অবশ্য সর্বনাশ যা হবার তা আগেই হয়ে গিয়েছিল। কর্লিয়নিদের সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্য সনির মৃত্যু। নিউ ইয়র্কের পাঁচ পরিবারের মধ্যে এমন কেউ ছিল না যে ভয় করত না সনিকে। ভয়ঙ্কর একটা প্রাকৃতিক শক্তি বলে মনে করত সবাই তাকে, তাচ্ছিল্য করার সাহস পেত না। তবে, এ-কথা ঠিক, ড্রাগস ব্যবসায়ী সলোযো আর পুলিশ ক্যাপটেন ম্যাকক্কাস্কিকে খতম করার জন্যে ছোট ভাই মাইকেলকে পাঠিয়ে বোকার মত একটা কাজ করেছিল সে। তখনকার পরিস্থিতিতে ওটা একটা প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত বলে মনে হলেও দূরদর্শী পরিকল্পনার দিক থেকে ওটা ছিল একটা গুরুতর ভুল। সনি এই ভূল না করলে রোগশয্যা থেকে উঠে আসতে হত না ডন কর্লিয়নিকে। তাছাড়া, দীর্ঘ দুবছরের অভিজ্ঞতা আর বাপের কাছ থেকে হাতে কলমে শিক্ষা পাওয়ার সুযোগ, এই দুটো জিনিস থেকে বঞ্চিত হতে হত না মাইকেলকে! শুধু সনি নয়, অনেক আগে এরচেয়েও অনেক বড় একটা ভুল করেছিলেন ডন নিজে। এটাই তার জীবনের একমাত্র ভুল। একজন আইরিশ লোককে কনসিলিয়রির পদে বসানো উচিত হয়নি তাঁর। ধৃর্তামি বা চাতুর্যের দিক থেকে কোন আইরিশের সাধ্য কি একজন সিসিলিয়র সমান হয়। অন্তত আর সব পরিবারগুলো তাই বিশ্বাস করত, ফলে কর্লিয়নিদের চেয়ে বার্জিনি-টাটাগ্লিয়াদেরকেই বেশি তোয়াজ করে আসছিল তারা। আর মাইকেল কর্লিয়নি সম্পর্কে ওদের ধারণা। হলো, প্রাণ চাঞ্চল্য আর শক্তির দিক থেকে সনির সাথে ওর তুলনাই হয় না। সনি ছিল ভয়ঙ্কর, তার ভয়াবহতা মাইকেলের মধ্যে কোনদিনই দেখা যাবে না। তবে, মাইকেলের বুদ্ধিসুদ্ধি বেশি, তাও বাপের সমান নয়। কর্লিয়নি পরিবারের উত্তরাধিকারী হিসেবে মাইকেল মোটামুটি মাঝারি মানের। ওকে তেমন ভয় না করলেও চলবে।
শক্তি তো কমেছেই, সেই সাথে আরও একটা কারণে কর্লিয়নিদের সম্মানও কমে গেছে বেশ খানিকটা। ডন শান্তি চুক্তি করায় সবাই তাকে দুর্বল ভাবল। তার কূটনীতিকে শ্রদ্ধা করলেও, ছেলের মৃত্যুর প্রতিশোধ নিলেন না বলে এদের রাজ্যে কর্লিয়নিদের মর্যাদা একেবারে ধুলোয় লুটিয়ে পড়ল। সবাই বিশ্বাস করুল, ডনের এ ধরনের কূটনীতির মূল কারণ দুর্বলতা।
আজ যারা ডন কর্লিয়মির লাইব্রেরিতে জড়ো হয়েছে তারা সবাই এসব ব্যাপার বিশদভাবে জানে। শুধু তাই নয়, এদের মধ্যে কেউ কেউ হয়তো সে-সব বিশ্বাসও করে।
মাইকেলকে কার্লো যে অপছন্দ করে তা নয়, কিন্তু কেমন যেন ভয় করে। অবশ্য সনিকে যেমন ভয় করত, মাইকেলকে তার একশো ভাগের এক ভাগও ভয় করে না। এ-কথা ক্লেমেঞ্জার বেলাতেও খাটে। সলোযো আর পুলিশ ক্যাপটেন ম্যাকক্লাস্কিকে খুন করার সময় মাইকেল যে বাহাদুরি দেখিয়েছিল, ক্লেমেঞ্জা সেটার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করলেও, তার ধারণা ডন হবার