অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করে মহান গড ফাদারের প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানাবার জন্যে এল জনি ফন্টেন। বড় বড় হরফে ছাপা হলো সে খবর ট্যাবলয়েড পত্রিকায়। কোন রকম অপপ্রচারের তোয়াক্কা না করেই জনি ফন্টেন ঘোষণা করল, ডন ভিটো কর্লিয়নি তার ধর্মবাপ ছিলেন; অনেক মানুষ দেখেছে সে তার জীবনে, কিন্তু ভিটো কর্লিয়নির মত আর একজনও দেখল না। এমন মহৎ-হৃদয় একজন মহান ব্যক্তির প্রতি শ্রদ্ধা দেখাবার সুযোগ পেয়ে নিজেকে সম্মানিত বোধ করছে সে। একথা স্বীকার করায় কে কি মনে করল না করল তাতে তার কিছুই এসে যায় না।
প্রাচীন প্রথা অনুসারে উঠানে নিশি-পালন অনুষ্ঠান সম্পন্ন হলো। তার জীবনের শ্রেষ্ঠ কাজ দেখাল আমেরিগো বনাসেরা। একজন মা যেভাবে তার মেয়েকে বিয়ের সাজে সাজায়, ঠিক তেমনি যত্ন আর আন্তরিকতার সাথে সে তার পুরানো বন্ধুকে, তার গড ফাদারকে সাজাল। জীবনের সমস্ত ঋণ শোধ করার এই সুযোগ পেয়ে সে মহাখুশি। তার তুলনাহীন দক্ষতা লক্ষ করে সবাই এক বাক্যে স্বীকার করল, মৃত্যুও ডন কর্লিয়নির ললাট থেকে আভিজাত্যের উজ্জলতা আর মহত্বের মহিমা হরণ করতে পারেনি। এসব মন্তব্য শুনে গর্বে আর আশ্চর্য একটা শক্তির উপলব্ধিতে চিত্ত পূর্ণ হয়ে উঠল আমেরিগো বনাসেরার। আর কেউ না জানুক, তার অন্তত জানতে বাকি নেই, মৃত্যুর করাল স্পর্শ কি সর্বনাশ ঘটিয়েছে ডনের চেহারায়।
ডনের মৃত্যু সংবাদ বিদ্যুৎ বেগে ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে পুরানো বন্ধু আর শিষ্য, অনুচর আর ভক্তেরা, যে যেখানে ছিল, ছুটে আসতে শুরু করল। লাস ভেগাস থেকে এল লুসিমানচিনি আর তার স্বামী জুলস সীগল। এল নাজোরিনি, তার স্ত্রী, স্বামীসহ ওদের মেয়ে আর তার ছেলেপুলেরা। এল টম হেগেনের স্ত্রী আর ছেলেমেয়েরা। সান ফ্রান্সিস্কো, লস অ্যাঞ্জেলেস, বস্টন আর ক্লীভল্যাণ্ড থেকে এল ডনেরা। শবাধার বয়ে নিয়ে গেল রকো ল্যাম্পনি আর অ্যালবার্ট নেরি। এদের সাথে, বলা বাহুল্য, ক্লেমেঞ্জা আর টেসিও থাকল, থাকল ডনের দুই ছেলে। মস্ত উঠান আর উঠানের সবগুলো বাড়ি ফুলে ফুলে ভরে গেল।
