গোটা ব্যাপারটার মধ্যে এমন কিছু একটা আছে, যা ঠিক বুঝে উঠতে পারে না কে। ব্যাপারটা খুবই সূক্ষ্ম, কখনই প্রকট হয়ে ওঠে না। কিন্তু হাজার হোক সে নারী, আর নারীর একটা চোখে থাকে রাজ্যের চাতুরী, সে চাতুরীর সাহায্যে দেখতে পায় কে, বাবাকে খুশি করার জন্যে প্রাণপণ চেষ্টা করে কনি। তার এই কাজে কোন খুঁত থাকে না, তার কারণ কনি অন্তর থেকেই করে সেটা। কিন্তু তবু যেন সেটাকে স্বতঃস্ফূর্ত বলা যায় না। বোঝা যায়, বাবার সমর্থন আদায় করাটা তার কাছে খুবই জরুরী একটা ব্যাপার। এ ধরনেরই চেষ্টা অন্যভাবে কার্লোও করে। তবে ডনকে নয়, মাইকেলকে খুশি করার চেষ্টা করে সে। সেদিন যেমন উত্তর দেবার সময় নিজের কপালে আঙুল দিয়ে টোকা মেরেছিল সে। কিন্তু মাইকেলকে দেখে মনে হলো এসব যেন দেখতেই পায়নি ও।
কে কিন্তু মাইকেলের চেহারার বিকৃতি নিয়ে কখনোই মাথা ঘামায় না। ওতে ওর কিছুই এসে যায় না। তবে, ওটা সারানো হচ্ছে না বলেই মাইক সাইনাসের কষ্টে ভুগছে, সেটাই ওর একমাত্র দুশ্চিন্তার কারণ। ডাক্তাররা আগেই জানিয়েছে অপারেশন করে মুখের হাড় ঠিকমত বসিয়ে নিলে সাইনাসের উপদ্রবটা বন্ধ হয়ে যাবে। মুখ ফুটে কিছু বলে না কে, কিন্তু মনে মনে চায় হাসপাতালে ভর্তি হয়ে ঝামেলাটা চুকিয়ে ফেলুক মাইকেল। তবে এও পরিষ্কার বুঝতে পারে ও, কি এক দুর্বোধ্য কারণে মুখের ওই ত্রুটিটাকে পুষে রাখতে চায় তার স্বামী। কে-র বিশ্বাস, কথাটা ডনও বুঝতে পেরেছেন।
ওরা ওদের প্রথম সন্তানের মুখ দেখার পর, ও-কে অবাক করে দিয়ে হঠাৎ একদিন জানতে চাইল মাইকেল, মুখের এই ত্রুটিটার ব্যাপারে তুমি কি মনে করো, কে? চাও এটা আমি সারিয়ে নিই?
মাথা দুলিয়েছিল কে। নিজের কথা ভেবে নয়, মাইক, ছেলেটার কথা ভেবে তাই চাই। ছেলেপুলেরা কেমন হয় জানোই তো, একটু জ্ঞান-বুদ্ধি হলেই বুঝতে শিখবে যে তুমি দেখতে স্বাভাবিক নও, মনে খুব আঘাত পাবে তখন ও। আমার ছেলে তার বাপের ভাঙা মুখ দেখুক, এ আমি চাই না। কিন্তু আমার কথা যদি জিজ্ঞেস করো তুমি, মাইকেল, সেটাই আমার কাছে একমাত্র সত্য, মাইকেলের মুখ ভাঙা কি হাত কাটা, তাতে আমার কিছুই এসে যায় না।
স্ত্রীর চোখে চোখ রেখে মৃদু হেসেছিল মাইকেল। ঠিক আছে। অপারেশন করাব।
হাসপাতাল থেকে কে বাড়ি না ফেরা পর্যন্ত অপেক্ষা করুল মাইকেল, তারপর হাসপাতালে ভর্তি হলো নিজেই। নির্বিমে হয়ে গেল অপারেশন। মুখটা যে এই মাত্র কদিন আগেও বিচ্ছিরিভাবে তুবড়ে ছিল তা আর এখন বোঝাই যায় না।
