একবারও গলা চড়ায়নি মাইকেল, কিন্তু কথাগুলো শুনে ফ্রেডি আর মো গ্রীন একেবারে চুপসে গেল পালা করে ওদের দুজনের দিকে তাকাল মাইকেল, তারপর সরে গেল টেবিলের কাছ থেকে। তার মানে বিদায় হতে বলছে ওদেরকে।
উঠে গিয়ে দরজা খুলে দিল টম হেগেন; আনুষ্ঠানিক বিদায় অর্থাৎ গুড নাইট না বলেই কামরা থেকে বেরিয়ে গেল মো গ্রীন আর ফ্রেডি।
পরদিন সকালেই মো গ্রীন খবর পাঠাল মাইকেলের কাছে। না, যত দামই দেয়া হোক না কেন, সে তার শেয়ার বিক্রি করবে না। খবরটা দিয়ে গেল ফ্রেডি। শ্রাগ করল মাইকেল। বলল, নিউ ইয়র্কে ফিরে যাচ্ছি আমি, তবে তার আগে নিনোকে দেখতে চাই একবার।
নিনোর স্যুইটে পৌঁছে ওরা দেখল সোফায় শুয়ে ব্রেকফাস্ট খাচ্ছে জনি ফন্টেন। বেডরুমের পর্দা ফেলা রয়েছে, সেখানে ডাক্তার জুলস সীগল পরীক্ষা করছে। নিনোকে। খানিক পরই তুলে দেয়া হলো পর্দা।
নিনো ভ্যালেন্টির চেহারা দেখে হতবাক হয়ে গেল মাইকেল। চোখের সামনে এই মুহূর্তেও যেন ভেঙে পড়ছে লোকটা। ঢিল পড়েছে পেশীতে, প্রায় বুড়োই দেখাচ্ছে তাকে। ধীরে ধীরে তার বিছানার পাশে বসল মাইকেল। বলল, নিনো, কেমন আছ তুমি? শেষ পর্যন্ত তোমার দেখা মিলল, সেজন্যে ভীষণ খুশি হয়েছি আমি ডন তোমার কথা সব সময় জানতে চান।
নিঃশব্দে হাল নিনো, সেই দাঁত বের করা পুরানো হাসি। গড ফাদারকে বোলো, আমি মারা যাচ্ছি। তাকে জানিয়ে এই নাচ-গানের ব্যবসাটা তার জলপাই তেল ব্যবসার চেয়েও অনেক বেশি বিপজ্জনক।
তুমি সেরে উঠবে, নিনো, বলল মাইকেল। কোন ব্যাপারে তোমার কি কোন দুশ্চিন্তা আছে? বা তোমার জন্যে কি কিছু করার আছে কর্লিয়নি পরিবারের? আমাকে বলতে পারো। তেমন কিছু আছে, ভাই?
এদিক ওদিক মাথা নাড়ল নিনো ভ্যালেন্টি। নেই, কিছুই নেই।
কয়েক মিনিট গল্প করে বিদায় নিল মাইকেল।
এয়ারপোটে ওদের সাথে এল ফ্রেডি। তবে মাইকেলের অনুরোধে প্লেন ছাড়ার আগেই এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়ে গেল সে। টম হেগেন, মাইকেল আর অ্যালবার্ট নেরি প্লেনে চড়ল।
ওকে ভাল করে মেপে নিয়েছ তো? নেরির দিকে ফিরে জানতে চাইল মাইকেল। নিজের মাথায় তর্জনী দিয়ে একটা টোকা মারল নেরি। মো গ্রীনকে গুছিয়ে নম্বর দিয়ে রেখেছি এখানে।
৪.০৭ নিউ ইয়র্কে মাইকেল কর্লিয়নি
০৭.
