কিন্তু হঠাৎ লোকগুলো তাদের ব্যবসা বন্ধ করে দিল কেন? পুলিশের তাড়া খেয়ে বুঝি?
এদিক ওদিক মাথা নেড়েছিল হেগেন। না। ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেল। ডন তার সমর্থন প্রত্যাহার করে নেয়ায়; কনির বিয়ের পরপরই।
পরে এ-ধরনের আরও অনেক ঘটনা লক্ষ করেছে মাইকেল! এসব থেকে ডনের বিচিত্র চিন্তাধারার পরিচয় পাওয়া যায়। কারও ওপর অসন্তুষ্ট হলে তার কিছুটা ক্ষতি করতে ইতস্তত করেন না, আবার কিছুদিন পরই দেখা যায় সেই লোকেরই উপকার করার জন্যে উঠে পড়ে লেগেছেন তিনি। তার এই আচরণের মধ্যে কোন রকম ধূর্ত বা মতলব থাকে না, তার বিচিত্র দৃষ্টিভঙ্গিই এর কারণ। অথবা। বিব্রহ্মাণ্ডের নিয়মই এই, সেটাকে তিনি ঘন করতে চান না। ভালয় মন্দে জড়িয়ে। থাকাটাই তো সেই নিয়ম, আর সব নিয়মের চেয়ে সেটাই তো স্বাভাবিক।
ওদের বিয়ে হয়েছে নিউ ইংল্যাণ্ডে। নিরিবিলিতে সারা হয়েছে কাজটা। শুধু কে-র বাড়ির লোকজন আর কয়েকজন বন্ধু-বান্ধব উপস্থিত ছিল। বিয়ের পর থেকে উঠানের একটা বাড়িতে উঠে এসেছে ওরা। শ্বশুর শাশুড়ীর সাথে, উঠানেরআর সব বাসিন্দাদের সাথে নিজেকে সুন্দরভাবে মানিয়ে নিয়েছে কে, ব্যাপারটা লক্ষ করে গর্ব অনুভকাকরে মাইকেল, আবার অবাকও হয়। সেকেলে অর্থে ভাল ইতালীয় বউদের মত কয়েকটা দিন যেতে না যেতেই অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ল কে। ফলটা তাতে ভালই হয়েছে। দুবছরের মধ্যে দুই সন্তানের সম্ভাবনা দেখতে পেয়ে বাড়ির সবাই মহাখুশি। এ যেন একেবারে সোনায় সোহাগা।
মাইকেল জানে, ওর জন্যে এয়ারপোর্টে অপেক্ষা করবে কে। অনেক বলেও তার এই অভ্যাসটা ছাড়াতে পারেনি ও। কোথাও থেকে মাইকেল ফিরে এলে একেবারে ছেলেমানুষের মত খুশি হয়ে ওঠে কে। মাইকেল খুব খুশি হয়। কিন্তু আজকের ব্যাপারটা অন্যরকম।
আজকের এই যাত্রার শেষ মানেই এতদিন ধরে যে কাজের প্রস্তুতি চলছে, তার শুরু। ওর জন্যে অপেক্ষা করে আছেন ডন। ওর জন্যে অপেক্ষা করে আছে। ক্যাপোরেজিমিরা। ওর ঘাড়েই চাপবে এখন সমস্ত দায়-দায়িত্ব। মাইকেল কর্লিয়নির সামনে অগ্নিপরীক্ষা। নির্দেশ এখন তাকেই দিতে হবে। সিদ্ধান্ত এখন তাকেই নিতে হবে। সেই নির্দেশ আর সিদ্ধান্তের ওপরই নির্ভর করছে তার নিজের আর পরিবারের ভাগ্য।
.
