বিশ্বাস করো, হেসে ফেলে বলল মাইকেল, আমি কল্পনাও করিনি যে তোমার চোখে সব ধরা পড়ে যাবে।
সান্তনা দেয়া হচ্ছে তাকে, বুঝতে পেরে একটা দীর্ঘশ্বাস চাপল হেগেন। মাইকেলের দিকে তাকাল সে। বল, ভেবে দেখো, আমি হয়তো কোন সাহায্যে আসতে পারি।
দৃঢ় ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল মাইকেল। না, টম, বলল ও, তোমাকে বাদ দেয়া হয়েছে।
নিঃশব্দে হুইস্কিটুকু শেষ করল হেগেন। তারপর বিদায় নেবার জন্যে উঠে দাঁড়াল। যাবার আগে নরম গলায়, কিন্তু ক্ষীণ বিপের সুরে বলল, তুমি প্রায় তোমার বাবার মতই কৌশলী হয়ে উঠেছ, মাইকেল। কিন্তু একটা বিষয় শিখতে এখনও বাকি আছে তোমার।
কি সেটা? ভদ্রতার খাতিরে জানতে চাইল মাইকেল।
কিভাবে না বলতে হয়।
গম্ভীর হয়ে উঠল মাইকেল। তারপর মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, ঠিকই ধরেছ। কথাটা মনে রাখব আমি।
চলে গেল হেগেন। রসিকতার ছলে বাবাকে প্রশ্ন করল মাইকেল, সবই তাহলে আমাকে শিখিয়েছ তুমি, শুধু একটা ছাড়া? এবার শেখাও, কিভাবে না বললে খুশি হয় মানুষ?
ডন উঠে গিয়ে তার মস্ত ডেস্কের পিছনে, রিভলভিং চেয়ারটায় আরাম করে বসলেন। গোপন মন্ত্রটা হলো, যাদেরকে তুমি ভালবাস, তাদেরকে না বলা যায় না, অন্তত বারবার নয়। তবু যদি উপায় না থাকে, না বলতেই হয়, সেক্ষেত্রে নিয়ম হলো, কথাটা এমন ভাবে বলবে তুমি তে যেন সেটা হা এর মত লাগে। অথবা তাকে দিয়ে না-টি বলিয়ে নিতে হয়। কাজটা অপ্রীতিকর, তাই একটু সময় নিতে হয়, বেশ একটু কষ্ট স্বীকার করতে হয়। কিন্তু আমি সেকেলে মানুষ, তোমরা নতুন যুগের নতুন মানুষ, আমার কথায় কান দিয়ো না।
হাসল মাইকেল। বলল, ঠিক। কিন্তু টমকে বাদ দেয়ার ব্যাপারে তুমি আমাকে সমর্থন করছ তো?
ওকে কোনভাবেই এর মধো জড়ানো চলে না, মাথা নেড়ে বললেন ডন।
এবার তোমাকে একটা কথা বলতে চাই আমি, মৃদু কণ্ঠে বলল মাইকেল। কথাটা জানাবার সময় হয়েছে তোমাকে। যা করতে যাচ্ছি, তা বধু অ্যাপলোনিয়া আর সনির বদলা নেবার জন্যে নয়। কাজটা করাই উচিত। বার্জিনিদের সম্পর্কে টেসিওর কথাটাই ঠিক।
উপর নিচে মাথা দোলালেন ডন। ঠাণ্ডা হলে প্রতিশোধ জিনিসটা মিঠে হয়। শান্তি না করলে তুমি জীবিত অবস্থায় বাড়ি ফিরে আসতে পারবে না, এটা আমি জানতাম। সেজন্যেই তো শান্তি চুক্তি করতে হলো। কিন্তু তারপরও বাৰ্জিনিরা চেষ্টা করুল দেখে সত্যি অবাক হয়ে গেছি আমি। সম্ভবত শান্তি চুক্তির আগেই তোমাকে সরাবার একটা ব্যবস্থা করা হয়ে গিয়েছিল, পরে সেটাকে আর সময় পায়নি রদ করার। তোমাকেই ওরা মারতে চেয়েছিল, ডন টমাসিনোকে নয়–ঠিক জানো তো?