জন্যে যে কঠোর মনোভাব দরকার, তা মাইকেলের নেই। ওর মনটা বড় নরম! অনেকদিন থেকেই আশা করে আছে ক্লেমেঞ্জা, অনাদা ভাবে নিজের পরিবার প্রতিষ্ঠা করার অধিকার দেয়া হবে। তাকে। কিছুদিন আগে তার সেই আশাটা আরও বেড়ে উঠেছিল। নিজের সামাজ্য কিভাবে গড়ে তুলবে সে-সম্পর্কে নানা পরিকল্পনা নিয়ে মাথা ঘামাতে শুরু করেছিল সে। কিন্তু কিভাবে যেন সেটা টের পেয়ে গেলেন ডন কর্লিয়নি, তাই আভাসে ইঙ্গিতে জানিয়ে দিলেন, তা হবার নয়। অপরদিকে, গড ফাদারকে এত বেশি শ্রদ্ধা ভক্তি করে ক্লেমেঞ্জা যে তার ইচ্ছের বিরুদ্ধে কিছু করার কথা ভাবতে পর্যন্ত পারে না সে।
যদি না গোটা পরিস্থিতিটা একেবারে অসহ্য হয়ে ওঠে।
মাইকেল সম্পর্কে এদের সবার চেয়ে ভাল ধারণা পোষণ করে টেসিও। তুলনায় এদের চেয়ে বেশি বুদ্ধিমান সে, সেটাই এর কারণ। মাইকেলের ভেতর অদ্ভুত একটা শক্তির অস্তিত্ব অনুভব করে সে। মাইকেল সেটাকে অত্যন্ত কৌশলে গোপন করে রাখে, সাধারণ কাউকে জানতেই দেয় না সেই গোপন শক্তির অস্তিত্ব। এটা বাপের কাছ থেকে পেয়েছে ও। ডন কর্লিয়নির পুরানো শিক্ষা-বন্ধুরা যেন তোমাকে, তোমার গুণকে খাটো করে দেখে, আর শত্রুরা যেন তোমার দোষ-ত্রুটি বড় করে দেখে।
মাইকেল সম্পর্কে অবশ্য ডন কর্লিয়নির মনে কোন সংশয় নেই। তার সম্পর্কে টম হেগেনের মনেও নেই কোন বিভ্রান্তি; মাইকেল আবার কর্লিয়নি পরিবারকে তার পুরানো শ্রেষ্ঠ আসনে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে, এই বিশ্বাস আছে বলেই অবসর নিয়েছেন ডন, তা না হলে কখনোই সরে দাঁড়াতেন না। আর ওর বুদ্ধি এবং মোগ্যতা সম্পর্কে সবচেয়ে ভাল খবর রাখে টম হেগেন। কেননা, সেই তো গত দুবছর ধরে মাইকেলকে প্রশিক্ষণ দেবার দায়িত্ব পালন করে আসছে। পারিবারিক ব্যবসার অত্যন্ত জটিল নীতিমালা আর হিসাবগুলো এক নজর দেখেই সব কিছু বুঝে নেয় মাইকেল, ব্যাপারটা লক্ষ করে বিস্মিত না হয়ে পারে না হেগেন। ছেলেটা ঠিক যেন একেবারে বাপের মতই হয়েছে।
মাইকেল সম্পর্কে ক্লেমেঞ্জা আর টেসিওর ধারণা আলাদা হলেও, ওরা দুজনেই এর ওপর অসন্তুষ্ট হয়ে আছে। অসন্তুষ্ট হবার কারণও আছে ওদের। দুটো দলকেই ভেঙে একেবারে ছোট করে দিয়েছে মাইকেল, তাছাড়া, সনির দলটাকেও নতুন করে গড়েনি আর।
খুব কম লোক নিয়ে মাত্র দুটো দল রয়েছে এখন কর্লিয়নিদের। দল ছোটো করাটাকে আত্মহত্যার সামিল বলে যনে: রক্লেমেঞ্জা আর টেসিও। বিশেষ করে বর্তমান পরিস্থিতিতে তো এই পদক্ষেপ আত্মঘাতীক উম্মত্ত প্রয়াস ছাড়া আর কিছুই নয়, কেননা কর্লিয়নিদের সামাজ্যে বাৰ্জিনি-টাটাগ্লিয়ারা হরহামেশাই অনধিকার প্রবেশ করে যেখানে যা পাচ্ছে খাবলা মেরে নিয়ে যাচ্ছে। আজকের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে এই সব ভুল সংশোধন করা হবে বলে আশা করছে ওরা।
