এক ছুটে স্বামীর আলিঙ্গনের ভেতর গিয়ে ঢুকল কে। দ্রুত একটা চুমো খেয়ে স্ত্রীকে সরিয়ে দিল মাইকেল। পাখি যেভাবে ডানা মেলে দিয়ে বাচ্চাকে আড়াল করে রাখে ঠিক তেমনি আড়াল করে রেখেছে মাইকেলকে টম হেগেন। অ্যালবার্ট নেরি এরই মধ্যে অদৃশা হয়ে গেছে। লিমুসিনে প্রথমে চড়ল: মাইকেল। তারপর কে। সবশেষে হেগেন। কে জানতেই পারল না যে নেরি আরও দুজন লোকের সাথে। অপর একটা গাড়িতে চড়ে ওদের অনুসরণ করে সোজা উঠানে এসে কল
মাইকেলের কাজকর্ম কেমন হলো, এ-ধরনের কোন প্রশ্ন কখনও জিজ্ঞেস করে না কে। ভদ্রতা দেখিয়ে জানতে চাইলেও মাইকেল অস্বস্তি বা অপ্রতিভ বোধ করতে পারে ভেবে মৌন থাকার নীতিই গ্রহণ করেছে সে। জানে, প্রশ্ন করা হলে ভদ্রতা রক্ষা করার স্বার্থে উত্তর না দিয়ে পারবে না মাইকেল। কিন্তু প্রাঙ্গটা তুললেই হয়তো দুজনেরই মনে পড়ে যাবে যে ওদের দাম্পত্য জীবনে মস্ত একটা নিষিদ্ধ এলাকা আছে, সেটা চিরকালই নিষিদ্ধ থেকে যাবে। তবে এ নিয়ে আজকাল আর মন খারাপ করে না কে। কিন্তু মাইকেল আজ নিজেই জানাল, রাতেই ওকে বাবার সাথে দেখা করতে হবে, ভেসে যা যা ঘটেছে সব এখুনি জানাতে হবে ডনকে। মনটা সত্যি সত্যি আজ খারাপ হয়ে গেল কে-র। কথাটা মুখ ফুটে মাইকেলকে জানাতেও দ্বিধাবোধ করল না সে।
বিশ্বাস করো, খারাপ আমারও লাগছে, সান্তনা দেবার সুরে বলল মাইকেল, ঠিক আছে, কাল তোমাকে আমি নিউ ইয়র্কে নিয়ে যাব। ছবি দেখাব। ডিনার খাওয়াব। খুশি? কে-র পেটে একটা হাত রেখে ধীরে ধীরে চাপড় মারছে মাইকেল। ও এখন পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা। বাচ্চা হলেই তো আবার তুমি আটকা পড়ে যাবে বাড়ির ভেতর। আই বাপ! তুমি দেখছি যত না আমেরিকান তার চেয়ে বেশি ইতালীয়। জোড়া বছরে জোড়া বাচ্চা।
আর তুমি? ঝাঁঝের সাথে বলল কে। তুমি তো যত না ইতালীয় তার চেয়ে বেশি আমেরিকান। বাইরে থেকে ফিরে একটা দিন বাড়ি থাকবে, তা না, আবার কাজের ভেতর নাক ওজতে ছুটছ। শুধু ব্যবসা আর ব্যবসা। ঘরে যে আরও একজন। আছে, সে কথা ভুলে গেলেই তো পারো। কথায় কঁঝ থাকলেও, বলার সময় হেসে ফেলেছে কে। আই, জবাব দাও, ঠিক কখন পাব তোমাকে বিছানায়? বেশি দেরি করলে কিন্তু ভাল হবে না।
মাঝরাতের আগেই পাবে, মুচকি হেসে বলল মাইকেল। কিন্তু তাই বলে রাত জেগে বসে থেকো না আবার।
না, থাকব না!
.