বাড়িতে আনন্দ আর ধরে না কারও। বিশেষ করে কনি তো মহাখুশি। রোজ তার একবার করে হাসপাতালে মাইকেলকে দেখতে যাওয়া চাই। মাইকেল যেদিন বাড়ি ফিরল, ওকে জড়িয়ে ধরে সে কি চুমো খাওয়া। তার দুচোখে আনন্দ উথলে উঠেছিল। ওরে, কে কোথায় আছিস দেখে যা, এই তো সুন্দর রাজপুত্র ভাইটি আমার! চিৎকার করে আবার মাইকেলের মুখে চুমো খেয়েছিল সে।
একমাত্র ডনের ওপর এর কোন প্রভাব পড়তে দেখা যায়নি। সবাই যখন প্রশংসায় পঞ্চমুখ, তিনি তখন মাথা ঝাঁকিয়ে বলেছিলেন, কি আর এমন তফাৎ হলো! কেমন যেন একটা উদাস ভাব লক্ষ করা গেল তার মধ্যে। সবচেয়ে কৃতজ্ঞ বোধ করুল কে। আর কেউ জানুক বা না জানুক, সে তো জানে, নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কাজটা করেছে মাইকেল। কে ওকে অনুরোধ করেছিল, তাই। নিজের ইচ্ছের বিরুদ্ধে মাইকেলকে কেউ যদি কোন কাজ করাতে পারে, সে শুধু কে। আর কারও অনুরোধ, এমন কি স্বয়ং ডনের আদেশ অমান্য করার মত সৎসাহস রাখে মাইকেল কর্লিয়নি।
৪.০৮ ভেগাস থেকে ফিরল মাইকেল কর্লিয়নি
০৮.
ভেগাস থেকে বিকেলে ফিরল মাইকেল কর্লিয়নি।
লিমুসিন গাড়ি নিয়ে উঠানে ঢুকল রকো ল্যাম্পনি। স্বামীকে তুলে আনার জন্যে এয়ারপোর্টে যাবে কে। বেড়িয়ে বা কাজ সেরে কোথাও থেকে মাইকেল ফিরলে তাকে নিয়ে আসার জন্যে এয়ারপোর্টে যাবেই ও, কেউ বাধা দিয়ে রাখতে পারে না তাকে। কাছে মাইকেল না থাকলে সাঙ্ঘাতিক অসহায়, নিঃসঙ্গ বোধ করে ও তাছাড়া বাড়িটা তো একটা গা ছমছম দুর্গের মত, মাইকেলের উপস্থিতি ছাড়া দম বন্ধ হয়ে আসতে চায় তার।
মাইকেলের নতুন বডিগার্ড অ্যালবার্ট নেরিকে প্লেন থেকে নামতে দেখল কে। তারপর দেখা গেল মাইকেলকে। সবার শেষে মাইকেলের ঠিক পিছনেই!দেখা যাচ্ছে টম হেগেনকে। মাইকেলের মুখের দিকে অপলক চোখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল কে। সাথে সাথে ধরতে পারল, মাইকেলের মুখটা শুকনো, বোধহয় মন খারাপ। মনে মনে উদ্বিগ্ন হয়ে উঠল কে। চোখের দৃষ্টি গিয়ে পড়ল সামনের লোকটার ওপর। অ্যালবার্ট ননরিকে তেমন পছন্দ হয় না কে-র.। ওকে দেখলেই লুকা ৰাসি নামে সেই ভয়ঙ্কর লোকটার কথা মনে পড়ে যায় ওর। এর চেহারার মধ্যেও ফুটে আছে, আশ্চর্য একটা চাপা হিংস্র ভাব। তাকালেই কেন যেন নিজের অজান্তে শিউরে ওঠে কে।
মাইকেল প্লেন থেকে নেমে কয়েক পা মাত্র এগিয়েছে, হঠাৎস্যাৎ করে পিছিয়ে গেল নেরি, দ্রুত মাথা ঘুরিয়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দেখে নিচ্ছে চারদিকটা। এয়ারপোর্টে যারা উপস্থিত রয়েছে তাদের একজনও তার চোখ ফাঁকি দিতে পারল না। কে-কে সেই দেখতে পেল প্রথম। মাইকেলের কাঁধে একটা হাত রাখল সে, কিন্তু ঠোঁট নেড়ে কিছু বলল না। তার দৃষ্টি অনুসরণ করে কে-কে দেখতে পেল মাইকেল।