রোজই খুব ভোর বেলা ঘুম থেকে উঠে খোকার জন্যে খাবার তৈরি করতে হয় কে অ্যাডামসকে। প্রায় রোজই তার চোখে পড়ে কর্লিয়নিদের মা, তার শাশুড়ী, সাথে বডিগার্ড নিয়ে গাড়ি করে কোথায় যেন যাচ্ছেন। ফিরে আসেন ঘণ্টাখানেক পর। কদিন পর কে জানতে পারল রোজ সকালে তিনি প্রার্থনা করার জন্যে গির্জায় যান।
গির্জা থেকে ফিরে রোজই বুড়ি ভদ্রমহিলা একবার ছোট ছেলে মাইকেলের বাড়িতে আসেন। উদ্দেশ্য নতুন নাতিকে দেখা। সেই সুযোগে বৌ-মার হাতের এক কাপ কফি খাওয়াও হয়ে যায়। বাড়িতে পা দিয়ে প্রায় প্রতিদিনই তিনি জানতে চান, এখনও কেন ক্যাথলিক হবার কথা ভাবছে না কে? মনেই থাকে না তার যে এরই মধ্যে প্রটেস্ট্যান্ট মতে দীক্ষা দেয়া হয়ে গেছে কে-র ছেলেকে। সেজন্যেই ভাবল কে, দুএকটা প্রশ্ন করলে সেটা দোষের ব্যাপার হবে না জানতে চাইল, প্রত্যেকদিন কেন গির্জায় যান তিনি? ক্যাথলিক হলে তাই বুঝি যেতে হয়?
কে-র কথা শুনে শাড়ী ভাবলেন, রোজ গির্জায় যাবার ভয়েই বোধহয় ক্যাথলিক হচ্ছে না কে। বউকে তাড়াতাড়ি বললেন, না না! এমন অনেক ক্যাথলিক আছে যারা বছরে মাত্র দুবার, ঈস্টারের সময় আর বড়দিনে গির্জায় যায়। এর কোন ধরাবাধা নিয়ম নেই, যখনই মন চায় তখনই যেতে হয়।
হাসছে কে। বলল, আপনি তাহলে রোজ যান কেন?
অত্যন্ত সহজভাবে মিসেস কর্লিয়নি বললেন, স্বামীর জন্যে যেতে হয় আমাকে। হাতের তর্জনী ঘরের মেঝের দিকে তাক করলেন তিনি। ওঁকে যাতে এই নিচের দিকে নামতে না হয় তার জন্যে। কে-র মুখের দিকে তাকিয়ে আছেন তিনি। তারপর বললেন, ওঁর আত্মার জন্যে বোজ প্রার্থনা করি আমি, তারপর তিনি তর্জনীটা তুলে আকাশের দিকটা দেখালেন, যাতে ওই ওপরের দিকে যেতে পারেন আমার স্বামী। কথাগুলো বলার সময় তার চেহারায় দুষ্টামির হাসি ফুটে উঠতে দেখা গেল, যেন চুপিসারে স্বামীর গোপন মতলব ফাস করে দিচ্ছেন, যেন কোন পরাজিত পক্ষকে জিতিয়ে দিতে চাইছেন। পরিহাসের মতই শোনাল কথাগুলো, কিন্তু ভঙ্গিটা ইতালীয় বুড়িদের মতই রুগম্ভীর। তাছাড়া, ডন কাছেপিঠে না থাকলে যা প্রায়ই দেখা যায়, আজও তাই লক্ষ করল কে, শাশুড়ীর কথাবার্তা আর ভাবভঙ্গিতে ডনের প্রতি কিছুটা অশ্রদ্ধা প্রকাশ পেল।
বাবা কেমন আছেন আজ? ভদ্রতা করে জানতে চাইল কে।
কাঁধ ঝাঁকালেন শাশুড়ী। গুলি খাবার পর থেকে ওঁকে আর পুরোপুরি সুস্থ বলা যায় না, বললেন তিনি। আগের সেই মনও নেই আর। কাজ তো সবই এখন মাইকেলকে দিয়ে করান। নিজে আজকাল বাগানে খেলা করে সময় কাটান। ওঁর খেলনা হলো লঙ্কা আর টমেটো গাছগুলো। দেখে কে বলবে, শহুরে লোক? এখনও যেন সেই চাষীর ছোট্ট ছেলেটি। কিন্তু, আসল ব্যাপার কি জানো, পুরুষরা এই রকমই হয়।
বেলা আরেকটু চড়লে দুই ছেলেমেয়েকে সাথে নিয়ে গল্প করার জন্যে আসে কনি কর্লিয়নি। কনিকে খুব ভাল লাগে কে-র। হাসিখুশি মেয়ে, এতটুকু ঈর্ষা বা গর্ব নেই, মেজাজ করে না, আর মাইকেলকে যে প্রাণ দিয়ে ভালবাসে তা দেখলেই পরিষ্কার বোঝা যায়। কনির কাছ থেকেই কিছু কিছু ইতালীয় রান্না শিখেছে কে। কিন্তু খালি হাতে বড় একটা আসে না কনি, নিজের রান্না করা খাবার মাইকেলের জন্যে নিয়ে আসে খানিকটা।
