মৃদু হেসে ধন্যবাদ জানাল কে। তখুনি মনে মনে ঠিক করে ফেলল এত বড় একটা আনন্দের কথা অবশ্যই জানাতে হবে মাইকেলকে। কর্লিয়নি পরিবারে এসে সে-ও পুরোপুরি সিসিলিয়ান বনে গেছে।
ওই বছরই মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের ফলে মারা গেল নিনো ভ্যালেন্টি। নিনোকে নায়ক করে যে ছবিটা তৈরি করেছে জনি ফন্টেন সেটা মুক্তি পাবার পরপরই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটল, ট্যাবলয়েড পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায় বড় বড় হরফে ছাপা হলো ওর মৃত্যু সংবাদ। সদ্য মুক্তি পাওয়া ছবিটা রাতারাতি অসামান্য জনপ্রিয়তা লাভ করল। সমালোচকরা মুক্তকণ্ঠে স্বীকার করল, নিনোর অভিনয় প্রতিভার তুলনা হয় না। খবরের কাগজগুলো লিখল, বন্ধুর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার সমস্ত দায়িত্ব জনি ফন্টেন নিয়েছে। সমাধিস্থ করার দিন পরিবারের লোকজন আর নিনো ভ্যালেন্টির ঘনিষ্ঠ বন্ধুরা ছাড়া আর কেউ উপস্থিত থাকবে না। এক সাংবাদিক তো বেপরোয়া সাহস দেখিয়ে এতদূর পর্যন্ত দাবি করল যে জনি ফন্টেন নাকি এক সাক্ষাৎকারে তার কাছে স্বীকার করেছে, বন্ধুর মৃত্যুর জন্যে সেই দায়ী। তার উচিত ছিল বন্ধুকে ডাক্তারের হাতে তুলে দেয়া। কিন্তু সাক্ষাৎকারটা এমন চতুর ভাষায় লেখা হয়েছে, জনির কথাগুলো কোন মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় স্পর্শকাতর নিরীহ দর্শকের আত্মগ্লানির মত শোনাচ্ছিল। নিনো ছিল তার বাল্যবন্ধ, সেই বাল্যবন্ধুকে সে শ্রেষ্ঠ তারকা পর্যন্ত বানিয়ে দিয়েছিল–সবই স্বীকার করল, একজন বন্ধুর জন্যে এর বেশি আর কি করা যায়।
ক্যালিফোর্নিয়ায় সমাধিস্থ করা হলো নিনোকে। কর্লিয়নি পরিবারের প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থিত হলো শুধু ফ্রেডি। আর এল লুসি মানচিনি, ডুলস সীগল। ডন কর্লিয়নি নিজে আসতে চেয়েছিলেন, কিন্তু হঠাৎ করে হার্টের অসুখটা বেড়ে গেল, ডাক্তাররা এক মাস বিছানা থেকে নামতে বারণ করায় তার আর আসা হয়নি। প্রকাণ্ড একটা ফুলের রীদ পাঠিয়ে দিয়েছেন তিনি। নেরিও এল পশ্চিমে, সম্ভবত পারিবারিক ব্যবসার নতুন পরিচালক মাইকেল কর্লিয়নির প্রতিনিধি হিসেবে।
সমাধিস্থ করা হয়ে গেল নিনোকে। এর দুদিন পরের ঘটনা। চিত্রতারকা। প্রণয়নীর বাড়ি থেকে বেরুচ্ছে মো গ্রীন, এই সময় কে যেন তাকে গুলি করে মেরে ফেলল। এর প্রায় এক মাস পর আবার নিউ ইয়র্কে দেখা গেল অ্যালবার্ট নেরিকে। ক্যারিবিয়ান সাগরের বেলাভূমিতে দীর্ঘ ছুটি কাটিয়ে এসেছে সে, শরীরটাকে রোদে পুড়িয়ে একেবারে কার্লো করে এনেছে।
