ভয়ঙ্কর দুঃস্বপ্ন দেখেছে আমেরিগো বনাসেরা। দেখেছে ডন কর্লিয়নিকে। কার্নিস ভোলা টুপি, ওভার অল আর দস্তানা পরে আছেন তিনি। তার দোকানের সামনেই কয়েকটা লাশ নামাচ্ছেন তিনি, সব কটা বুলেটে ঝাঁঝরা। চোখ পাকিয়ে বলছেন, খবরদার, টু-শব্দটি নয়। তাড়াতাড়ি মাটিতে পুঁতে দাও লাশগুলো।
ঘুমের মধ্যে ভয় পেয়ে গোঙাচ্ছে বনাসেরা। কেমন মানুষ গো তুমি, একপেট বিয়ে খেয়ে এসে দুঃস্বপ্ন দেখো। তার স্ত্রী ধাক্কা দিয়ে বনাসেরার ঘুম ভাঙিয়ে দিয়ে বলল।
নিউ ইয়র্ক সিটির হোটেলে কে অ্যাডামসকে পৌঁছে দিতে যাচ্ছে ক্লেমেঞ্জা আর পলি গাটো। প্রকাণ্ড গাড়িটা চালাচ্ছে গাটো। সম্মান দেখিয়ে সামনের বাকি.সীটটায় কে অ্যাডামসকে বসতে দিয়ে পিছনে বসেছে ক্লেমেঞ্জা। কে অ্যাডামসের দৃষ্টিতে এরা দুজনেই সাংঘাতিক রোমাঞ্চকর চরিত্র। ব্রুকলিনের কথা খইয়ের মত ফুটছে ওদের মুখে। ওকে অতিরিক্ত সমীহ দেখাচ্ছে। দুএক কথায় গল্প জমে উঠল। মাইকেলের প্রতি ওদের দ্বিধাহীন স্নেহ আর অপার শ্রদ্ধা প্রকাশ পেতে দেখে বিস্মিত হলো কে। বিস্ময়ের কারণ, মাইকেলের কাছ থেকে শুনে অনেকদিন থেকেই তার ধারণা বাপের বাড়িতে সে একজন বহিরাগতের মত। কিন্তু ক্লেমেঞ্জা ঠিক তার উল্টো কথা বলছে। ডন কর্লিয়নি নাকি মনে করেন তার ছেলেদের মধ্যে সবার সেরা মাইকেল। পারিবারিক ব্যবসার হাল নাকি তাকেই ধরতে হবে ভবিষ্যতে।
সেটা কিসের ব্যবসা? জানতে চাইল কে।
স্টিয়ারিং হুইল ঘোরাচ্ছে পলি গাটো, চট করে কে-র দিকে তাকাল, একবার সে।
মাইক জানায়নি? ব্যাক সীট থেকে আশ্চর্য হয়ে বলল ক্লেমেঞ্জা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় ইটালিয়ান জলপাই তেলের আমদানীকারক উনি, ডন কর্লিয়নি। যুদ্ধ থেমেছে, ওদের ব্যবসা এখন-ফেঁপে উঠবে। ব্যবসাতে এখন মাইকের মত মেধাবী ছেলেরই দরকার।
হোটেলে পৌঁছে দরকার নেই বলা সত্ত্বেও জোর করে ভেস্ক পর্যন্ত এল কেমো। কে-র আপত্তির উত্তরে সে জানাল, কর্তার নির্দেশ আপনি নিরাপদে পৌঁছলেন কিনা দেখে যেতে হবে। সুতরাং দেখে যেতেই হবে।
কে-কে এলিভেটর পর্যন্ত পৌঁছে দিল ক্লেমেঞ্জা। প্রসন্ন হেসে বিদায় দিল তাকে। তারপর ফিরে এসে হাতের সবুজ কাগজের লিটা ডেস্কের উপর দিয়ে ক্লার্কের দিকে গড়িয়ে দিয়ে জানতে চাইল, কার নামে রুম ভাড়া নিয়েছেন উনি?
গোল পাকানো টাকাটা তাড়াতাড়ি কুড়িয়ে পকেটে চালান করে দিল ক্লার্ক। বলল, মি. এবং মিসেস মাইকেল কর্লিয়নি।
গাড়িতে ফিরে এল ক্লেমেঞ্জা। পলি গাটো বলল, বেশ ভাল মেয়ে।
মাইক ওর সাথে শোয়, হেড়ে গলায় বলল কুমো। এসব ব্যাপার নিয়ে মাথা ঘামাবার দরকার নেই। হেগেন একটা কাজ দিচ্ছে, তাড়াতাড়ি সারতে হবে সেটা। খুব সকালে ঘুম ভাঙিয়ে দিয়ো আমার।
.
