যখনই আসে কনি, একটা বিশেষ কথা জিজ্ঞেস করতে কখনও ভুল হয় না তার। প্রশ্নটা আজও করল সে। তার স্বামী কার্লো সম্পর্কে কি ধারণা মাইকেলের? মাইকেল কি পছন্দ করে কার্লোকে? নিজেই আবার মন্তব্য করে, দেখে তো তাই মনে হয়।
বেশ কিছুদিন শ্বশুর বাড়ির লোকজনদের সাথে সম্পর্ক ভাল ছিল না কার্লোর। তবে, একটা করে বছর গেছে, সম্পর্কটাও একটু একটু করে ভাল হয়ে উঠেছে। দেখে মনে হয়, সমস্ত মন-কষাকমি মিটে গেছে। শ্রমিক সংঘে একটা ভাল কাজ দেয়া হয়েছে কার্লোকে, সেখানে খুব মন দিয়ে কাজ করছে সে। তবে খাটনিটা একটু বেশি, সেই সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত। কনির মুখ থেকে সব সময়ই শোনা যায়, কার্লো সত্যি খুব পছন্দ করে মাইকেলাকে। অবশ্য, কেই বা পছন্দ করে না ওকে? কনির বাবা যেমন সবার প্রিয়পাত্র, তেমনি মাইকেলও সবার প্রিয়পাত্র! মাইকেল যে অবিকল আরেকজন ডন, তা অস্বীকার করার উপায় নেই কারও। ওকে দেখে ডন ছাড়া আর কিছুই মনে হয় না। কার্লোও তো সেকথা বলে। মাইকেল যে ওদের পারিবারিক জলপাই তেলের ব্যবসার দায়িত্ব নেবে এর চেয়ে আনন্দের খবর আর কিছু হতে পারে না।
কিন্তু একটা ব্যাপার লক্ষ করে অবাক হয়ে যায় কে। কনি যখনই তার স্বামীর কথা তোলে, কেমন যেন ভয়ে ভয়ে আশা করে, তার সম্পর্কে দুএকটা ভাল কথা কলা কে। কার্লোর প্রশংসা শোনার জন্যে কেমন যেন মুখিয়ে থাকে সে। ঠিক আগ্রহ নয়, আশ্চর্য একটা আতঙ্ক নিয়ে অপেক্ষা করে সে। প্রসঙ্গটা একদিন মাইকেলের কাছে তুলল কে। সেই সাথে আরও একটা প্রশ্ন জুড়ে দিল সে। সনি কর্লিয়নির নাম পর্যন্ত মুখে আনে না কেউ-কেন? অন্তত কনির সামনে তো নয়ই। কারণটা কি? একদিনের কথা মনে আছে কে-র। সনির প্রসঙ্গ তুলে দুঃখ প্রকাশ করতে গিয়ে কেমন অপ্রতিভ হয়ে পড়েছিল কে। ডন আর তার স্ত্রী প্রায় অভদ্রের মত চুপ করে ছিলেন, ইহা পর্যন্ত করেননি। দুজনেই যেন কালা হয়ে গিয়েছিলেন। কোন প্রসঙ্গ এভাবে উপেক্ষা করা যায়, ভাবতেই পারে না কে। শুধু এদেরকেই নয়, কনির সাথেও সনি কর্লিয়নির সম্পর্কে আলাপ করতে গিয়ে ব্যর্থ হয়েছে কে! কৌশলে কনিও এড়িয়ে গেছে প্রসঙ্গটা।
প্রসঙ্গটা মাইকেলও এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করেছে, কিন্তু কে-র জেদের কাছে পেরে উঠেনি। অনিচ্ছাসত্ত্বেও সনির মৃত্যুটা ব্যাখ্যা করেছিল সে। সে রাতে যা যা ঘটেছিল, সবই জানিয়েছিল ওকে। স্বামী কার্লোর হাতে প্রচণ্ড মার খেয়ে লং বীচে টেলিফোন করেছিল, কনি। ফোন ধরেছিল সনি। তারপর রাগে অন্ধ হয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল সে। সনির ওই রাগ আর বাড়ি