মাইকেল কর্লিয়নি তাকে অভ্যর্থনা করল হাসিমুখে। দুএকটা প্রশংসার কথা বলে তাকে জানাল, এখন থেকে নেরি বাড়তি কিছু ভাতা পাবে! ইস্ট সাইডের একটা বুক মেকারের ঘাটির সবটুকু আয়। সবাই জানে, তাও চাট্টিখানি কথা নয়।
অ্যালবার্ট নেরি মহাখুশি। এই রকম একটা জগৎই দরকার তার, যেখানে কর্তব্যপালনের পরিবর্তে মুনাফা পাওয়া যায়। কর্লিয়নি পরিবারের সাথে বসবাস করতে পেরে সন্তুষ্ট সে।
সম্ভাব্য সব ঘটনার জন্য সতর্কতা অবলম্বন করেছে মাইকেল কর্লিয়নি। সবচেয়ে আগে নিশ্চিত, নিচ্ছিদ্র করেছে নিজের নিরাপত্তা। ওর পরিকল্পনাতেও কোন খুঁত নেই কোথাও; ধৈর্য ধরে বসে আছে ও, মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, বছরের পুরোটা সময় প্রস্তুতি নেবে। কিন্তু পুরো একটা বছর কপালে জুটল না ওর। অপ্রত্যাশিতভাবে ভাগ্যই বাধা দিল ওকে। গড ফাদার নিজে, মহান ডন স্বয়ং, পরিকল্পনা রদবদল করতে বাধ্য করলেন মাইকেলকে। ছেলে শর্ত দিয়েছিল, তার পরিকল্পনায় নাক গলাতে পারবেন না তিনি। কিন্তু আশ্চর্য এক চাল চেলে ছেলের পরিকল্পনায় নিজের খানিকটা অবদান রাখলেনই ডন।
৪.০৯ রোববারের রোদ ঝলমলে সকাল
রোববারের রোদ ঝলমলে সকাল। বাড়ির মেয়েরা সবাই গির্জায় গেছে। বাগান করার উর্দি গায়ে চড়ালেন ডন কর্লিয়নি ছাই রঙের ঢিলেঢালা প্যান্ট, রঙ-ওঠা নীল শার্ট, মাথায় বেড়ানো, নোংরা ফিডরা টুপি। টুপিটায় আবার রেশমি ফিতে পরানো রয়েছে
আগের চেয়ে অনেক মোটা হয়ে গেছেন ডন। তার বক্তব্য, টমেটো-লতার যত্ন নেন স্বাস্থ্যের কারণে। কিন্তু আসল কারণটা জানতে আর বাকি নেই কারও।
আসল কারণ বাগান করতে ভালবাসেন তিনি। ভোরে ঘুম থেকে উঠে বাগানে এলে, শরীর এবং মনে আশ্চর্য একটা পবিত্রতা অনুভব করেন। মুহূর্তে ফিরে যান যাট বছর পিছনের জীবনে, সিসিলিতে সেই তাঁর শৈশবে। বাবার বীভৎস মৃত্যু আর শোকের স্মৃতিটুকু সাবধানে মন থেকে সরিয়ে দেন। কিছুক্ষণ সুখ-স্মৃতি রোমন্থন। করেন।
সারি সারি শিম গাছের ডগায় কচি সাদা ফুল ধরেছে, তাদের ঘিরে রেখেছে পেঁয়াজ-গাছের শক্ত সবুজ বোটা। বাগানের এক ধারে মুখ বন্ধ একটা বিরাট পিপে দেখা যাচ্ছে, পিপেটা যেন পাহারা দিচ্ছে বাগানকে। গোবরের সার রয়েছে ওটায়, এর চেয়ে ভাল সার আর হয় না। বাগানের আরেক দিকে কাঠের চার কোণা ফ্রেম বানিয়ে রেখেছেন ডন, তার উপরই লতিয়ে উঠেছে টমেটো গাছগুলো।
পানি দিতে হবে বলে একটু ব্যস্তভাবে আজ বাগানে ঢুকেছেন ডন। রোদটা তেতে ওঠার আগেই পানি দেবার নিয়ম, নাহলে পানি গরম হয়ে গিয়ে লেটুস গাছের কচি পাতাগুলোকে সেদ্ধ করে ফেলে। পানির চেয়ে রোদের আঁচ বেশি, কিন্তু রোদ আর পানি যখন একসাথে মেশে তখন পানির গুরুত্ব বেড়ে যায়। দুটো জিনিসকে মেশাবার সময় সাবধানে বুদ্ধি খরচ করে কাজ না করলে গাছগুলোর সর্বনাশ হয়ে যেতে পারে।
