নিনো খুব একটা উৎসাহ পায়নি লক্ষ করে মন খারাপ হয়ে গেল জনির। গাল মন্দ শুরু করে দিল সে। শালা, বেজম্মা! খুব ভালই জানা আছে তোর, আমার মত গাইতে পারবি না কখনও তুই। কালকের কথা কালকে দেখা যাবে। আমি কিন্তু সাঙ্ঘাতিক উত্তেজিত হয়ে পড়েছি।
কিন্তু সে রাতে আর গাইল না জনি। নিনো আর মেয়ে দুটোকে সাথে নিয়ে একটা পার্টিতে গেল। এক বিছানায় রাত কাটালেও জনিকে দিয়ে আশা পূরণ হলো না টিনার। বেচারা হতাশই হলো! ব্যাপারটা বুঝতে পেরে আবার একটু মন খারাপ হয়ে গেল জনির। তারপর ভাবল কি আশ্চর্য, এক দিনেই সব আশা করলে হয় নাকি!
সকালে ঘুম ভাঙতেই দুশ্চিন্তায় উতলা হয়ে উঠল জনি। সত্যি গলা ফিরে পেয়েছে সে? নাকি স্বপ্ন দেখেছে কাল রাতে? আতঙ্কিত হয়ে পড়ল সে। তারপর সব কথা মনে পড়ে গেল, বুঝল স্বপ্ন নয়। কিন্তু একটা দুশ্চিন্তা দূর হলো তো আরেকটা আসন গেড়ে বসল মনে। ভাল হয়ে যাওয়া গলা আবার যদি নষ্ট হয়ে যায়? ধীর পায়ে জানালার সামনে গিয়ে দাঁড়াল ও। ভয়ে ভয়ে একটু গুন গুন করে পরখ করল গলাটাকে। কিন্তু এইটুকুতে কিছুই বোঝা যায় না রাতের পাজামা খোলার ধৈর্য হলো না, তাড়াতাড়ি নেমে এল নিচে। বসবার ঘরে ঢুকেই সোজা এগিয়ে গেল পিয়ানোর দিকে। প্রথমে হালকা একটা সুর বাজাল, একটু পর তার সাথে গান ধরল একটা।
গলাটাকে ইচ্ছে করেই বাড়তে দিল না জনি। দুরু দুরু করে উঠল বুকটা। কিন্তু কই, গলায় তো কোন ব্যথা নেই। বেসুরোও শোনাচ্ছে না আওয়াজটা। গলা ছেড়ে দিল এবার জনি।
পরিপূর্ণ, নিখুঁত সুর বেরিয়ে আসছে, কোথাও কখনও জোর খাটাতে হচ্ছে না। পুলকিত হয়ে উঠল ও, বুঝতে পারছে দুঃখের দিন শেষ হয়েছে তার। যা কোনদিন ফিরে পাবে বলে আশা করেনি তাই ফিরে পেয়েছে। এখন আর কোন কিছুর তোয়াক্কা করে না সে। কেউ যদি তাকে ভাল না বাসে কিছু এসে যাবে না তার। ছবি করতে গিয়ে এখন যদি সে মার খায় তাতেও কিছু এসে যাবে না। টিনা কাল নিরাশ হয়েছে, কিই-বা এসে যায় তাতে? সমস্ত ব্যর্থতা, সমস্ত দুঃখ ভুলে যেতে পারে এখন জনি, কারণ সব চেয়ে বড় আনন্দ ফিরে এসেছে তার জীবনে। আবার গাইতে পারছে সে, সেজন্যে বোধহয় মন খারাপ হয়ে যাবে জিনিয়ার, তাতেও কিছু এসে যায় না জনির।
মুহূর্তের জন্যে একটু খেদ অনুভব করুল শুধু তার মেয়েদের কথা ভেবে। আহা, গলাটা যদি মেয়েদের জন্যে গাইতে গিয়ে ফিরে পেত সে, কি ভালই না হত তাহলে।
.