টম হেগেনের নানান কাজের ঝামেলা চুকতে অনেক দেরি হয়ে গেল। স্ত্রীকে চুমো খেয়ে বিদায় নিয়ে এয়ারপোর্টের দিকে ছুটল সে, তখন অনেক রাত। পেন্টাগনের একজন স্টাফ জেনারেল অফিসার তার কৃতজ্ঞতার নমুনা হিসেবে যে টপ প্রায়োরিটি ইমার্জেন্সী ছাড়পত্রটি দিয়েছিল তাকে সেটি সাথে থাকায় লস এঞ্জেলেসের বিমানে সীট পেতে মোটেও বেগ পেতে হলো না।
দিনটা ক্লান্তিকর, কিন্তু ফলপ্রসূ বটে, ভাবছে হেগেন। গেনকো আবানদাণ্ডো মারা গেছে, ভোর তিনটেয়। হাসপাতাল থেকে ফিরেই ডন কর্লিয়নি তাকে জানিয়েছেন যে আজ থেকে পরিবারের অফিশিয়াল কনসিলিয়রি সে-ই। অফিশিয়াল অর্থাৎ স্থায়ী মন্ত্রণাদাতা পদটি পাওয়ার তাৎপর্য হলো হেগেন নিঃসন্দেহে এবার অগাধ ধন সম্পদের মালিক বনে যাবে, তার ক্ষমতার পরিধিও সেই সাথে অনেক বড় হবে।
এক্ষেত্রে একটা অতি পুরাতন এবং প্রতিষ্ঠিত প্রচলিত রীতি লঙ্ঘন করলেন ডন কর্লিয়নি। খাট একজন সিসিলীয় ছাড়া আজ পর্যন্ত কনসিলিয়রির মত এত বড় পদ আর কাউকে দেয়া হয়নি। ডন কর্লিয়নির পরিবারে টম হৈগেনও একজন হয়ে উঠেছে, কিন্তু সেটাই সব নয়। প্রশ্নটা রক্ত নিয়ে। প্রচলিত বিশ্বাস হলো যন্ত্রণাদাতার মত সাংঘাতিক গুরুপূর্ণ পদের জন্যে শুধুমাত্র একজন সিসিলীয়কেই বিশ্বাস করা যেতে পারে, তার কারণ, ওমোর, অর্থাৎ মুখ বন্ধ রাখার নিয়ম শুধু তারই জানা থাকে।
বাড়ির কর্তা ডন কর্লিয়নি দ্বার উপরে আছেন, সমস্ত সিদ্ধান্ত ও নির্দেশ আসে তাঁর কাছ থেকেই। অনেক নিচের স্তরে একদল লোক রয়েছে তারা ডনের আদেশ বাস্তবায়িত করার জন্যে হাতে কলমে কাজ করে। এই দুই প্রান্তের মাঝখানে রয়েছে তিনটে স্তর, এই স্তরগুলোয় কর্মীরা সব সময় মিডিয়া হিসেবে থাকে। এর সুবিধের দিকটা হলো, কোন কাজের সূত্র ধরে উপরের প্রান্ত পর্যন্ত কখনোই পৌঁছানো সম্ভব নয়। সম্ভব, যদি কনসিলিয়রি বেঈমানী করে।
বনাসেরার মেয়েকে যারা মেরেছে তাদেরকে কি সাজা দেয়া হবে তার বিস্তারিত বিধান দিয়েছেন ডন, কিন্তু আদেশটি তিনি কারও সামনে দেননি। হেগেনও তৃতীয় কারও অনুপস্থিতিতে আদেশটা জানিয়েছিল ক্লেমেঞ্জাকে। ক্লেমেঞ্জ কাজটা সারতে বলল পলি গাটোকে।
পলি গাটো এবার লোক সংগ্রহ করবে। এ কাজ কেন করতে বলা হলো, গোড়ায় কে আদেশটা দিয়েছে, এসব সে বা তার লোকেরা জানবে না। কোন কাজের জন্যে ডন কর্লিয়নিকে যদি জড়াতে হয়, প্রত্যেক স্তরের কর্মীকে অর্থাৎ শিকলের প্রতিটি গিটকে, বেঈমানী করতে হবে। মাফিয়া পরিবারগুলোর দীর্ঘ ইতিহাসে এমন ঘটনা কখনও ঘটেনি, কিন্তু তার মানে এই নয় যে এ-ধরনের কিছু ঘটতে পারে না। ঘটার সম্ভাবনা সব সময়ই আছে। সেই মহামারীর সঠিক ওষুধটিও সবার জানা, শিকলের মাত্র একটা গিটকে কেটে বাদ দিলেই বিপদ শেষ।