ডন কর্লিয়নির লাইব্রেরি।
পরামর্শ সভা বসেছে। উপস্থিত রয়েছেন ডন নিজে, মাইকেল, টম হেগেন, কার্লো, দুই ক্যাপোরেজিমি ক্লেমেঞ্জা আর টেসিও।
পরিবেশে আগের সেই আন্তরিক হৃদ্যতার ছোঁয়া নেই। কেমন যেন আড়ষ্ট হয়ে উঠেছে আবহাওয়াটা। এর আগে ডন তার আধা অবসশ্রহণের কথা ঘোষণা করেছেন, জানিয়েছেন পারিবারিক ব্যবসার দায়িত্ব মাইকেলের হাতে ছেড়ে দিয়েছেন তিনি। সেইদিন থেকেই থমথম করছে পরিবেশটা। তার অবশ্য একাধিক কারণও আছে।
মাফিয়া পরিবারগুলোর জন্যে একটা বিশেষ নিয়ম আছে, সে নিয়ম কর্লিয়নি পরিবারের জন্যেও প্রযোজ্য, তা হলো, পারিবারিক ব্যবসা পরিচালনার ভার উত্তরাধিকার সূত্রে বাপের কাঁধ থেকে ছেলের কাঁধে নাও বর্তাতে পারে। অন্য কোন পরিবার হলে এখানকার পরিস্থিতি অন্যরকম হত, হয়তো ক্লেমেঞ্জা বা টেসিও হত পরবর্তী ডন, বর্তমান ডন অবসর নেয়ার সাথে সাথে সেই হত সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। নিদেনপক্ষে ওদেরকে যার যার আলাদা পরিবার গড়ে তোলার স্বাধীনতা দেয়া হত। সেটাই নিয়ম। উপযুক্ততা থাকা সত্ত্বেও কাউকে দাবিয়ে রাখার নীতি সাধারণত অবলম্বন ক্লরা হয় না।
পরিবেশটা ঠাণ্ডা মেরে যাবার আরেকটা কারণ হলো, ডন কর্লিয়নি শান্তি চুক্তি করার পর থেকে কর্লিয়নিদের শক্তি কমতে শুরু করেছে। আজ আর কেউ কর্লিয়নি। পরিবারকে সর্বশ্রেষ্ঠ, বা সবচেয়ে ক্ষমতাবান বলে দাবি করে না। নিউ ইয়র্কের সেরা। পরিবার, সবচেয়ে প্রতিপত্তিশালী বলতে এখন একমাত্র বার্জিনি পরিবারকেই বোঝায়, এ নিয়ে কোন তর্ক ওঠে না। টাটাগ্লিয়াদের সাথে জোট বেঁধে তারাই এখন কর্লিয়নি পরিবারের আসনটা দখল করে নিয়ে শ্রেষ্ঠ পরিবার হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে! কর্লিয়নিদের ক্ষমতা এখানে সেখানে যাও বা এক-আধটু আছে, সেসব জায়গাতেও ছোঁ মেরে নিজেদের আধিপত্য কায়েম করে নিচ্ছে তারা। কর্লিয়নিদের জুয়ার ব্যবসার ওপর হানা দেয়া একটা নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেখানেই একটু দুর্বলতা দেখছে, সেখানেই নিজেদের বুকমেকার ঢুকিয়ে দিচ্ছে তারা।
ডন অবসর নিতে যাচ্ছেন, খবরটা শুনে বার্জিনি আর টাটাগ্লিয়ারা তো আনন্দে। কাল বাজাচ্ছে। সবার ধারণা যত ক্ষুরধার বুদ্ধিমানই হোক মাইকেল কর্লিয়নি, বাপের মত দুর্জয় প্রভাবশালী হয়ে উঠতে এখনও এক যুগ সময় লাগবে ছোকরার। কর্লিয়নি পরিবারের অবস্থা যে পতনের দিকে, এব্যাপারে কারও মনে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই।
এসব ছাড়াও বেশ কয়েকটা বড় বড় দুর্ভাগ্যের শিকার হতে হয়েছে কর্লিয়নি পরিবারকে। শেষ পর্যন্ত প্রমাণ হয়ে গেল ফ্রেডি কর্লিয়নি হাবাগোবা টাইপের হোটেলওয়ালা আর মেয়েদের স্ক্রীতদাস ছাড়া কিছু নয়। ইতালীয় ভাষায় একটা শব্দ আছে যেটার অনুবাদ সম্ভব নয়, তবে কথাটার কাছাকাছি মানে হলো, জুন চোষা পেটুক খোকা–এককথায় পৌরুষহীন।