চাকা লাগানো ট্রে-র মৃদু আওয়াজ শুনে অতীত থেকে বর্তমানে ফিরে এল জনি ফন্টেন। ঘাড় ফিরিয়ে দেখল একজন নার্স ঢুকছে কামরায়, সাথে করে ওষুধ-পত্র নিয়ে এসেছে সে। উঠে দাঁড়াল জনি। একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে নিনোর দিকে। নিনো কি ঘুমাচ্ছে? নাকি সত্যি বাঁচার কোন আশা নেই.ওর, মারা যাচ্ছে? জনি জানে, তার গলা ফিরে আসায় এতটুকু ঈর্ষা হয়নি নিনোর মনে। কিন্তু অন্য একটা ব্যাপারে সাঙ্ঘাতিক ঈর্ষা হয়েছে। ও বুঝতে পারছে, নিনোর সেই তীব্র ঈর্ষার কারণ, জনির আনন্দ। গলা ফিরে পেয়েছে বলে এত কেন খুশি হবে জানি? গোটা ব্যাপারটা থেকে এক্ষণে একটা সত্যই প্রকটভাবে প্রকাশ পাচ্ছে-নিনো ভ্যালেন্টি দুনিয়ার কোন কিছুকেই এতটা ভালবাসে না যে তার জন্যে বেঁচে থাকার তাগিদ অনুভব করবে। তার কাছে কোন আনন্দই আনন্দ নয়, কোন পাওয়াই পাওয়া নয়। জীবনকে নিনো ভ্যালেন্টির মত এমন ঘৃণা করতে আর কাউকে দেখেনি জনি ফন্টেন।
৪.০৬ লাস ভেগাসে মাইকেল কর্লিয়নি
০৬.
বেশ রাত করে লাস ভেগাসে পৌঁছুল মাইকেল কর্লিয়নি। ওর নিষেধ ছিল, তাই অভ্যর্থনা জানাবার জন্যে এয়ারপোর্টে যায়নি কেউ। সাথে মাত্র দুজনকে নিয়ে এসেছে মাইকেল। টম হেগেন আর অ্যালবার্ট নেরি। অ্যালবার্ট নেরি ওর নতুন বডিগার্ড।
হোটেলের সবচেয়ে সৌখিন স্যুইটটা আলাদা করে রাখা হয়েছে ওদের জন্যে। যাদের সাথে দৈখা করতে চেয়েছে মাইকেল তারা সবাই অনেক আগেই এখানে পৌঁছে গেছে।
ভাইকে বুকে জড়িয়ে ধরে অভ্যর্থনা করুল ফ্রেডি। শরীরে মেদ জমেছে ফ্রেডির, চেহারায় আগের চেয়ে অনেক বেশি অমায়িক ভাব। মেজাজটা সদা প্রফুল্ল, পোশাক-আশাক অত্যন্ত মূল্যবান আর সৌখিন। নিখুঁতভাবে কাটা অ্যাশ কালারের রেশমী স্যুট পরেছে, তার সাথে মিল রেখে টাই, মোজা ইত্যাদি।চুল ছেটেছে কুর দিয়ে, তাতে ফিল্মস্টারদের মত উদ্ভাসিত হয়ে থাকে চেহারাটা। সযত্নে কামিয়েছে দাড়ি-গোঁফ, ঝক ঝক করছে মুখটা। ওর হাতের নখের যত্ন নেয় বিউটি পারলারের প্রফেশনালরা। চার বছর আগে নিউইয়র্ক থেকে রপ্তানি করা ফ্রেডি, আর এই ফ্রেডির মধ্যে আকাশ-পাতাল প্রভেদ।
চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে আছে ফ্রেডি, ছোট ভাই মাইকেলের দিকে সন্দেহের চোখে তাকিয়ে আছে, ঠোঁটে মিটিমিটি হাসি। মুখটাকে সারিয়ে নিয়ে খুব ভাল করেছ। নিশ্চয়ই কে রাজি করিয়েছে তোমাকে? কেমন আছে ও? এদিকে বেড়াতে আসবেনা?
মৃদু হাসল মাইকেল। বলল, আরে, তোমাকে তো চেনাই যাচ্ছে না। কে? ও তো এবারই আসতে চেয়েছিল, কিন্তু ওর যে আরেকটা বাচ্চা হবে, তার ওপর বড়টার ঝক্কি পোহাতে হয়। তাছাড়া, আমার এবারের আসাটা বেড়াতে আসা নয়, ফ্রেডি। কাজ সেরে কাল রাতের প্লেনেই ফিরতে হবে আমাকে, খুব বেশি দেরি হয়ে গেলে পরও সকালে।