ভাবটা ওই কমই দেখাতে চেয়েছিল। যেন ডন টমাসিনোকেই মারতে চেয়েছে ওরা, বলল মাইকেল। মোট কথা ওদের তরফ থেকে কোন খুঁত ছিল না কাজে। আমি মারা গেলে তুমি পর্যন্ত টের পেতে না বা সন্দেহ করতে না। কিন্তু আমি বেঁচে যাওয়ায় সব ভেস্তে গেল ওদের। আমি নিজের চোখে পালিয়ে যেতে দেখেছি ফ্যাৱিষযিয়োকে।
রাখালটার খবর পেয়েছে ওরা? জানতে চাইলেন ডন।
আমি পেয়েছি, বলল মাইকেল। বছরখানেক আগে। নতুন নাম নিয়েছে, জাল পাসপোর্ট, ভুয়া পরিচয়। চুটিয়ে ব্যবসা করছে ফ্যাব্রিযযিয়ো।
নিঃশব্দে উপরে-নিচে মাথা দোলালেন ডন। খানিক পর বললেন, তাহলে আর অপেক্ষা করার দরকার নেই। কবে রওনা হবে তুমি?
তোমাদের বউমার ডেলিভারি না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে চাই, বলল মাইকেল। কিন্তু তার আগেই টমকে আমি ভেগাসে গুছিয়ে বসা অবস্থায় দেখতে চাই। গোলমাল যদি কিছু ঘটেই, তার সাথে যেন ওর কোন সম্পর্ক না থাকে। এখন থেকে এক বছর পর, ধরো।
ধীরে ধীরে মুখ ফিরিয়ে নিলেন ডন কর্লিয়নি। সাদা দেয়ালের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে মৃদু গলায় জানতে চাইলেন, কিভাবে কি করবে সব ঠিক করেছ?
কিন্তু এর মধ্যে তুমি থাকবে না, নরম সুরে বলল মাইকেল। যা ঘটবে তাতে তোমার কোন দায়-দায়িত্ব থাকবে না। সমস্ত দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিচ্ছি আমি। এমন কি ভেটো দেবারও অধিকার পাচ্ছ না তুমি। অন্তত এই ব্যাপারে তা যদি করতে চাও, পরিবার ছেড়ে বেরিয়ে চলে যাব আমি। এর মধ্যে তোমার কোন ভূমিকা থাকবে না।
অনেকক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে থাকলেন ডন কর্লিয়নি। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, বেশ, তবে তাই হোক। বোধহয় সেজন্যেই অবসর নিয়েছি আমি, সে জন্যেই স্ব দায়িত্ব ছেড়ে দিয়েছি তোমার হাতে। একটা জীবনে যা যা করণীয় ছিল আমার, তার সবগুলো করেছি। অতিরিক্ত আরও কিছু দায়িত্ব এখনও হয়তো কাঁধে নিতে পারি, কিন্তু এখন আর সে মন নেই। তাছাড়া, মুহূর্তের জন্যে অন্যমনস্ক হয়ে উঠে আবার প্রসঙ্গে ফিরে এলেন তিনি, এমন কিছু কর্তব্যও থাকে যেগুলোর ভার মানব-শ্রেষ্ঠও নিতে পারে না! বেশ। তবে তাই হোক।
.
বছর শেষ হবার আগেই কে অ্যাডামস্ কর্লিয়নি তার দ্বিতীয় সন্তানের জন্ম দিল। এটাও পুত্রসন্তান। খুব সহজেই প্রসব করে কে, গোলমাল হয় না। হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরলে রাজেন্দ্রাণীর মত অভ্যর্থনা করা হলো তাকে।
খোকার পরার জন্যে সুন্দর এক সেট কাপড় দিয়েছে কনি কর্লিয়নি। কাপড়গুলো রেশমের, সেলাই করা হয়েছে ইটালিতে। খুবই দামী জিনিস কনি তার ভাইবউকে জানাল, অনেক খুঁজেপেতে বের করেছে ওগুলো কার্লো।তোমার ছেলের জন্যে অসাধারণ একটা উপহার চাই, তাই সমস্ত নিউ ইয়র্ক টুডে এটা আবিষ্কার করেছে ও! আমার চোখে তো ভাল জিনিস পড়লই না।
