এমন একটা ঐতিহাসিক ঘটনার বিবরণ লিপিবদ্ধ করার জন্যে দলে দলে এসে জুটল, সাংবাদিক আর ক্যামেরাম্যানরা। উঠানের প্রকাণ্ড গেটের বাইরে ভিড় জমাল তারা। ছোট একটা ট্রাক দেখা গেল তাদের সাথে। সবাই বুঝল, ওই ট্রাকের ভেতর মুভি ক্যামেরা আছে, অবিস্মরণীয় ঘটনাটাকে জ্যান্ত ধরে রাখার জন্যে চেষ্টা করছে ওরা। নিমন্ত্রণ করা হয়নি এমন কয়েকজন সাংবাদিক চেষ্টার কোন ত্রুটি করল না উঠানের ভেতর ঢোকার। কিন্তু উঠানের সব কটা প্রবেশ পথ আর পঁচিলের চারদিকে হাতে হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে সিকিউরিটি গার্ড। তবে, কোনরকম অসৌজন্য দেখানো হয়নি সাংবাদিকদের সাথে। গলা ভেজাবার জন্যে প্রচুর দামী মদ পাঠিয়ে দেয়া হলো ওদেরকে। কিন্তু ভেতরে কাউকে ঢুকতে দেয়া হলো না। মেহমানরা বেরিয়ে আসার সময় শেষ একটা সুযোগ নিল সাংবাদিকরা, এর তার সাথে কথা বলে কিছু তথ্য আদায় করার চেষ্টা করল, কিন্তু মেহমানরা উত্তর দেয়া তো দূরের কথা, এমন অর্থহীন দৃষ্টিতে তাকাল যেন কেউ কিছু বুঝতে পারছে না, প্রত্যেকে কালা আর বোবা। কেউ নিজের ঠোঁট পর্যন্ত নাড়েনি।
আজকের প্রায় পুরো দিনটাই সেই কোণার লাইব্রেরি রুমে কাটাল মাইকেল, সাথে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ আপনজনেরা রয়েছে। টম হেগেন আর ফ্রেডি মাইকেলকে ছেড়ে বড় একটা বের হলো না কামরা থেকে। সমবেদনা জানাবার জন্যে মেহমানদেরকে নিয়ে আসা হচ্ছে এখানেই সৌজন্যের সাথে সবাইকে অভ্যর্থনা জানাচ্ছে মাইকেন। অনেকেই ওকে গড ফাদার, কেউ কেউ এমন কি ডন বলেও সম্বোধন করছে। ভদ্রতা বজায় রেখে হাসছে মাইকেল। শুধু ওর স্ত্রী কে অ্যাডামস কর্লিয়নির দৃষ্টিতে ধরা পড়ল, সম্বোধনগুলো শুনে অসন্তোষে কঠিন হয়ে উঠছে মাইকেলের মুখের চেহারা।
খানিক পর ওদের সাথে এসে জুটল টেসিও আর ক্লেমেঞ্জা। চেয়ার ছেড়ে উঠে ওদের দুজনকে নিজের হাতে পানীয় ঢেলে দিল মাইকেল ব্যবসা সংক্রান্ত ব্যাপারে হালকা কিছু কথাবার্তা হলো। প্রসঙ্গক্রমে মাইকেল বলল, উঠান আর উঠানের ভেতরের সবগুলো বাড়ি একটা গৃহ নির্মাণ সংস্থার কাছে বেচে দেয়ার সব ব্যবস্থা পাকা হয়ে গেছে। এতে প্রচুর লাভ করছে কর্লিয়নি পরিবার। ডন যে অসাধারণ একটা প্রতিভা ছিলেন, এটা তার আরেক দৃষ্টান্ত।
পরিষ্কার হয়ে গেল কর্লিয়নি পরিবার পশ্চিমে উঠে যাচ্ছে, নিউ ইয়র্কে তাদের সংগঠনই থাকবে না। ডনের অবসর গ্রহণ অথবা মৃত্যুর জন্যে সিদ্ধান্তটা স্থগিত রাখা হয়েছিল এতদিন।