ছেড়ে বেরোবার ব্যাপারে দায়ী হলো ওই টেলিফোনটা। সেজন্যেই কনি আর কার্লোর ভয়, কর্লিয়নিরা বোধহয় সনির মৃত্যুর জন্যে পরোক্ষভাবে কনিকে দায়ী বলে মনে করে। তার মানে, সনির মৃত্যুর জন্যে কার্লোকে দোষ দেয়। তবে, আসলে ব্যাপারটা তা নয়। ওরা যে কেউ কার্লোকে খারাপ চোখে দেখে না তার প্রমাণ হলো, ওদেরকে উঠানে জায়গা দেয়া হয়েছে। শ্রমিক সংঘে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটা কাজ দেয়া হয়েছে। তাছাড়া, কার্লোও তো আজকাল বদলে গেছে। পুরোপুরি শুধরে গেছে সে। মদ তো সে ছোঁয়ই না। মেয়েমানুষের নেশাও ছুটে গেছে তার। কোন ব্যাপারে বেশি চালাকি করার প্রবণতাও দেখা যায় না তার মধ্যে। আর স্ত্রীর গায়ে তো ভুলেও একবার হাত তোলেনি সেই থেকে। জীবনে আর কখনও তুলবে বলেও মনে হয় না গত দুবছর ধরে কার্লোকে লক্ষ করেছে কর্লিয়নি পরিবার, তারা ওর ব্যবহারে সম্পূর্ণ সন্তুষ্ট, তার বিরুদ্ধে ওদের কারও কোন অভিযোগ নেই। যা ঘটে গেছে-তা নিয়ে কেউ আর মাথাও ঘামায় না এখন, কেউ দোষীও ভাবে না কার্লোকে। সব চুকেবুকে গেছে।
তাই যদি হয়, বলেছিল কে, ওরা যে অহেতুক ভয় পাচ্ছে, সেটা তুমি ভেঙে দিচ্ছ না কেন? ওদেরকে একদিন দাওয়াত করে ডেকে এনে আশ্বস্ত করে দিলেই তো হয়। কনিকে বললেই চলবে। সব সময় ভয়ে কুঁকড়ে থাকে বেচারী, ওর স্বামী সম্পর্কে কি না কি ধারণা করে বসে আছ তোমরা। তারচেয়ে সব কথা খুলে জানিয়ে দিলেই পারো।
না, তা সম্ভব নয়, বলেছিল মাইকেল। আমাদের বাড়ির আলাদা একটা নিয়ম আছে, এসব বিষয় আলোচনা করা হয় না।
তুমি অনুমতি দিলে তোমার হয়ে আমি বলতে পারি কনিকে।
চিন্তিত দেখাচ্ছিল মাইকেলকে। কে বুঝতেই পারছিল না এই ধরনের একটা সহজ কর্তব্য পালন করতে গিয়ে এত কি চিন্তা করার আছে।
কিছু বোধহয় না বলাই উচিত, কে, বলল মাইকেল। তাতে কোন লাভ হবে না। কনি ব্যাপারটা নিয়ে দুশ্চিন্তা করবেই। এ এমন একটা ব্যাপার, বাইরে থেকে কিছু করা যায় না।
অবাক হয়ে স্বামীর মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল কে। হঠাৎ মনে পড়ল, আর সবার সাথে যেরকম সস্নেহ ব্যবহার করে মাইকেল, কনির সাথে তো সেরকম করে না। জানতে চাইল, তবে সনির মৃত্যুর জন্যে কনিকে দায়ী করো তুমি?
একটা নিঃশ্বাস ফেলল মাইকেল। কক্ষনও না। কনি আমার একমাত্র ছোট বোন, ওকে আমি ভালবাসি। ওর কথা ভেবে দুঃখ পাই আমি। কার্লো আগের চেয়ে অনেক ভাল হয়ে গেছে, কিন্তু এ কথা তো ঠিক যে কনির উপযুক্ত স্বামী সে নয়। মাঝে মধ্যে এরকম বেখাপ্পা ব্যাপার ঘটতে দেখা যায়, কি আর করা যাবে বলো আর নয়, কেমন? এবার এসব কথা ভুলে যাওয়া যাক।