নিউ ইয়র্কে ফিরছে মাইকেল কর্লিয়নি। শরীরটা ঢিল করে দিয়ে একটু ঘুমাবার চেষ্টা করছে সে। কিন্তু বৃথা চেষ্টা। বার বার এদিক ওদিক ছুটে যাচ্ছে মনটা। ওর জীবনের সবচেয়ে বিপজ্জনক সময় কাছে এসে পড়েছে। কি হয় না হয় কিছুই বলা যায় না, গোটা ব্যাপারটা একেবারে মর্মান্তিকও হয়ে উঠতে পারে।
সমস্ত প্রস্তুতি শেষ করা হয়েছে। সব রকম সতর্কতা অবলম্বন করা হয়েছে। প্রচুর সময় নিয়ে নিখুঁত, নিচ্ছিদ্র করা হয়েছে পরিকল্পনার প্রতিটি খুঁটিনাটি। এক দুই করে কেটে গেছে চব্বিশটা মাস, দুটো বছর। আর দেরি করা সম্ভব নয়।
গেল হপ্তায় ডন তাঁর ক্যাপোরেজিমিদের ডেকে বসিয়েছিলেন, সেখানে প্রায় সবাই উপস্থিত ছিল। আনুষ্ঠানিক ভাবে নিজের অবসর নেবার কথা ঘোষণা করেছেন তিনি। বাপের মুখে সংকল্পটার কথা শোনা মাত্র বুঝে নিয়েছে মাইকেল, বাবা তার নিজস্ব ভঙ্গিতে ছোট ছেলেকে জানিয়ে দিলেন, সময় হয়েছে এবার।
তিন বছর হলো সিসিলি থেকে ফিরেছে মাইকেল। ওর সাথে কে-এর বিয়ে হয়েছে আজ দুবছর। গত তিন বছর ধরে লেগে থেকে পারিবারিক ব্যবসাটা রপ্ত করে নিয়েছে ও। বেশির ভাগ সময়টা কেটেছে টম হেগেন আর কনের সাথে আলোচনা করে। এতদিন পরিবারটি সম্পর্কে সত্যিকার কোন ধারণাই ছিল না মাইকেলের। কর্লিয়নিরা কত ধনী, তাদের কত শক্তি জানতে পেরে রীতিমত তম্ভিত হয়েছে ও। নিউ ইয়র্ক শহরের মাঝখানে বহু মূল্যবান স্থাবর সম্পত্তি আছে ওদের, এক-আধটা নয়, অনেকগুলো। প্রকাণ্ড সব অফিস বিল্ডিং। ওয়াল স্ট্রীটের দুটো দালালি ব্যবসার অংশীদার ওরা, এরপর আছে লং আইল্যাণ্ডে ব্যাংকের শেয়ার, রেডিমেড পোশাক তৈরি কারখানার শেয়ার। এসব ছাড়া বেআইনী জুয়া ব্যবসা তো আছেই!
ব্যবসা শিখতে গিয়ে সবচেয়ে মজার শিক্ষাটা পেল মাইকেল পরিবারের পুরানো দলিলপত্র ঘাঁটার সময়। যুদ্ধ মাত্র থেমেছে, সেই সময়ের ঘটনা। কর্লিয়নি পরিবারের অনুমতি নিয়ে, তাদেরকে নিয়মিত মোটা টাকা দিয়ে একদল জালিয়াত গানের রেকর্ড নকল করত। বিখ্যাত গায়ক-গায়িকাদের জাল ফোনোগ্রা রেকর্ড তৈরি করে কৌশলে সেগুলো পাচার করে দিত, একবারও কেউ তারা ধরা পড়েনি। জানা কথা, এই জাল রেকর্ড বিক্রির টাকার এক পয়সাও গাইয়েরা বা বৈধ রেকর্ড পরিবেশকরা পেত না মাইকেল দেখল, এতে করে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল জনি ফন্টেন। কারণ, সে সময় জনির রেকর্ডই সবচেয়ে বেশি বিক্রি হত।
কৌতূহলী হয়ে উঠে হেগেনকে একদিন প্রশ্ন করল মাইকেল, জেনেশুনে তার। ধর্মপুত্রকে কেন ঠকতে দিয়েছিলেন ডন?
শ্রাগ করেছিল হেগেন। বলেছিল, এ হলো ব্যবসার কথা, আর কিছুর সাথে এর তেমন কোন সম্পর্ক তো না থাকাই স্বাভাবিক। তাছাড়া, তখন জনি খুব বেচাল চলছিল। সেই ছোটবেলা থেকে যাকে ভালবাসে তাকে বিয়ে করে আবার শ্রাগ করল কেন? মার্গট অ্যাশটনকে বিয়ে করতে হবে। ওর ওপর খুব চটে গিয়েছিলেন ডন।
