ঘ্যানর ঘ্যানর করা স্বভাব নয় কে-র, মাইকেল ব্যাপারটা এড়িয়ে যেতে চাইছে বুঝতে পেরে চুপ করে গিয়েছিল সে কথা বাড়ায়নি আর। এরই মধ্যে জানা হয়ে গেছে তার, মাইকেলের ওপর কোন ব্যাপারে চাপ সৃষ্টি করা যায় না। সে রকম কিছু করতে গেলে মাইকেলের ব্যবহার কেমন যেন স্নেহ, মাধুর্য আর প্রীতিশূন্য হয়ে পড়ে। জানে, যে কোন ব্যাপারে একমাত্র সেই পারে নাইকেলের মতের পরিবর্তন ঘটাতে, সেই সাথে এও জানে যে এই ক্ষমতাটা বারবার কাজে লাগালে সেটার ধার কমে যাবে, একসময় আর কোন কাজেই লাগবে না। দীর্ঘ দুবছর ওর সাথে ঘর সংসার করার পর, মাইকেলের ওপর তার প্রেম আরও গাঢ় হয়েছে, আরও গম্ভীর হয়েছে–সব ব্যাপারে এখন আর খুত খুত করে না মনটা।
বিয়ের আগে মাইকেলের ওপর প্রচণ্ড একটা আকর্ষণ বোধ করত কে, এখন সেটা অন্ধ প্রেমে পরিণত হয়েছে। যত দিন যাচ্ছে ততই মাইকেলের ওপর ভালবাসা বেড়ে যাচ্ছে তার। এর একটা কারণ আছে। মাইকেলের ন্যায় ব্যবহারই সেই কারণ। শুধু কে-র সাথে নয়, সবার সাথে আশ্চর্য ভাল ব্যবহার করে মাইকেল। পরিষ্কার বোঝা যায়, কারও সাথে খারাপ ব্যবহার করবে না বলে মনে মনে শপথ নিয়ে রেখেছে ও। ছোট বড় সবার সাথে আশ্চর্য একটা সদ্ভাব বজায় রেখে চলে ও। কারও মনে আঘাত দিয়ে কখনও কিছু বলে না। সারাদিন কোন না কোন কাজে ব্যস্ত থাকে, কত লোক দেখা করতে আসে ওর সাথে, কারও সাহায্য চাই, কারও পরামর্শ দরকার। সবাই শ্রদ্ধা করে মাইকেলকে, সমীহ করে কথা বলে। দিনে দিনে প্রতিপত্তি বাড়ছে ওর। সেই সাথে বিবেচক হয়ে উঠছে ও, ব্যক্তিত্বের বিকাশ ঘটছে। এসব তো আছেই, অন্য আরেকটা কারণে মাইকেলের ওপর ভালবাসা দিনে দিনে বেড়ে উঠছে কে-র।
সিসিলি থেকে ফিরে এসেছিল মাইকেল ভাঙা মুখ নিয়ে, সেই থেকে সবাই তার পিছনে লেগেছে, ত্রুটিটা অপারেশন করে সারিয়ে ফেল। বিশেষ করে মাইকেলের মা একেবারে নাছোড়বান্দার মত হয়ে উঠলেন। মাইকেলের কানের কাছে অনবরত টিক টিক করতেন তিনি। এক রবিবারের কথা মনে পড়ে কে-র, সেদিন বাড়ির সবাই একসাথে বসেছে ডিনার খাবে বলে, মাইকেলের মা চেঁচামেচি শুরু করে দিলেন।
আয়নায় নিজের চেহারাটা দেখিস একবার, মাইকেলের সামনে দাঁড়িয়ে গম্ভীর গলায় বললেন তিনি, ঠিক যেন সিনেমার গুণ্ডা যীশু আর তোর স্ত্রীর কথা ভেবে অন্তত মুখটা সারিয়ে নে। সারিয়ে নিলে আইরিশ মাতালদের মত নাক দিয়ে ওই রকম বিচ্ছিরি পানিও ঝরবে না আর। কত আর বলব তোকে?