উঠান আর বাড়িগুলো লোকে লোকারণ্য। এর আগে শেষবার এই রকম লোক সমাগম হয়েছিল আজ থেকে দশ বছর আগে। কে যেন বলল, কনি আর কার্লোর বিয়ের পর এক এক করে দশটা বছর কেটে গেছে। জানালার সামনে গিয়ে দাঁড়াল মাইকেল। বাইরে বাগানটা দেখা যাচ্ছে। মনে পড়ছে ওর, আজ থেকে দশ বছর আগে কে-র সাথে ওই বাগানে বসেছিল সে, সেদিন স্বপ্নেও ধারণা করেনি ভাগ্য তাকে এখানে নিয়ে এসে দাঁড় করিয়ে দেবে। কোত্থেকে কোথায় চলে এসেছে সে, ভাবতেও অদ্ভুত লাগে। চোখ বোজার আগে বাবার বলা শেষ কথাটা এখনও কানে কব্জিছে তার। যতদিন বেঁচে থাকবে, ততদিন কানে লেগে থাকবে কথা কটা-আহ, জীবন কি সুন্দর। তারপর মাইকেল স্মরণ করার চেষ্টা করলনা, বাবা কখনও মৃত্যু সম্পর্কে কোন কথা বলেছেন বলে মনে পড়ে না। সাথে সাথে উপলব্ধি করল, মৃত্যুকে অত্যন্ত শ্রদ্ধার চোখে দেখতেন বাবা, তাই সে বিষয়ে তত্ত্বকথা আওড়াতে পারতেন না।
কবরস্থানে যাবার সময় হয়ে এসেছে। মহান ডনকে এবার মাটিতে শোয়াতে হবে। মাইকেলের হাত ধরে তাকে বাগানে বের করে আনল কে। ওদের পিছু পিছু ক্যাপোরেজিমিরা, পিছনে তাদের সৈনিকরা। সৈনিকদের পিছনে দীন-দুঃখী সাধারণ মানুষেরা, যাদের মাথার ওপর সবসময় নিরাপত্তার ছাতা ধরে রাখতেন গড ফাদার, যাদেরকে তিনি আশীর্বাদ করতেন। এদের মধ্যে রয়েছে সেই কটি ওয়ালা নাজোরিনি, রয়েছে সেই বিধবা কলম্বো আর তার ছেলেরা, রয়েছে আরও অগুণতি মানুষ, যারা গড ফাদারের প্রতি আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ, জীবিতকালে কখনও না। কখনও এদের সবার উপকার করেছেন গড ফাদার। এরা সবাই বাস করত তার হেফাজতে, এদের ওপর তার শাসন ছিল কড়, কিন্তু ন্যায্য। এরা ছাড়াও এমন অসংখ্য লোক এসেছে, যারা তার প্রতিপক্ষ দলের প্রতিনিধিত্ব করছে, কিন্তু তারাও আজ তার প্রতি শেষ সম্মান দেখাবার সুযোগটা হাতছাড়া কারেনি।
সবই দেখছে মাইকেল। মুখে একটু আড়ষ্ট, কিন্তু মার্জিত হাসি। তবে কিছুই তাকে প্রভাবিত করতে পারছে না। বাবার সেই শেষ কথাটা ওর সমস্ত অস্তিতে জড়িয়ে গেছে। ভাবছে, কিছুতেই কিছু এসে যায় না, তবু মৃত্যুর সময় আমি যদি বলতে পারি জীবন কি সুন্দর! কথাটা বলে নিজের ওপর বাবার কি প্রচণ্ড আস্থা ছিল। তার দৃষ্টান্ত রেখে গেলেন, সে-ও যদি সেই রকম আস্থার সাথে বলতে পারে, জীবন কি সুন্দর হলে আর কিছুর দরকার হবে না।
তারপর ভাবল, এখন থেকে বাবার অসমাপ্ত কাজ শেষ করার জন্যে তাকে জীবন উৎসর্গ করতে হবে। ঠিক যে পথে এগোচ্ছিলেন বাবা, তাকে সেই পথ অনুসরণ করতে হবে। যত্ন নিতে হবে নিজের ছেলেমেয়েদের, নিজের পরিবারের, নিজের এলাকায়। তবে, এতে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই যে তার ছেলেমেয়েরা অন্য আরেক জগতে মানুষ হবে। ডাক্তার, শিল্পী, বৈজ্ঞানিক, গভর্নর, প্রেসিডেন্ট হবে ওরা। সব হতে পারবে। তাকে শুধু লক্ষ রাখতে হবে যে ওরা যেন মানবজাতির বৃহৎ গোষ্ঠীর বাইরে না পড়ে থাকে।