মায়ের সাথে তর্ক করা স্বভাব নয় মাইকেলের। আর এ এমন একটা বিষয় যা নিয়ে কোন কথা বলতেই রাজী নয় ও। মাথা নিচু করে চুপ করে থাকল শুধু। একটা উত্তর পর্যন্ত দিল না।
টেবিলের একধারে বসেছিলেন ডন। এতক্ষণ সবই তিনি লক্ষ করছিলেন নিঃশব্দে। কে-র দিকে ফিরে হঠাৎ জানতে চাইলেন, তোমার খারাপ লাগে, কে?
দ্রুত মাথা নাড়ল কে।
ডন স্ত্রীর দিকে তাকালেন। বললেন, মাইকেল এখন তোমার হাতে নেই, ব্যাপারটা নিয়ে তুমি মাথা না ঘামালেই তো পারো।
স্বামীর কথার ওপর বুড়ি ভদ্রমহিলা কথা বললেন না। ডনকে তিনি ভয় করে চলেন, ব্যাপারটা তা নয়, সবার সামনে তার সাথে তর্ক জুড়ে দিলে তার অসম্মান করা হয়।
সন্তানদের মধ্যে কনিকে সবচেয়ে বেশি আদর করেন ডন, সে তখন কিচেনে ছিল, আলোচনার বিষয়টা কি জানতে পারার সাথে সাথে ডাইনিংরুমে এসে ঢুকল সে, বলল, আমিও বলি, অপারেশন করে ত্রুটিটা সারিয়ে নেয়া উচিত মাইকেলের। আমাদের মধ্যে ওই তো সবচেয়ে সুন্দর ছিল দেখতে, আর এখন হয়েছে যাচ্ছে তাই। মাইক, লক্ষ্মী ভাইটি আমার, বলে অপারেশন করাবে তুমি?
চেহারায় নির্লিপ্ত একটা ভাব ফুটিয়ে তুলে কনির দিকে তাকাল মাইকেল। সবার মনে হলো, কনি কি বলেছে শুনতেই পায়নি সে। উত্তর দেবার তো কোন চেষ্টাই করল না।
কিন্তু কনিও সহজে ছাড়বার পাত্রী নয়। দ্রুত পা চালিয়ে বাবার পাশে গিয়ে দাঁড়াল সে। বলল, তুমি বললে নেবে ও, বাবা। তুমি ওকে আদেশ করো। বাবার মন পাবার জন্যে তার গলাটা জড়িয়ে ধরল সে। ধীরে ধীরে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। বাবার কাঁধে।
ছেলেমেয়েদের মধ্যে বাবার এত কাছাকাছি একমাত্র ওই যেতে পারে। ডনের প্রতি ওর ভালবাসা দেখে অভিভূত না হয়ে পারা যায় না। এত বড়টি হয়েছে, কিন্তু বাবার সাথে এমন আচরণ করে যেন এখনও কচি খুকী। ডা মেয়ের হাতে মৃদু চাপড় মারলেন কয়েকবার, তারপর বললেন, এই, পাগলী, খিদেতে যে বাপের পেট জ্বলে গেল সেদিকে খেয়াল আছে? টেবিলে আগে স্প্যাগেটি নিয়ে আয়, তারপর যত পারিস বকবক করিস।
বাবা তাকে নিরাশ করায় এবার কনি স্বামীর শরণাপন্ন হলো। বলল, কার্লো, তুমি মাইককে একটু বুঝিয়ে দেখো না, প্লীজ। কথাগুলো এমন ভাবে বলল কনি, যেন কার্লোর সাথেই মাইকেলের সবচেয়ে বেশি বন্ধুত্ব।
রোদে পোড়া চেহারা কার্লোর, শরীরটা প্রকাণ্ড, সোনানী চুল পরিপাটি করে ছাঁটা, আঁচড়েছেও যত্ন করে। তার হাতে বাড়ির তৈরি এক গ্লাস মদ। গ্লাসটায় চুমুক দিল সে, বলল, মাইক নিজের কথায় চলে। উঠানে আসার পর থেকে সম্পূর্ণ অন্য মানুষ হয়ে গেছে কার্লো! কর্লিয়নি পরিবারে তার আসন কোথায় সেটা বুঝে নিয়ে সেই রকম আচরণ করে সে।
